রবিবার, ০৯ আগস্ট ২০২৬ ।। ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ ।। ২৬ সফর ১৪৪৮

শিরোনাম :
অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নের কারণ জানালেন আমিরে মজলিস প্রধানমন্ত্রীর কাছে হেফাজতে ইসলামের ৯ দফা দাবি সন্ধান মিলল জামেয়া দারুল মাআরিফের নিখোঁজ দুই শিক্ষার্থীর হেফাজত আমিরের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ, মতবিনিময় টাকায় বিদেশ ভ্রমণের প্যাকেজ বিক্রির সুযোগ পেল ট্যুর অপারেটররা ‘তথ্যনির্ভর নাগরিক সাংবাদিকতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন মাদরাসা শিক্ষার্থীরা’ প্রত্নতত্ত্বকে ‘হাতিয়ার’ করে ফিলিস্তিনি ভূমি দখলের অভিযোগ ইসরাইলের বিরুদ্ধে ট্রাক-লরি-সিএনজির ত্রিমুখী সংঘর্ষে ২ জন  নিহত   লন্ডনে খেলাফত মজলিসের গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হেফাজত আমিরের সঙ্গে সাক্ষাতে বাবুনগর মাদরাসায় প্রধানমন্ত্রী

প্রত্নতত্ত্বকে ‘হাতিয়ার’ করে ফিলিস্তিনি ভূমি দখলের অভিযোগ ইসরাইলের বিরুদ্ধে

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

অধিকৃত পশ্চিম তীরের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান সেবাস্তিয়াকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। সংরক্ষণ ও জাতীয় উদ্যান নির্মাণের নামে ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের জমি দখল করছে—এমন অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি জাতিসংঘের সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেস্কোও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

সেবাস্তিয়ার প্রাচীন রোমান স্তম্ভগুলোর ওপরের পাহাড়জুড়ে রয়েছে বিস্তীর্ণ জলপাই বাগান। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এসব জমিতে চাষাবাদ করে আসছেন ফিলিস্তিনি পরিবারগুলো। তাদেরই একজন আবু মুদিফ। তিনি জানান, তার জমিও ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের প্রস্তাবিত ৪৫০ একর এলাকার মধ্যে পড়েছে।

ইসরাইলের দাবি, প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণ এবং সেখানে একটি বড় জাতীয় উদ্যান গড়ে তুলতেই জমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, এর আড়ালে মূলত তাদের ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।

জমি হারানো মানে আত্মা হারানো

জমি হারানোর সম্ভাবনা আবু মুদিফের কাছে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়। তিনি বলেন, নিজের জমি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার অনুভূতিকে তার কাছে ‘শরীর থেকে আত্মা ছিনিয়ে নেওয়ার’ মতো মনে হচ্ছে। তার ভাষায়, জমি ছাড়া তিনি নিজেকে কল্পনাই করতে পারেন না।

ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনি মালিকদের অনেক সময় সামান্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কখনো কোনো ক্ষতিপূরণও দেওয়া হয় না। তবে অনেক মালিকই তা গ্রহণ করেন না। তাদের আশঙ্কা, ক্ষতিপূরণ নিলে পৈতৃক সম্পত্তি হারানোর বিষয়টি মেনে নেওয়া হয়েছে—এমন ধারণা তৈরি হতে পারে।

সেবাস্তিয়ার স্থানীয় রেস্তোরাঁ মালিক নাহেদ সাখাও উচ্ছেদের আশঙ্কায় রয়েছেন। তার মতে, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানটি থেকে ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন করাই ইসরাইলি পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য।

সেবাস্তিয়ায় শুধু প্রাচীন ইহুদি ইতিহাসের নিদর্শনই নেই; রোমান, ক্রুসেডার ও অটোমান আমলেরও গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নসম্পদ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, খনন ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের পাশাপাশি তাদের জমিতে চাষাবাদ ও ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

 ইউনেস্কোর উদ্বেগ

সেবাস্তিয়া নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পৌঁছেছে। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো স্থানটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি ‘বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্য’-এর তালিকাতেও রেখেছে।

ইউনেস্কোর মতে, সেবাস্তিয়ার জন্য বড় হুমকিগুলোর মধ্যে রয়েছে পরিকল্পিত ভূমি দখল এবং ‘সমরিয়া’ বা ‘শোমরন’ ন্যাশনাল পার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ। এ ধরনের প্রকল্প প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানটিকে বিভক্ত করে ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা সংস্থাটির।

সেবাস্তিয়ার প্রবেশপথের একদিকে রয়েছে প্রাচীন রোমান ফোরাম, অন্যদিকে ব্যাসিলিকার ধ্বংসাবশেষ। স্থানীয় মেয়র মোহাম্মদ আজেম জানান, নিরাপত্তা বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের সঙ্গে বিরোধের আশঙ্কায় স্থানীয় বাসিন্দারা এখন প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকাটি পরিষ্কার করতেও ভয় পান।

প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানটির মধ্য দিয়ে যাওয়া একটি রাস্তা অঞ্চলটিকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। এর একটি অংশ পশ্চিম তীরের ‘এরিয়া বি’-তে, যেখানে ফিলিস্তিনিদের বেসামরিক প্রশাসন থাকলেও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ ইসরাইলের হাতে। অন্য অংশ ‘এরিয়া সি’-তে, যা বেসামরিক ও নিরাপত্তা—উভয় দিক থেকেই ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণাধীন।

