|| আবদুর রউফ আশরাফ ||
একজন কবি চলে যান, কিন্তু তাঁর উচ্চারণ থেকে যায়। সময় পেরিয়ে যায়, প্রজন্ম বদলে যায়, অথচ কিছু শব্দ মানুষের হৃদয়ে চিরকাল জেগে থাকে। কাজী নজরুল ইসলাম তেমনই এক অমর উচ্চারণের নাম।
কখনো জন্মদিনে আমরা তাঁকে স্মরণ করি, কখনো মৃত্যুবার্ষিকীতে। ফুল দিই, আলোচনা করি, কবিতা আবৃত্তি করি। কিন্তু সত্যিই কি নজরুলকে স্মরণ করা হয়? নাকি ক্যালেন্ডারের একটি বিশেষ দিনে তাঁকে মনে করে আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ি নিজেদের পৃথিবী নিয়ে?
নজরুল যেন এই আনুষ্ঠানিকতার চেয়েও অনেক বড়।
তিনি এসেছিলেন ঝড়ের মতো। বাংলা সাহিত্যের আকাশে তাঁর আবির্ভাব ছিল এক বিস্ময়। যে সময়ে চারদিকে পরাধীনতার অন্ধকার, শোষণ আর বৈষম্য—সে সময়ে একটি তরুণ কণ্ঠ বুক চিতিয়ে ঘোষণা করেছিল বিদ্রোহের কথা। তাঁর কলমে আগুন ছিল, কিন্তু সেই আগুন মানুষ পোড়ানোর জন্য নয়; অন্যায়ের শিকল পুড়িয়ে দেওয়ার জন্য।
তাই তিনি লিখেছিলেন বিদ্রোহের কবিতা, আবার লিখেছিলেন প্রেমের গান। কখনো তিনি বজ্রের মতো গর্জেছেন, কখনো শিশিরের মতো কোমল হয়েছেন। কখনো শোষকের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, আবার কখনো অসহায় মানুষের চোখের জল মুছে দিতে চেয়েছেন।
এই বৈপরীত্যই নজরুলকে নজরুল করেছে।
তাঁর বিদ্রোহের ভেতরেও ছিল ভালোবাসা। তাঁর সাম্যের আহ্বানের ভেতরেও ছিল গভীর মানবতা। ধর্মের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ যেমন ছিল, তেমনি ধর্মের নামে মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরির বিরুদ্ধেও তাঁর কণ্ঠ ছিল সোচ্চার।
নজরুলের কাছে মানুষের পরিচয়ই ছিল বড়।
আজ এত বছর পরও তাঁর প্রশ্নগুলো আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে। আমরা যখন সমাজে বৈষম্য দেখি, যখন ক্ষমতার কাছে সত্য নীরব হয়ে যায়, যখন দুর্বল মানুষটি তার অধিকার হারায় তখন মনে হয়, নজরুল থাকলে কী বলতেন?
সম্ভবত তিনি আবারও তাঁর কলম তুলে নিতেন।
আবারও লিখতেন মানুষের মুক্তির কথা। আবারও বলতেন ভয় পেও না। অন্যায়ের সামনে মাথা নত করো না।
নজরুলের জীবনের শেষ অধ্যায় ছিল বেদনার। যে কণ্ঠ একদিন লাখো মানুষকে জাগিয়ে তুলেছিল, একসময় সেই কণ্ঠই নীরব হয়ে গেল। অসুস্থতা তাঁকে স্তব্ধ করে দিল। কিন্তু কবিকে নীরব করা গেল না।
কারণ একজন কবির কণ্ঠ কেবল তাঁর মুখে থাকে না। তাঁর কণ্ঠ ছড়িয়ে থাকে কবিতায়, গানে, মানুষের স্মৃতিতে, সংগ্রামের মিছিলে, তরুণের স্বপ্নে।
নজরুলের শরীর নীরব হয়েছে, তাঁর শব্দ নয়।
তাঁর কবিতা আজও আবৃত্তি হয়। তাঁর গান আজও গাওয়া হয়। তাঁর নাম আজও উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধার সাাতে। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় স্মৃতিস্তম্ভ কোনো স্মৃতিসৌধ নয় মানুষের ভেতরে জেগে থাকা তাঁর সাম্যের স্বপ্ন।
তাই নজরুলের জন্মজয়ন্তী আমাদের আনন্দের দিন, আবার তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী গভীর বেদনারও দিন। কিন্তু দুই দিনই আমাদের সামনে একই প্রশ্ন রেখে যায় আমরা নজরুলকে কতটা ধারণ করতে পেরেছি?
আমরা কি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলি?
আমরা কি অসহায়ের পাশে দাঁড়াই?
আমরা কি মানুষকে তার ধর্ম, পরিচয় কিংবা অবস্থান দিয়ে নয় মানুষ হিসেবে দেখতে শিখেছি?
যদি না শিখে থাকি, তবে নজরুলকে শুধু স্মরণ করে লাভ কী?
নজরুলকে ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর উপায় হলো তাঁর মানবিক শিক্ষা নিজের জীবনে ধারণ করা। তাঁর বিদ্রোহকে অন্যের প্রতি ঘৃণায় পরিণত না করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসে রূপ দেওয়া। তাঁর সাম্যের বাণীকে বক্তৃতার মঞ্চে আটকে না রেখে জীবনের আচরণে নিয়ে আসা।
আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে নজরুল তাই শুধু পাঠ্যবইয়ের একজন কবি নন। তিনি সাহসের প্রতীক। তিনি স্বপ্ন দেখার সাহস, সত্য বলার সাহস এবং অন্যায়ের সামনে দাঁড়ানোর সাহসের নাম।
যে জাতি তার কবিকে শুধু স্মরণ করে, সে কবিকে ভালোবাসে। কিন্তু যে জাতি তার কবির আদর্শকে জীবনে ধারণ করে, সে কবিকে বাঁচিয়ে রাখে।
নজরুলের মৃত্যু হয়েছে এ কথা ইতিহাস বলে।
কিন্তু তাঁর কণ্ঠের মৃত্যু হয়নি।
কারণ যতদিন কোনো তরুণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, যতদিন কোনো মানুষ সাম্যের স্বপ্ন দেখবে, যতদিন কোনো হৃদয় নিপীড়িত মানুষের জন্য কাঁদবে ততদিন নজরুল বেঁচে থাকবেন।
লেখক; কো-অর্ডিনেটর, ইকরা বাংলাদেশ স্কুল হবিগঞ্জ
এসএইচ/