|| শরিফ হাসানাত ||
দোয়া মুমিনের শক্তিশালী ইবাদত। এটি ইবাদতের মগজ। দায়াময় প্রভুর বান্দার সাঙ্গে আরজ-আরজি পেশ করার অন্যতম মাধ্যম। বান্দার বিনয়, নির্ভরতা ও ভালোবাসার প্রকাশের সুন্দর উপায়। পৃথিবীর সকল দরজা বন্ধ হলেও তাঁর দরজা কখনো বন্ধ হয় না। তিনি কাউকে ফিরিয়ে দেন না তার দরবার থেকে। মানুষের কাছে বারবার কিছু মানুষ বিরক্ত হয়, কিন্তু মহান আল্লাহর কাছে না-চাইলে রাগ করেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, "তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।" (সূরা গাফির, আয়াত: ৬০)
তবে কুরআন ও হাদিসে এমন কিছু বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলো মানুষের দোয়া কবুল হওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
১. হারাম উপার্জনকারীর দোয়া
নবীজি (সা.) এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন, যিনি দীর্ঘ সফরে ক্লান্ত-শ্রান্ত অবস্থায় আল্লাহর কাছে হাত তুলে দোয়া করছেন। কিন্তু তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং তিনি হারাম উপার্জনে লালিত।
তখন রাসুল (সা.) বলেন, "তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং সে হারাম দ্বারা প্রতিপালিত। তাহলে তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে?" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১৫)
এ হাদিস থেকে প্রমাণিত হয় যে, হালাল উপার্জন দোয়া কবুল হওয়ার অন্যতম শর্ত।
২. গুনাহে অবিচল থাকা ও তাওবা না করা
যে ব্যক্তি গুনাহের ওপর অটল থাকে এবং তাওবা করার চেষ্টা করে না, তার জন্যও দোয়া কবুলের পথে বাধা হতে পারে। ইসলাম মানুষকে ভুলের জন্য নিরাশ হতে শেখায় না। তাওবায়ে নাসূহা ও আত্মশুদ্ধির পথ দেখায় ইসলাম।
আল্লাহ তাআলা বলেন, "হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।" (সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩১)
৩. দোয়ায় অধৈর্য হওয়া
মুমিনের দায়িত্ব হলো ধৈর্য ধারণ করা। আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা রাখা। কিছুদিন দোয়া করার পর হতাশ হওয়া যাবে না। দোয়া কবুল হচ্ছে না বলে ভেঙ্গে পড়া যাবে না। কারণ দোয়া কবুলের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া দোয়ার আদবের পরিপন্থী।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, "তোমাদের প্রত্যেকের দোয়া কবুল হতে থাকে, যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়া করে বলে, 'আমি দোয়া করেছি; কিন্তু তা কবুল হয়নি।'" (বুখারি, হাদিস: ৬৩৪০; মুসলিম, হাদিস: ২৭৩৫)
৪. গুনাহ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীর দোয়া
ইসলামে এমন দোয়া গ্রহণযোগ্য নয়, যা কোনো পাপের কাজে সহায়তা করে বা আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট করার উদ্দেশ্যে করা হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, "বান্দার দোয়া কবুল হতে থাকে, যতক্ষণ না সে কোনো গুনাহের জন্য বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য দোয়া করে।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭৩৫)
৫. দোয়া কবুলের অর্থ সবসময় তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া নয়
অনেক সময় মানুষ মনে করে, চাওয়া জিনিসটি সঙ্গে সঙ্গে না পেলেই দোয়া কবুল হয়নি। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা ভিন্ন। আল্লাহ তাআলা বান্দার জন্য যা কল্যাণকর, সেটিই নির্ধারণ করেন। তাই দোয়ার ফল দেরিতে এলে হতাশ হওয়ার সুযোগ নেই।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে মুসলিম এমন কোনো দোয়া করে যাতে গুনাহ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয় নেই, আল্লাহ তাকে তিনটির একটি দান করেন—তাৎক্ষণিকভাবে দোয়া কবুল করেন, অথবা তার জন্য তা আখিরাতে সঞ্চয় করে রাখেন, অথবা সমপরিমাণ কোনো বিপদ তার থেকে দূর করে দেন।" (মুসনাদ আহমাদ, হাদিস: ১১১৩৩)
দোয়া মুমিনের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই দোয়া কবুল না হওয়ার কারণগুলো থেকে নিজেদের দূরে রাখার চেষ্টা করা, হালাল-হারামের ব্যাপারে সচেতন থাকা, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা, এবং আল্লাহর রহমতের ওপর অটল আস্থা রাখা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কবুলযোগ্য দোয়া করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: আলেম ও কবি
এসএইচ/