প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান নিয়ন্ত্রণে বাড়ছে ইসরাইলি তৎপরতা

পশ্চিম তীরের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোতে নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে ইসরাইল সম্প্রতি প্রায় ১১ কোটি ৩০ লাখ শেকেল বরাদ্দ দিয়েছে। এর আওতায় এমন কিছু স্থানও রয়েছে, যেগুলো ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

সেবাস্তিয়ার প্রাচীন রোমান থিয়েটারের ধ্বংসাবশেষে দাঁড়িয়ে ইসরাইলি অধিকারকর্মী অ্যালন আরাদ বলেন, স্থানীয় প্রশাসন ও বাসিন্দাদের সঙ্গে কোনো ধরনের যথাযথ পরামর্শ ছাড়াই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

ইসরাইলি সংগঠন ‘এমেক শাভেহ’-এর প্রধান আরাদের মতে, সেবাস্তিয়া মূলত একটি ফিলিস্তিনি ঐতিহ্যবাহী স্থান। এর উন্নয়ন করতে হলে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও পৌরসভার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ইসরাইলের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেবাস্তিয়ার প্রবেশপথ বর্তমান অবস্থান থেকে সরিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকার অন্য প্রান্তে নেওয়া হবে। ফলে সেটি স্থানীয় গ্রাম, পার্কিং এলাকা ও দোকানপাট থেকে অনেক দূরে চলে যাবে।

ফিলিস্তিনের পর্যটন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আশা করছে, ইউনেস্কোর স্বীকৃতি সেবাস্তিয়ায় ইসরাইলি ভূমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থানকে আন্তর্জাতিকভাবে শক্তিশালী করবে।

তবে ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিয়ন সার ইউনেস্কোর পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার দাবি, পশ্চিম তীরের সঙ্গে ইহুদিদের ঐতিহাসিক সম্পর্ককে দুর্বল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার ভোটাভুটির মাধ্যমে ইতিহাস পরিবর্তন করা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

হেরোডিয়ামেও ভূমি অধিগ্রহণ

সেবাস্তিয়ার মতো পশ্চিম তীরের আরেক গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান হেরোডিয়াম নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জেরুজালেমের কাছাকাছি অবস্থিত কৃত্রিম পাহাড়টির চূড়ায় খ্রিষ্টপূর্ব যুগের শেষ দিকে জুদিয়ার রাজা হেরড একটি বিশাল প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন।

সম্প্রতি ওই এলাকার প্রায় ৮০ একর জমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে ইসরাইল। কর্তৃপক্ষের যুক্তি, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানটির সংরক্ষণ ও উন্নয়নের জন্যই এই পদক্ষেপ।

তবে ইসরাইলি বসতি পর্যবেক্ষণকারী সংগঠন ‘পিস নাউ’-এর দাবি, আন্তর্জাতিক আইন এবং ইসরাইলের সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়ের আলোকে কেবল বসতি স্থাপন বা ইসরাইলি নাগরিকদের সুবিধার জন্য জমি অধিগ্রহণ বৈধ নয়।

সংগঠনটির আশঙ্কা, জমি অধিগ্রহণকে বৈধতা দিতে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ দাবি করতে পারে যে, স্থানটি ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলি—উভয় জনগোষ্ঠীর জন্যই ব্যবহৃত হবে। কিন্তু বাস্তবে এর উদ্দেশ্য বসতি সম্প্রসারণ ও ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হতে পারে বলে তারা মনে করছে।

তবে হেরোডিয়ামে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজের সঙ্গে যুক্ত গাইড শ্মুয়েল ব্রাউনস মনে করেন, ঐতিহাসিক ও ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ এসব স্থানের সংরক্ষণের দায়িত্ব ইসরাইলেরই নেওয়া উচিত। তার মতে, এই অঞ্চলের প্রত্নতত্ত্ব, নিদর্শন ও ইতিহাস রক্ষার বিষয়ে ইসরাইলের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে।

প্রত্নতত্ত্বকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে

পশ্চিম তীরে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইসরাইলি সরকারের অভ্যন্তরেও আরও কঠোর পদক্ষেপের উদ্যোগ দেখা গেছে। চলতি বছরের শুরুতে একটি প্রস্তাবিত আইনে পশ্চিম তীরের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোর নিয়ন্ত্রণ সামরিক কর্তৃপক্ষের অধীন বেসামরিক প্রশাসন থেকে ইসরাইলের ঐতিহ্যবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হাতে দেওয়ার কথা বলা হয়।

আইনটি পাস হলে প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণের নামে পশ্চিম তীরে ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মে মাসে বিলটি পার্লামেন্টে প্রথম পাঠে অনুমোদিত হলেও নির্বাচন সামনে থাকায় এর পরবর্তী কার্যক্রম আপাতত স্থগিত রয়েছে।

সেবাস্তিয়ায় ফিরে অ্যালন আরাদ বলেন, এমন একটি বিল উত্থাপনই দেখিয়ে দেয়, পশ্চিম তীরে প্রত্নতত্ত্ব কীভাবে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

তার অভিযোগ, প্রত্নতত্ত্বের মাধ্যমে খনন ও ইতিহাসের ব্যাখ্যা নিজেদের মতো করে উপস্থাপন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণের যুক্তি দেখিয়ে ফিলিস্তিনিদের জমি দখল করে ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে।

সেবাস্তিয়ার ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে প্রাচীন এই ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা তাদের সম্পর্ক একসময় বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে।

সূত্র: বিবিসি

এসএইচ/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