নিজস্ব প্রতিবেদক
৩৬ জুলাই-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশ শাপলার চেতনার কাছে ঋণী বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির ও শাপলা স্মৃতি সংসদের চেয়ারম্যান মাওলানা মামুনুল হক।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বাদ মাগরিব রাজধানীর বায়তুল মোকাররমের পূর্ব চত্বরে ইসলামিক ফাউন্ডেশন আয়োজিত আন্তর্জাতিক ইসলামী বইমেলায় শাপলা স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে ‘শাপলা কর্নার’ উদ্বোধনকালে তিনি এ কথা বলেন।
মাওলানা মামুনুল হক বলেন, একটি জাতির রাজনীতি, বিবর্তন ও পরিবর্তনের পেছনে সংস্কৃতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জাতির সংস্কৃতি থেকেই রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি হয়। একটি জাতি তার সংস্কৃতিকে যেভাবে ধারণ করে, তার রাজনীতি ও আগামী দিনের পথচলাও সেভাবেই নির্ধারিত হয়।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের অন্তত অর্ধশতাব্দীর ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ গণজাগরণ ছিল ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে। রাসুলুল্লাহ সা.-এর ভালোবাসার পবিত্র চেতনার ভিত্তিতে এ জাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল। একজন মুমিন তার নবীর ইজ্জত রক্ষায় সর্বোচ্চ ত্যাগ ও কোরবানির জন্য প্রস্তুত থাকবে—এটাই ঈমানের দাবি। সেই ঈমানের ভিত্তিতেই শাপলার মহাজাগরণ পরিচালিত হয়েছিল।
শাপলার গণহত্যাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে দুটি ধারা স্পষ্ট হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, একটি শাপলার ধারা—যা নবীপ্রেম, ঈমান ও বিশ্বাসের ধারা; অপরটি নাস্তিক্যবাদ ও ইসলামবিদ্বেষের ধারা। ঈমান, বিশ্বাস ও রাসুলপ্রেমের এই ধারাকে কোনোভাবেই নাস্তিক্যবাদ ও ইসলামবিদ্বেষের কাছে নতজানু হতে দেওয়া যাবে না। যেকোনো মূল্যে এ চেতনাকে জাগ্রত রাখা হবে।
মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন, যা পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পথ তৈরি করেছে। একইভাবে ২০১৩ সালের শাপলার শাহাদাতের চেতনা আরও শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ভিত্তি তৈরি করেছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানও শাপলার সেই শাহাদাতের রক্তে রাঙা বুনিয়াদের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
আমিরে মজলিস বলেন, ‘৩৬ জুলাই’-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশ শাপলার চেতনার কাছে ঋণী। আগামীর বাংলাদেশকে সঠিক ধারায় পরিচালিত করতে হলে শাপলার চেতনাকে ধারণ করতে হবে। শুধু ধারণ করলেই হবে না, এ চেতনাকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দিতে হবে।
শাপলা স্মৃতি সংসদের কার্যক্রম তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০১৩ সালের শাপলা শহীদদের প্রামাণ্য তালিকা ও স্মারকগ্রন্থ ‘শহীদনামা’ প্রকাশের মাধ্যমে সংগঠনটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছে। তবে এটিকে চূড়ান্ত তালিকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি। ভবিষ্যতে নতুন কোনো শহীদের তথ্য প্রামাণ্যভাবে পাওয়া গেলে তা ‘শহীদনামা’র পরবর্তী সংস্করণে সংযোজন করা হবে।
শহীদ পরিবারগুলোর সঙ্গে সংগঠনের সম্পর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, শাপলা স্মৃতি সংসদ প্রতিটি শহীদ পরিবারের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। শহীদ ও শহীদ পরিবারের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করতে পারাকে সংগঠনটি গৌরবের ও নাজাতের মাধ্যম মনে করে।
তিনি বলেন, শাপলার চেতনাকে শুধু রাজনৈতিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর সাংস্কৃতিক ভিত্তি শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শাপলাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় শিল্প, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এ ধারা আরও বিস্তৃত করা হবে।
মাওলানা মামুনুল হক আরও বলেন, শাপলা গণহত্যার তথ্যচিত্র ও প্রামাণ্য উপস্থাপনা দেশের মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হবে। শাপলার সেই ভয়াল রাতের নির্মমতা এবং পরবর্তী সময়ে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনাও জাতির সামনে তুলে ধরা হবে।

‘শাপলা কর্নার’ সম্পর্কে তিনি বলেন, শাপলাকে কেন্দ্র করে তরুণ প্রজন্মের লেখক, সাহিত্যিক ও কবিদের রচিত বিভিন্ন বই ও প্রকাশনা এক ছাদের নিচে পাঠক-দর্শকদের সামনে তুলে ধরতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাসব্যাপী বইমেলায় ‘শাপলা কর্নার’-এর কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি শাপলা স্মৃতি সংসদের পক্ষ থেকেও নতুন নতুন প্রকাশনা প্রকাশ করা হবে।
শাপলার চেতনা ধারণ ও আগামী প্রজন্মের কাছে তা তুলে ধরার ক্ষেত্রে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ভূমিকার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে সংশ্লিষ্ট সবার দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

শাপলা স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মাদ কামাল উদ্দীনের পরিচালনায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন, মুফতি শরাফত হুসাইন, নির্বাহী সভাপতি ও বিকেএম সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আবুল হাসানাত জালালী, মাওলানা ফয়সল আহমাদ, সহসভাপতি মাওলানা হাসান জুনাইদ, মুফতি ইলিয়াস হামিদী, মাওলানা শরীফ হুসাইন, মাওলানা সানাউল্লাহ খান, টিডিএফ মহাপরিচালক মাওলানা মাসরুরুল হক, বিকেএম ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি মাওলানা সানাউল্লাহ আমিনী, সাধারণ সম্পাদক মাওলানা রাকীবুল ইসলাম, বিকেএম ঢাকা মহানগর উত্তরের সাধারণ সম্পাদক ও শাপলা স্মৃতি সংসদের কোষাধ্যক্ষ মাওলানা মুর্শিদ সিদ্দিকী, বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিসের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা জাহিদুজ্জামান, শাপলা স্মৃতি সংসদের সহসাধারণ সম্পাদক মাওলানা আফসার মাহমুদ, গবেষণা সম্পাদক মাওলানা আদনান মাসউদ, বাংলাদেশ খেলাফত ছাত্র মজলিসের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা আল আবিদ শাকের, মোল্লা খালিদ সাইফুল্লাহ প্রমুখ।
আইও/