মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট ২০২৬ ।। ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩ ।। ২১ সফর ১৪৪৮

শিরোনাম :
২০২৬-২৭ সালের অনুমোদিত ১২৮ ওমরাহ এজেন্সির তালিকা প্রকাশ ​মুরাদনগরের ইউএনও সারওয়ার রাব্বী গুরুতর অসুস্থ: জমিয়তের দোয়ার আহ্বান জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে ক্যাম্পাসে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান ছাত্র জমিয়তের স্মৃতির পাতায় ৫ আগস্ট ও নতুন স্বাধীনতার ভোর গুমের তদন্ত পুলিশের হাতে থাকলে ন্যায়বিচার মিলবে না: গাজী আতাউর রহমান জমিয়তের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের মজলিসে আমেলার শেষ অধিবেশন অনুষ্ঠিত ছাত্রদল-শিবিরের হামলার নিন্দা ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের সিলেট বিভাগ দিয়ে শুরু হচ্ছে বেফাক বোর্ডের মাদরাসা পরিদর্শন বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে চায় সৌদি শুক্রবার আফতাবনগরের খতমে নবুওয়াত কনফারেন্সে বয়ান করবেন দেওবন্দের মুহতামিম

স্মৃতির পাতায় ৫ আগস্ট ও নতুন স্বাধীনতার ভোর

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: আওয়ার ইসলাম

|| মুফতি শামসুল ইসলাম জিলানী ||

​জুলাই গণঅভ্যুত্থান ফ্যাসিবাদ ও জুলুমের শিকল ভেঙে মুক্তির এক রক্তাঙ্কিত ইতিহাস। হাজারো শহীদের আত্মত্যাগ আর অগণিত গাজীর পঙ্গুত্ব বরণের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের এই নতুন স্বাধীনতা। শহীদ আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিম কিংবা মাওলানা খুবাইবদের রক্তের ঋণ এ জাতি কোনোদিন শোধ করতে পারবে না। পরম করুণাময় আল্লাহর অশেষ শোকর, ইতিহাসের এই মহান বিপ্লবে সামান্যতম হলেও অংশীদার হওয়ার সৌভাগ্য আমাদের হয়েছিল।

যাত্রাবাড়ীর পথে: এক রোমাঞ্চকর ও ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা

​আমীরে হেফাজতের ঢাকামুখী মহাসমাবেশের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ৫ই আগস্ট খুব ভোরে কুমিল্লা থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় একটি মাইক্রোবাসে পথ চলা শুরু। কাঁচপুর ব্রিজে বাধার সম্মুখীন হয়ে চালক বহু গলি ঘুপচি ঘুরে অবশেষে পোস্তগোলা ব্রিজের গোড়ায় নামিয়ে দিল।

​যাত্রাবাড়ী মোড়ের প্রতিটি গলিতে পুলিশের চরম হয়রানি ও কড়াকড়ি চোখ এড়িয়ে কোনোমতে যাত্রাবাড়ী মাদরাসার পাশে অবস্থান নিলাম। এরপর কিছুক্ষণের জন্য মুফতি আমজাদ সাহেব পরিচালিত ‘জামিয়াতুল ইমামিল আজম আল ইসলামিয়া’ ঢাকায় আশ্রয় গ্রহণ করি।

​রণক্ষেত্র যাত্রাবাড়ী: প্রত্যক্ষ করা ভয়াল তাণ্ডব

বেলা বাড়ার সাথে সাথে পুরো যাত্রাবাড়ী এলাকা যেন এক ভয়াবহ রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। ​একদিকে: রাষ্ট্রযন্ত্রের পেটোয়া বাহিনীর রক্তের হোলিখেলা। ​অন্যদিকে: জাতির দামাল ছেলেদের অভাবনীয় ও অবিশ্বাস্য সাহসিকতা! ​পুলিশের মুহুর্মুহু গুলির সামনে দাঁড়িয়ে মাত্র ৪০-৫০ হাত দূর থেকে তরুণেরা ইট-পাটকেল আর গুলতি নিয়ে লড়ছিল। সামান্য কাঠ আর টিনের টুকরোকে ঢাল বানিয়ে স্বাধীনচেতা যুবকদের আত্মরক্ষার এই চাক্ষুষ ইতিহাসের সাক্ষী হলাম। ​চোখের সামনে দেখলাম পুলিশ নামক একদল হিংস্র পশুর বর্বর তাণ্ডব। একেবারে কাছ থেকে ৮-১০টি তরতাজা প্রাণ ঝরে যাওয়া প্রত্যক্ষ করলাম। পুলিশের গুলিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়া একটি ছেলের ১০-১৫ মিনিটের মৃত্যুর কাতরাণো দৃশ্য কোনোদিন ভুলতে পারব না—মাথা টার্গেট করে গুলি চালানো হয়েছিল নিশ্চিত। আহতদের সাহায্য করতে একটু দূর থেকে কয়েকজন যুবক এগিয়ে আসার চেষ্টা করতেই তাদের ওপর সোজা গুলি চালানো হলো। তাজা রক্তে ভেসে গেল রাজপথ।

