||মাওলানা আতাউল কারিম মাকসুদ||
ঢালকানগর মাদরাসার মুহতামিম দা.বা.। আমার হুজুর, আমার উসতাদ, আমার মুহসিন মুরব্বি। সকল ছাত্রকে তিনি ভালোবসেন, আদর করেন, সোহাগ করেন, কিন্তু আমার প্রতি তার দয়া, মায়া অনুকম্পা সবার চেয়ে ভিন্ন। এতোটা আদর আমাকে করেন তিনি, আমি রীতিমত শিহরিত হই।
মুহতামিম জীবনে অনেক দেখেছি, কিন্তু হুজুরের মধ্যে এমন কিছু গুণ ও আখলাক দেখেছি, যা তাকে সমসাময়িকদের মধ্যে করেছে অনন্য। তার পরিচালিত প্রতিষ্ঠান ‘ঢালকানগর মাদরাসা হয়ে উঠেছে দেশ সেরা প্রতিষ্ঠান।
ছাত্রদের প্রতি এতো দয়া-মায়া ও আদর তিনি লালন করেন, আমাদের জন্য যা রীতিমত অবাক করা।
তিনি উসুলি মানুষ, উসুল প্রয়োগ করার জন্য কড়াকড়ি করেন, এটা ঠিক। কিন্তু কঠোরতার মধ্যেও তিনি আমাদের নিকট উদ্ভাসিত হতেন অত্যন্ত স্নেহপরবশ হিসাবে।
২০০৫ সাল। আমরা তখন শরহেবাকায়া জামাতের ছাত্র। উমরা থেকে ফিরে আমাদেরকে শুনালেন অবিশ্বাস্য ভালোবাসার গল্প। আমরা নির্বাক তাকিয়ে আছি সদ্য বাইতুল্লাহ ও মদিনা পাক দেখা তার চেহারাপানে। বলেন তিনি, ‘বাইতুল্লাহ শরিফের দিকে প্রথম নজর পড়ার সময় আমি আমার ঔরষজাত সন্তানদের জন্য দুআ না করে আমার ছাত্রদের জন্য দুআ করেছি।’
কিছুক্ষণ পর দেখা করতে গেলাম অফিসরুমে। আমাদেরকে অবাক করে দিয়ে একজন ছাত্র সম্পর্কে বলেন, ‘আমি তাওয়াফের চক্করে তার নাম নিয়ে দুআ করেছি।’
হুজুর তখন প্রতি বছর সাউথ আফ্রিকা সফরে যেতেন। ব্যক্তিগত সফর হলেও মাদরাসার জন্য ফান্ড কালেকশান করতেন। আমরা ছাত্র হলেও একটু-আধটু টের পেতাম। সফর থেকে ফিরে ছাত্রদের জন্য অনেক মজাদার খাবারের ইনতিজাম করতেন। নিজে বাজারে যেতেন, পছন্দ অনুযায়ী বাজার করতেন। একবার দেখি, বোর্ডিংয়ে বসে বসে রান্নার তদারকি করছেন, আর পুরো শরীরে ঘাম বেয়ে পড়ছে দরদর করে। [ইয়া সুবহান]
আরেকবার, ইয়া বড় বড় মাছ কিনে নিয়ে আসেন। মাতবাখের জিম্মাদার সেগুলো কুটাকুটিতে ব্যস্ত, আর হুজুর পাশে বসে সহযোগিতা করছেন। কানে আওয়াজ পড়লো হুজুরের সেই আদুরে কথা, ‘আমার কলিজার টুকরো ছাত্ররা খাবে, মাসের পিছ বড় বড় করো।’
হুজুর চলাফেরা করেন অত্যন্ত শান-শওকতের সাথে। পরিচ্ছন্নতা তাকে জড়িয়ে রাখে সার্বক্ষণিক। হুজুর বোর্ডিংয়ে মাছ কুটার কাজে সহযোগিতা...। অবিশ্বাস্য। কিন্তু কলিজার ছাত্রদের জন্য তিনি এমনই ছিলেন।
হুজুরকে ছাত্র জীবনে খুব ভয় পেতাম আমরা। এত ভয় পেতাম যে, সযত্নে দূরে থাকার চেষ্টা করত সকল ছাত্র। কিন্তু তার মুনাজাত, রোনাজারি, ইবাদত-বন্দেগির কারনে ছাত্ররা অসাধারণ ভালোবাসত। সারা রাত সফর করে এসে ফজরের নামাজ নিয়মিত জামাতে তাকবিরে উলার সাথে ১ম কাতারে আদায় করতেন। কখনো ফজরের নামাজের পর ছাত্রদের হাজিরা নিতেন। অনেক গুরুত্বপূর্ণ নসিহত করতেন, কারো কোনো ভুল দেখলে তাম্বিহ করতেন। ১ম কাতারে নামাজ পড়ার জন্য উৎসাহ দিতেন। আকাবিরে দেওবন্দ, বিশেষত হজরত ওয়ালা করাচি রাহ.-এর বিভিন্ন মালফুজ শুনাতেন। জীবনে বড় হওয়ার, এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখাতেন। কী দারুণ সময় ছিল আমাদের ঢালকানগেরর জীবন। বড় রুহানিয়াত ও বরকতপূর্ণ।
অত্যন্ত সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন আমার হুজুর। সুঠাম দেহ, বাবরী চুল, সাদা মিহি পোষাক, হুজুরকে অন্যরকম সুন্দর দেখাতো।
অসুস্থতা এখন তার নিত্য সঙ্গী। অনেকগুলো ঔষধ খেতে হয় তাকে। ডায়াবেটিকস হয়েছে কম করে হলেও প্রায় ২০/২৫ বছর আগে। দুর্বল হয়ে পড়েছেন অনেকটা। কারো সাহায্য নিয়ে লাঠি ভর করে চলতে হয় তাকে।
মহান আল্লাহ তাআলা আমার হুজুরকে পরিপূর্ণ সিহহাত, আফিয়াত নসিব করুন। হায়াতে তাইয়্যিবাহ দান করুন।
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম, জামিআ ইউসুফ বানুরি রাহ. সানারপাড়; ফাজিল, ঢালকানগর মাদরাসা
এনএইচ/