মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬ ।। ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ ।। ১৪ সফর ১৪৪৮


আকস্মিক মৃত্যু থেকে বাঁচার উপায় ও করণীয় 

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহীত

|| শরিফ হাসানাত || 

মৃত্যু মানুষের জীবনের এক অবধারিত সত্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, "প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।" (সূরা আলে ইমরান: ১৮৫) তাই মৃত্যু কখন, কোথায় এবং কীভাবে আসবে—তা একমাত্র আল্লাহই জানেন। ইসলামে এমন কোনো আমল বা দোয়া নেই যা নিশ্চিতভাবে "হঠাৎ মৃত্যু" প্রতিরোধ করে। তবে ইসলাম এমন জীবনযাপনের শিক্ষা দেয়, যাতে একজন মুমিন সব সময় আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে থাকে এবং যেকোনো সময় মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকে।

১. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়মিত আদায় করা

নামাজ একজন মুসলমানের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। নিয়মিত নামাজ মানুষকে গুনাহ থেকে দূরে রাখে এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজকে দ্বীনের স্তম্ভ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। 

আল্লাহ তাআলা বলেন, "নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।" (সূরা আল-আনকাবুত: ৪৫)

রাসুল (সা.) বলেছেন, "কিয়ামতের দিন বান্দার সর্বপ্রথম যে আমলের হিসাব নেওয়া হবে, তা হলো নামাজ।" (আবু দাউদ, হাদিস: ৮৬৪; তিরমিজি, হাদিস: ৪১৩)

আরও বলেছেন, "বান্দা এবং কুফর ও শিরকের মধ্যে পার্থক্য হলো নামাজ ত্যাগ করা।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮২)

২. সবসময় তাওবা ও ইস্তিগফার করা

মানুষ ভুল করবেই। তাই আল্লাহর কাছে বারবার ক্ষমা চাওয়া একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও প্রতিদিন বহুবার ইস্তিগফার করতেন। নিয়মিত তাওবা হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে এবং আল্লাহর রহমত লাভের পথ খুলে দেয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন, "হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।" (সূরা আন-নূর, ২৪:৩১)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "আল্লাহর শপথ! আমি প্রতিদিন আল্লাহর কাছে সত্তরবারেরও বেশি ইস্তিগফার করি এবং তাঁর কাছে তাওবা করি।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩০৭)

৩. সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন দোয়া ও জিকির পড়া

রাসুলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন দোয়া ও জিকির শিখিয়েছেন, যা একজন মুসলিমকে আল্লাহর স্মরণে রাখে। সকাল-সন্ধ্যার জিকির, আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পাঠ করা সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত।

আল্লাহ তাআলা বলেন, "হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করো এবং সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করো।" (সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৪১–৪২)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর আয়াতুল কুরসি পাঠ করবে, তার জান্নাতে প্রবেশের পথে মৃত্যু ছাড়া আর কোনো বাধা থাকবে না।" (সুনান আন-নাসাঈ)

এছাড়া অন্য হাদিসে রয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) সকাল-সন্ধ্যায় সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস তিনবার করে পাঠ করতেন। (আবু দাউদ, হাদিস: ৫০৮২; তিরমিজি, হাদিস: ৩৫৭৫)

নবীজি (সা.) আকস্মিক মৃত্যু থেকে বাঁচতে এই দোয়াটি পড়তেন, 

"আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল হাদমি, ওয়া আউজুবিকা মিনাত তারাদ্দি, ওয়া আউজুবিকা মিনাল গারাকি ওয়াল হারাকি..."

(অর্থ: হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই চাপা পড়ে মৃত্যু থেকে, নিচে পড়ে যাওয়া থেকে, পানিতে ডুবে ও আগুনে পুড়ে মৃত্যু থেকে)।

৪. হালাল উপার্জন ও সৎ জীবনযাপন

হারাম উপার্জন ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। হালাল রিজিক, সততা এবং মানুষের হক আদায় একজন মুমিনের জীবনে বরকত বয়ে আনে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, "হে মানুষ! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র আছে, তা থেকে আহার করো।" (সূরা আল-বাকারা, ২:১৬৮)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র জিনিসই গ্রহণ করেন।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১৫)

হালাল জীবিকা, সততা ও মানুষের হক আদায় একজন মুমিনের জীবনে বরকত নিয়ে আসে।

৫. সুস্থতা রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ

ইসলাম মানুষকে নিজের জীবন ও স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে উৎসাহিত করে। তাই স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে বিরত থাকা ইসলামী শিক্ষার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ আল্লাহর ওপর ভরসা করার পাশাপাশি যথাযথ চেষ্টা করাও ইসলামের শিক্ষা।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর কাছে দুর্বল মুমিনের তুলনায় অধিক প্রিয়, যদিও উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৬৪)

আরও বলেছেন,"হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো। কেননা আল্লাহ এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি, যার চিকিৎসাও তিনি সৃষ্টি করেননি।" (আবু দাউদ, হাদিস: ৩৮৫৫; সুনান তিরমিজি, হাদিস: ২০৩৮)

অতএব, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, পরিচ্ছন্নতা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ ইসলামী শিক্ষার অংশ।

৬. অন্যের হক আদায় ও সদাচরণ করা

মানুষের সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, দান-সদকা করা এবং কারও প্রতি অন্যায় না করা একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ গুণ। এসব আমল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সহায়ক।

আল্লাহ তাআলা বলেন, "তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করো না; পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত, নিকট প্রতিবেশী ও দূর প্রতিবেশীর সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো।" (সূরা আন-নিসা, ৪:৩৬)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যার চরিত্র সর্বোত্তম।" (বুখারি, হাদিস: ৩৫৫৯; মুসলিম, হাদিস: ২৩২১)

৭. মৃত্যুর জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকা

রাসুলুল্লাহ (সা.) মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করার উপদেশ দিয়েছেন। এর অর্থ ভয় পাওয়া নয়; বরং এমনভাবে জীবনযাপন করা, যেন যেকোনো সময় আল্লাহর ডাকে সাড়া দিতে প্রস্তুত থাকা যায়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমরা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিনষ্টকারী বিষয়—অর্থাৎ মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করো।" (তিরমিজি, হাদিস: ২৩০৭; আন-নাসাঈ, হাদিস: ১৮২৩)

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, "হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় করো এবং মুসলিম না হয়ে কখনো মৃত্যুবরণ করো না।" (সূরা আলে ইমরান, ৩:১০২)

একজন মুমিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন জীবনযাপন করা, যাতে মৃত্যু যখনই আসুক, সে ঈমান ও নেক আমলের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে।

ইসলামে এমন কোনো নিশ্চিত উপায় নেই যা হঠাৎ মৃত্যু ঠেকিয়ে দেয়। মৃত্যু নির্ধারিত সময়েই আসবে। তবে একজন মুসলিমের করণীয় হলো ঈমান, তাকওয়া, নিয়মিত ইবাদত-বন্দেগী, তাওবা, সৎ জীবনযাপন এবং আল্লাহর ওপর ভরসার মাধ্যমে নিজেকে সব সময় প্রস্তুত রাখা। একজন মুমিনের প্রকৃত সফলতা মৃত্যু বিলম্বিত হওয়ায় নয়, বরং ঈমানের সঙ্গে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে পারায়।

এসএইচ/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