|| মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজী ||
দুপুর গড়িয়ে প্রায় একটা। হঠাৎ জেলখানার ভেতর অদ্ভুত এক গুঞ্জন শুরু হলো—“হেফাজত আমিরের ইন্তেকাল হয়ে গেছে!”
কে বলল, কীভাবে এলো এ খবর? সত্য, না গুজব? আমরা একজন আরেকজনের মুখের দিকে তাকিয়ে শুধু একটাই প্রশ্ন করতে থাকলাম। পরস্পরের জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে জানা গেল, রেডিও সংবাদে এ খবর প্রচার হচ্ছে। আর দেরি করিনি। তড়িঘড়ি করে রেডিও অন করলাম। হ্যাঁ, সত্যিই—রেডিওতে স্পষ্ট ভাষায় প্রচার হচ্ছে আমিরে হেফাজতের ইন্তেকালের সংবাদ।
মুহূর্তের মধ্যেই আমাদের ব্লকটা যেন পাথরে পরিণত হলো। কেউ কথা বলছিল না, কেউ কথা বলার শক্তিও পাচ্ছিল না। আমরা ছিলাম সম্পূর্ণ আইসোলেটেড—বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই, কোনো খবর নেই, কোনো সান্ত্বনার পথ নেই। এত ভারী, এত গভীর এক শোকের সংবাদ আমাদের ওপর এমনভাবে আছড়ে পড়ল যে চারদিক জুড়ে কান্নার রোল পড়ে গেল।
এটা শুধু একজন নেতার ইন্তেকাল ছিল না। এটা ছিল একজন আপোষহীন রাহবরের বিদায়। জুলুম-নির্যাতনের কষাঘাতে পিষ্ট হয়ে যে মুক্তির স্বপ্ন আমরা বুকের ভেতর লালন করতাম, মনে হলো আজ সেই স্বপ্নটাও বুঝি ধূসর হয়ে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে নামাজ আদায় করা হলো, কোরআন শরীফ তেলাওয়াত শুরু হলো। কান্নায় ভেজা কণ্ঠে দোয়া করা হলো—একেকটা দোয়া যেন বুক ছিঁড়ে বেরিয়ে আসছিল।
তবে এই স্মৃতি শুধু হেফাজতকেন্দ্রিক নয়। আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী রহ. হেফাজত প্রতিষ্ঠার বহু আগেই মুফতী আমিনী রহ.-এর সহযোদ্ধা হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। সে হিসেবে তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্কও বহু পুরোনো। হেফাজত গঠিত হওয়ার পর আল্লামা আহমদ শফী রহ.-এর নেতৃত্বে তিনি পালন করেছেন প্রধান সেনাপতির ভূমিকা। আমাদের মনে আছে– পরবর্তীতে উনি যখন হেফাজতের আমির ঘোষিত হন, সেই মজলিসেই কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। তার ইখলাছ, নিষ্ঠা ও আল্লাহমুখী জবাবদিহিতার ভয় তাকে কান্না করতে বাধ্য করেছিল।
২০১৩ সালের সেই ভয়াল রাতে শেষ পর্যন্ত তিনি ছিলেন স্টেজে। এক এক করে নেতৃত্ব ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। পরদিন সকালে লালবাগ থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের উদ্দেশ্যে নেতাদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ শুরু করি। সেদিন অনেককেই ফোনে পাওয়া যায়নি—কেউ আহত, কেউ আত্মগোপনে, কেউ নিখোঁজ। আল্লামা আহমদ শফি রহ.-এর উদ্দেশ্য ছিল পরামর্শ করে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। ঠিক তখনই আঘাতে জর্জরিত শরীর নিয়ে, কষ্ট আর ক্লান্তি সত্ত্বেও লালবাগে এসে উপস্থিত হন আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী রহ.।
২০১৩ সালের আন্দোলনের পর শুধু রিমান্ডের অমানুষিক নির্যাতনই নয়—কারামুক্তির পরও ঘরে ও বাইরে তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে প্রচণ্ড জুলুম-নির্যাতন। হাটহাজারীর গণ্ডিতে, সরকারি ছত্রছায়ায় থেকে তাঁর বিরুদ্ধে চালানো হয়েছিল চরম কোণঠাসা করার নির্মম অপচেষ্টা। তবুও তিনি হার মানেননি। এক যুগ ধরে লড়াই করে গেছেন—দৃঢ়, অবিচল, আপোষহীন এক সংগ্রামী রাহবর হিসেবে।
কোথায় অদম্য সিপাহসালার! কোথায় দুই দিনের ক্যানভাসার!
লেখক: মহাসচিব, ইসলামী ঐক্যজোট
এমএম/