​বিজয়ের আশা ও আকস্মিক ধাক্কা

দুপুর ১২টা পর্যন্ত এভাবেই তাণ্ডব চলল। এরই মাঝে খবর এলো, দুপুর ২টায় সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন। বিজয়ের আশায় বুক বেঁধে আমরা আনন্দের সাথে ফ্লাইওভারের দিকে এগোতে লাগলাম। পূর্ব দিক থেকে হাজার হাজার জনতার বাঁধভাঙা জোয়ার এসে আমাদের সাথে মিলিত হচ্ছিল। ​কিন্তু বিজয় মিছিল নিয়ে আমরা এগোতেই যাত্রাবাড়ী পুলিশ ফাঁড়ির পাশ থেকে সাউন্ড গ্রেনেড ও ফায়ার বোম্বিং শুরু হলো। মুহূর্তেই পুরো এলাকা বিষাক্ত ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল। ভ্যানগাড়িতে সারি সারি রক্তাক্ত আহত মানুষকে দেখে আবারও পিছু হটতে বাধ্য হলাম। ​দুপুর ২টা। খবর আসছে শাহবাগ, উত্তরা, মিরপুরসহ পুরো ঢাকা বিজয়ের মিছিলে উত্তাল। কিন্তু যাত্রাবাড়ীর ভয়াবহ পরিস্থিতির সাথে সেই বিজয়ের খবরের কোনো মিল পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ শুনতে পেলাম, সেনাপ্রধান ২টায় ভাষণ দিচ্ছেন না। চরম অনিশ্চয়তা ও হতাশায় চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না। ​পরিস্থিতির ভয়াবহতায় আমরা জামিয়াতুল ইমামিল আজম আল ইসলামিয়া’য় ফিরে গিয়ে জোহরের নামাজ ও দুই রাকাত নফল আদায় করলাম। নামাজের পর সমবেত কণ্ঠে কান্নায় ভেঙে পড়ে রাব্বুল আলামীনের দরবারে আকুল মিনতি জানালাম: ​"ইয়া রব! শত শত শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে এসে আমাদের পরাজিত করো না!"

​ফ্লাইওভারে বিজয়ের পতাকা ও শহীদদের রক্তস্রোত

​মুনাজাত শেষে আড়াইটার দিকে আবার সামনের দিকে এগোলাম। ফ্লাইওভারের নিচে একটানা ফায়ারিং চলছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কোনোমতে ফ্লাইওভারের উপরে উঠলাম। মুহুর্মুহু গুলি আর সাউন্ড গ্রেনেডের বিকট শব্দে চারপাশ কাঁপছিল। আতঙ্কে মাথা নিচু করে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে চলতে লাগলাম। ​রোড ডিভাইডারের আড়ালে আড়ালে ফ্লাইওভারের চূড়ায় পৌঁছুতে ৩০-৩৫ মিনিট লেগে গেল। দেখতে দেখতে ফ্লাইওভার লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল। একপর্যায়ে হাজার হাজার জনতা সমবেত হয়ে বিজয় মিছিল শুরু করলাম।

​পুরো দেশ বিজয়ের আনন্দে ভাসছে। কিন্তু যাত্রাবাড়ীতে সরকারি পেটোয়া বাহিনীর রক্তপিপাসা তখনও নিবারিত হয়নি। আমরা হাজারো জনতা এখানে জীবন-মৃত্যুর এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। পুলিশি তাণ্ডবে ধারণা করেছিলাম, হয়তো ১২-১৪ জন শহীদ হয়েছেন। পরবর্তীতে বিবিসি ডকুমেন্টারি থেকে জানতে পারি, সেদিন কেবল যাত্রাবাড়ীতেই ৫১ জন বীর সন্তান শহীদ হয়েছিলেন—যাঁদের মধ্যে আমাদের প্রিয় মাওলানা খুবাইবও ছিলেন।

