আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইসলামি সভ্যতা মানবজাতির ইতিহাসে কোনো ক্ষণস্থায়ী অধ্যায় নয়; বরং এটি এমন একটি পূর্ণাঙ্গ সভ্যতা, যা মানবগঠন, বিশ্বজগতের উন্নয়ন, আত্মিক পরিশুদ্ধি এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশকে এক সুসমন্বিত কাঠামোয় উপস্থাপন করেছে বলে মন্তব্য করেছেন মিসরের গ্র্যান্ড মুফতি অধ্যাপক ড. নজির মোহাম্মদ আইয়াদ।
উজবেকিস্তানের রাজধানী তাশখন্দে ৭-৮ জুলাই অনুষ্ঠিত ‘ইসলামি সভ্যতা: সহনশীলতা, শান্তি ও আলোকপ্রাপ্তির পথ’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট আলেম, চিন্তাবিদ ও ধর্মীয় নেতারা অংশ নেন।
ড. নজির মোহাম্মদ আইয়াদ বলেন, ইসলামি সভ্যতা এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে, যেখানে মানুষের আত্মিক ও পার্থিব উভয় চাহিদার সমন্বয় ঘটেছে। এই সভ্যতা সৌন্দর্য, নৈতিকতা, জ্ঞানচর্চা, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান এবং মানবকল্যাণকে সমান গুরুত্ব দিয়েছে। কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের পরিবর্তে ইসলাম মানুষকে গবেষণা, চিন্তা ও জ্ঞানচর্চার প্রতি উৎসাহিত করেছে এবং বস্তুগত উন্নয়নের সঙ্গে নৈতিক উৎকর্ষকে যুক্ত করেছে।
তিনি বলেন, আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতা প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অর্জন করলেও বস্তুগত উন্নয়ন ও মানবিক মূল্যবোধের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। যুদ্ধ, সহিংসতা ও স্বার্থকেন্দ্রিক নীতির কারণে মানবজাতি আজ নিরাপত্তাহীনতা, অস্থিরতা ও নৈতিক সংকটে পড়েছে। বিপরীতে ইসলামী সভ্যতা ন্যায়বিচার, দয়া, সহমর্মিতা ও শান্তির ভিত্তিতে মানবকল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে।
গ্র্যান্ড মুফতি আরও বলেন, ইসলামে সহনশীলতা ও শান্তি কোনো রাজনৈতিক স্লোগান বা সাময়িক অবস্থান নয়; বরং এগুলো ইসলামী আকিদা, শরিয়ত ও নৈতিকতার গভীরে প্রোথিত মৌলিক নীতি। ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা অনুসরণ করলে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়, মানবিক মর্যাদা রক্ষা পায় এবং ধর্ম, বর্ণ, ভাষা কিংবা জাতিগত পরিচয় নির্বিশেষে সকল মানুষের অধিকার নিশ্চিত হয়।

তিনি পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াত উদ্ধৃত করে বলেন, ইসলাম মানবজাতির ঐক্য, পারস্পরিক পরিচিতি, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ন্যায়ভিত্তিক সহাবস্থানের শিক্ষা দেয়। ইসলামী সভ্যতা সব নবী-রাসূলের প্রতি বিশ্বাস, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং মানবিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে।
ইসলামের ইতিহাসের উদাহরণ তুলে ধরে ড. আইয়াদ বলেন, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনা সনদের মাধ্যমে ইহুদিদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করেছিলেন। নাজরানের খ্রিস্টান প্রতিনিধিদলকে মসজিদে আতিথ্য দিয়েছিলেন এবং পরবর্তী খলিফারাও একই নীতি অনুসরণ করে ধর্মীয় সহাবস্থানের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। ইসলামী শাসনামলে যোগ্যতার ভিত্তিতে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন এবং পারস্পরিক সম্প্রীতির পরিবেশ গড়ে উঠেছিল।
তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে ইসলামি সভ্যতার প্রকৃত মূল্যবোধ বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা অত্যন্ত জরুরি। ইসলাম সম্পর্কে অপপ্রচার ও ভুল ধারণা মোকাবিলায় ন্যায়বিচার, দয়া, সহনশীলতা ও শান্তির ইসলামী আদর্শকে আরও জোরালোভাবে উপস্থাপন করতে হবে।

মিসরের রাষ্ট্রের উদ্যোগে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও উগ্রবাদ মোকাবিলায় নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরেন গ্র্যান্ড মুফতি। তিনি জানান, এ লক্ষ্যেই বিশ্বের দারুল ইফতা ও ফতোয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মহাসচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যা উগ্র ও বিভ্রান্তিকর ফতোয়ার বিরুদ্ধে কাজ করছে এবং মধ্যপন্থী ও দায়িত্বশীল ফতোয়া প্রদানে আন্তর্জাতিক সমন্বয় গড়ে তুলছে। এ প্রতিষ্ঠানের অধীনে সালাম সেন্টার ফর এক্সট্রিমিজম স্টাডিজ, ইমাম লাইস ইবন সাদ সেন্টার ফর ফিকহ অব কো-এক্সিস্টেন্স, হিউয়ার ইউনিট এবং গ্লোবাল ফতোয়া ইনডেক্স-এর মতো বিশেষায়িত গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।
বক্তৃতার শেষাংশে ড. নজির মোহাম্মদ আইয়াদ ফিলিস্তিনে চলমান ইসরায়েলি আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানান। তিনি বলেন, দখলকৃত ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড মানবিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় নীতি এবং আন্তর্জাতিক আইনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। হত্যা, গণহত্যা, অনাহার, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি ও ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর যে নির্যাতন চালানো হচ্ছে, তা বিশ্ব বিবেকের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।
তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বিবেকবান মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, নির্যাতন বন্ধ এবং ফিলিস্তিনি জনগণের বৈধ অধিকার নিশ্চিত করতে সবাইকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। পৃথিবীতে স্থায়ী শান্তি, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলামী সভ্যতার প্রকৃত মূল্যবোধকে বিশ্বব্যাপী তুলে ধরারও আহ্বান জানান তিনি।
সূত্র: দারুল ইফতা আল-মিসরিয়্যাহ ফেসবুক পেইজ
আওয়ার ইসলাম/জেডএম
