|| মিযানুর রহমান জামীল ||
ছাত্রদের চোখে-মুখে বাড়ি ফেরার অনাবিল আনন্দ, কিন্তু আমাদের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠছে এক গভীর, অজানা আশঙ্কায়।
মানুষ যেমন অবধারিত মৃত্যুকে ভয় পায়, আমাদের আকাবির, আসলাফ ও বুজুর্গরা ঠিক তেমনি ভয় পেতেন ছাত্রদের এই দীর্ঘ ছুটি আর তাদের অসৎসঙ্গকে।
আজ ২২ অক্টোবর ২০২৬ মোতাবেক ১০/১১ জুমাদাল উলা ১৪৪৮ হিজরী। দেশের ছোট-বড়, বোর্ড কিংবা বোর্ডের বাইরের সিংহভাগ কওমি মাদরাসার দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষার শেষ হতে যাচ্ছে। একটি সাময়িক অধ্যাবসায় সমাপ্তির পর কিতাবগুলো আলমারিতে উঠছে, পরীক্ষার হলগুলো ফাঁকা হচ্ছে। আজই মাদরাসার চেনা আঙিনাগুলো নিথর, নিস্তব্ধ হয়ে যাবে। দীর্ঘদিনের চেনা সুরক্ষাবলয় ভেঙে (জীবনের নীতি মেনে) প্রিয় তালিবুল ইলমদের কাফেলা পা বাড়াবে নিজ নিজ বাড়ির পথে।
মাদরাসার দেয়ালগুলো কেবল ইট-পাথরের কোনো খাঁচা নয়; এগুলো হলো একেকটি জান্নাতি বাগান, এক একটি রুহানি কেল্লা। এখানে প্রতিদিন ভোরে তাহাজ্জুদের কান্না থাকে, জিকিরের গুনগুন ধ্বনি থাকে আর কিতাবের পাতায় পাতায় থাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি খোঁজার সীমাহীন আকুতি। কিন্তু যেই মুহূর্তে ছুটির ঘোষণা আসে, এই সুরক্ষাবলয়টি যেন হঠাৎ আলাদা হয়ে যায়। চেনা নিয়মের কুটির থেকে মুক্ত হয়ে ছাত্ররা যখন বাইরের চকমকে দুনিয়ায় পা রাখে, তখনই শুরু হয় আসল পরীক্ষা।
আমাদের আকাবিরগণ এই ছুটির সময়টাকে কতটা গুরুত্ব দিতেন, তা তাঁদের জীবনের দুটি ঘটনা থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায়;
১. কিতাব মাথায় নিয়ে শায়খুল হিন্দ রহ. এর কান্নার ঘটনা,
একবার দেওবন্দের মাদরাসা যখন রমজানের দীর্ঘ ছুটিতে বন্ধ হচ্ছিল, তখন সব ছাত্র আনন্দের সাথে বাড়ি ফিরে যাচ্ছিল। কিন্তু এক কোণে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদছিলেন দারুল উলুম দেওবন্দের প্রথম ছাত্র, শায়খুল হিন্দ হযরত মাওলানা মাহমুদ হাসান রহ.। তিনি কিতাব মাথায় নিয়ে কাঁদছিলেন আর বলছিলেন, "হায়! মাদরাসা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, আমাদের ইলমের সিলসিলা ভেঙে যাচ্ছে। বাড়ি গিয়ে যদি আমি অলস হয়ে পড়ি; তবে এই ইলমের নূর কীভাবে আমার ভেতরে বাকি থাকবে?" ছুটির আনন্দ নয়, ইলম থেকে দূরে যাওয়ার ভয় তাঁকে এভাবে কাঁদিয়েছিল।
২. শায়খুল ইসলাম মাদানী রহ. এর কঠোর পাহারা;
শায়খুল ইসলাম হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী রহ. যখন ছাত্রদের ছুটি দিতেন, তখন আড়ালে চোখের পানি ফেলতেন। তিনি বলতেন, "নেক পরিবেশ থেকে বের হয়ে ছাত্ররা যখন বাইরের পঙ্কিল সমাজে যাবে, শয়তান তখন তাদের শিকার করার জন্য ওত পেতে থাকবে।" এ জন্য তিনি ছুটির সময় ছাত্রদের জন্য বিশেষ আমল, জিকির এবং কিতাব মুতালাআর কঠোর রুটিন বেঁধে দিতেন, যেন ছুটির দিনগুলোতেও ছাত্ররা শয়তানের অসৎসঙ্গ ও ফেতনা থেকে বেঁচে থাকতে পারে।
অথচ আজ ছুটির এই অবসরে আমাদের কত প্রাণোচ্ছল ছাত্র অলসতার চাদর গায়ে জড়িয়ে ফেলে! হাতে চলে আসে স্মার্টফোন, চোখে জেঁকে বসে সোশ্যাল মিডিয়ার অনর্থক রঙিন নেশা আর চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে অলস আড্ডাবাজ অসৎসঙ্গের দল।
ফলাফল যা হওয়ার, তা-ই হয়। যে চোখগুলো কিতাবের জটিল ইবারত বুঝতে উস্তাদের দিকে অপলক চেয়ে থাকত, সেগুলো মগ্ন হয় গুনাহের দৃশ্যে। যে কপাল শেষ রাতে আল্লাহর দরবারে সেজদাবনত হতো, তা লুটিয়ে পড়ে অলসতার বিছানায়। কোনো শোরগোল হয় না, কোনো চিৎকার হয় না; অথচ তাদের ভেতর থেকে আদর্শগুলো একে একে কর্পূরের মতো উড়ে যায়। তাদের এতদিনের তিল তিল করে গড়া উন্নত চরিত্রে নেমে আসে এক নীরব পতন। ইলমের সেই নূরানী পথ থেকে ছিটকে পড়ে তারা হারিয়ে যায় এক অন্ধকার গোলকধাঁধায়।