​শাহবাগের দিকে গণজোয়ার ও প্রাপ্তির অনুভূতি

​ফ্লাইওভারের নিচে পুলিশের ধ্বংসলীলা কাটিয়ে চিটাগাং রোড থেকে আসা লাখো জনতার স্রোতে মিশে আমরা শাহবাগের দিকে এগোলাম। উচ্ছ্বসিত জনতার ভিড়ে কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। একদিকে মানুষ খুশিতে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে শুকরিয়া আদায় করছে, অন্যদিকে স্বৈরাচারী লেডি ফেরাউন হাসিনার ছবিতে হাজার হাজার জুতা নিক্ষেপ করছে। সেদিনের সেই আনন্দঘন মুহূর্তের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। ​এই মহান আন্দোলনে প্রায় সহস্রাধিক শহীদের মাঝে ৮১ জন আলেম ও মাদরাসা শিক্ষার্থী ছিলেন। যাত্রাবাড়ী ও হাটহাজারীসহ সর্বস্তরের তাওহীদি ছাত্র-জনতার এই নিঃস্বার্থ কুরবানী ও সাহসিকতার সঠিক মূল্যায়ন না হলে আমরা অকৃতজ্ঞ জাতি হিসেবে গণ্য হব। আর অকৃতজ্ঞদের জন্য আল্লাহর কঠিন শাস্তির হুশিয়ারি রয়েছে।​

 এই রক্তভেজা ইতিহাস থেকে আমাদের শিক্ষার দিকসমূহ

​১. বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়া: যে বৈষম্য, অন্যায় ও চরম জুলুমের বিরুদ্ধে এত রক্তের বিনিময়ে আমরা বিজয় পেলাম, এই স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো নাগরিক যেন কোনোপ্রকার বৈষম্য বা নির্যাতনের শিকার না হন। ২. বিশেষ ট্রাইব্যুনালে কঠোর বিচার: ২৪-এর দেশজুড়ে নৃশংস হত্যাকাণ্ড, ২০১৩-এর শাপলা চত্বরের গণহত্যা এবং ২০০৯-এর বিডিআর ট্র্যাজেডির পেছনে থাকা ফ্যাসিবাদী শক্তিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। এসব গণহত্যার মূল পরিকল্পনাকারী, নির্দেশদাতা, খুনি পুলিশ-ক্যাডার এবং তাদের চাটুকার আমলা ও মিডিয়া দোসরদের বিশেষ ট্রাইব্যুনালে প্রকাশ্যে কঠোরতম শাস্তি দিতে হবে। খুনিদের বিচারে কোনো রাজনৈতিক আপস বা শিথিলতা মানেই শহীদদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। ৩. শহীদ ও গাজীদের অধিকার নিশ্চিতকরণ: আন্দোলন সফল করে আমরা যারা বেঁচে আছি, আমাদের প্রথম দায়িত্ব হলো শহীদদের পরিবার এবং চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণকারী গাজীদের আজীবন সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা। ৪. আলেম সমাজের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি: জাতীয় যেকোনো সংকট ও ক্রান্তিলগ্নে মাদরাসার ছাত্র ও আলেম সমাজের যে ত্যাগী ভূমিকা, তা যেন আর কখনো ইতিহাসে চেপে রাখা না হয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের এই কুরবানীর মর্যাদা ও স্বীকৃতি দিতে হবে। ৫. শাসকদের জন্য শিক্ষা: স্বৈরাচারের পতন প্রমাণ করে, জনগণের ওপর বলপ্রয়োগ করে বন্দুকের জোরে চিরদিন ক্ষমতায় থাকা যায় না। বর্তমান ও ভবিষ্যতের সকল শাসককে এই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে অহংকার ত্যাগ করে জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করতে হবে। ৬. বিজয় রক্ষা ও সতর্কতা: বিজয় অর্জন করার চেয়ে তা রক্ষা করা কঠিন। তাই রাজনৈতিক হিংসা-দ্বেদ্ব, ভাঙচুর ও প্রতিশোধপরায়ণতা ভুলে দেশ গড়ার কাজে মনোযোগ দিতে হবে। যেন কোনো তৃতীয় পক্ষ বা ষড়যন্ত্রকারী আমাদের এই মহান বিজয়কে ছিনিয়ে নিতে না পারে।

​আল্লাহ তাআলা আমাদের এই শিক্ষাগুলো হৃদয়ে ধারণ করার এবং সে অনুযায়ী আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

লেখক: হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক এবং কুমিল্লা মহানগরীর সভাপতি

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