আমরা কি আমাদের কলিজার টুকরো, উম্মাহর এই ভবিষ্যৎ কাণ্ডারিদের এভাবে হারিয়ে যেতে দেব? এই ছুটি যেন তাদের আত্মিক ধ্বংসের কারণ না হয়। ইলমের এই পবিত্র আমানতকে রক্ষা করতে হলে আজ উস্তাদ, অভিভাবকে এক হয়ে ভাবতে হবে। মনে রাখতে হবে, কিতাব বন্ধ হতে পারে, কিন্তু আল্লাহর গোলামি আর ইলমের সাধনা মুমিনের জীবনে কখনও ছুটি নেয় না। সুতরাং ছুটি না হোক ইলম থেকে ছুটে যাওয়ার কারণ।
কওমী মাদরাসার দীর্ঘ ছুটিগুলো কেবলই বিশ্রামের সময় নয়; বরং এটি আত্মউন্নয়ন, সমাজ গঠন ও মানবকল্যাণে আত্মনিয়োগ করার এক সুবর্ণ সুযোগ। একজন সচেতন ছাত্র এই অবসরকে কাজে লাগিয়ে নিজের ও সমাজের বহুমুখী উপকার করতে পারেন।
১. নিজের কল্যাণে ও ব্যক্তিগত উন্নয়নে করণীয় জ্ঞানচর্চা: মাদরাসার পাঠ্যবইয়ের বাইরে সমকালীন ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সাধারণ জ্ঞান অর্জন করা।
ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতা: বাংলা ভাষায় শুদ্ধ উচ্চারণ ও লেখার অভ্যাসের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও দীনি দাওয়াহর প্রয়োজনে ইংরেজি ও আরবী ভাষা শিক্ষা।
প্রযুক্তিগত জ্ঞান: বর্তমান যুগের সাথে তাল মিলিয়ে কম্পিউটার, এমএস অফিস, গ্রাফিক্স ডিজাইন বা ভিডিও এডিটিংয়ের মৌলিক বিষয়গুলো আয়ত্ত করা।
শারীরিক সুস্থতা: নিয়মিত শরীর চর্চা ও খেলাধুলার মাধ্যমে পরবর্তী শিক্ষাবর্ষের কঠিন পরিশ্রমের জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখা।
২. সমাজের কল্যাণে ও সংস্কারে ভূমিকা;
কুরআন ও দীন শিক্ষা: স্কুল-কলেজের ছাত্র ও সাধারণ মানুষের জন্য মহল্লায় স্বল্পমেয়াদী সহীহ কুরআন শিক্ষা ও বুনিয়াদী ইসলামী মক্তবের ব্যবস্থা করা।
নৈতিক অবক্ষয় রোধ: তরুণ সমাজকে মাদক, জুয়া ও ইন্টারনেটের অপব্যবহার থেকে দূরে রাখতে বন্ধুদের নিয়ে সচেতনতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ কাউন্সিলিং করা।
কুসংস্কার দূরীকরণ: সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাস ও সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রজ্ঞার সাথে মানুষকে সচেতন করা।
৩. মানুষের সেবায় ও মানবিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ
পরিবারকে সাহায্য: বাড়িতে অবস্থানকালে বাবা-মাকে তাদের গৃহস্থালি বা ব্যবসায়িক কাজে সরাসরি সাহায্য করা।
পরিবেশ ও বৃক্ষরোপণ: পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ফলজ ও বনজ গাছ রোপণ করা।
স্বেচ্ছাসেবা ও রক্তদান: অসুস্থ বা দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং জরুরি প্রয়োজনে রক্তদানের জন্য যুবকদের নিয়ে একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।
দুর্যোগকালীন ত্রাণ কাজ: বন্যা বা যেকোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে স্থানীয় তরুণদের সংগঠিত করে ত্রাণ সংগ্রহ ও বিতরণে অংশ নেওয়া।
ছুটির দিনগুলোকে অলসতায় নষ্ট না করে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে কাজে লাগালে একজন ছাত্র যেমন নিজের যোগ্যতা বাড়াতে পারবেন, তেমনই সমাজ ও রাষ্ট্র তার দ্বারা উপকৃত হবে। ছুটির সময়টাকে ইবাদত, আত্মগঠন ও সমাজসেবার সমন্বয়ে রূপ দেওয়াই হোক মাদরাসা একজন ছাত্রের মূল লক্ষ্য।
লেখক: কবি ও সম্পাদক
আইও/