শুক্রবার, ০৭ আগস্ট ২০২৬ ।। ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩ ।। ২৪ সফর ১৪৪৮


দুই মহীরুহের সান্নিধ্যে তিরমিজি শরিফের দরস: এক সৌভাগ্যময় স্মৃতি

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহীত

সলিমুদ্দীন মাহদী কাসেমী

আলহামদুলিল্লাহ। জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৌভাগ্য হলো ইসলামি জ্ঞানজগতের দুই মহীরুহের কাছ থেকে জামে তিরমিজি অধ্যয়নের সুযোগ লাভ করা। একজন হলেন দারুল উলুম দেওবন্দের বর্তমান মুহতামিম, মুফতি আবুল কাসেম নোমানী। অপরজন হলেন জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়ার সাবেক মুহতামিম, মুফতি আব্দুল হালিম বুখারী, যিনি আজ মহান রবের সান্নিধ্যে।

দারুল উলুম দেওবন্দে ছাত্রজীবনে হজরতের সান্নিধ্যে থাকার সময় তাঁর কাছ থেকে যতটুকু সম্ভব উপকৃত হওয়ার চেষ্টা করেছি। তিনি যেমন গভীর ইলমের অধিকারী, তেমনি ছাত্রদের প্রতি ছিলেন অকৃত্রিম স্নেহশীল। তাঁর স্নেহ ছিল পিতার মতো, আর তাঁর নসিহত ছিল অন্ধকার পথে প্রদীপের আলোর মতো পথপ্রদর্শক।

বাংলাদেশ সফরের সংবাদ শোনার পর থেকেই মন সাক্ষাতের আকাঙ্ক্ষায় ব্যাকুল হয়ে ওঠে। আলহামদুলিল্লাহ, আরজাবাদ মাদরাসায় তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের সৌভাগ্য অর্জিত হয়। প্রিয় দুই শিষ্য, মুফতি মারুফ মুজিব ও মুফতি ইসমাইল সিরাজের আন্তরিক সহযোগিতায় প্রিয় মুহাম্মদকে সঙ্গে নিয়ে সেই বরকতময় মজলিসে উপস্থিত হওয়ার তাওফিক লাভ করি।

হযরতের নসিহত ছিল অল্প কথায় গভীর জীবনের দিশা। তিনি বলেন, আমাদের আকাবিরে দীন যখন ছাত্রদের ফারেগ করতেন, তখন সর্বপ্রথম একজন তালিমি মুরব্বি নির্ধারণ করে তাঁর সঙ্গে আজীবন সম্পর্ক অটুট রাখার উপদেশ দিতেন। কারণ, মুরব্বির সোহবত মানুষকে ইলমের সঙ্গে আমল, আর আমলের সঙ্গে ইখলাসের পথে পরিচালিত করে।

দ্বিতীয় নসিহত ছিল, শুধু জাহিরি ইলম অর্জন করলেই চলবে না; এর পাশাপাশি আত্মশুদ্ধি, রিয়াজত, মুজাহাদা ও তাযকিয়ার মেহনতও অব্যাহত রাখতে হবে। জ্ঞান যদি বৃক্ষ হয়, তবে তাযকিয়া তার ফল; আর রিয়াজত সেই বৃক্ষের পরিচর্যা।

আজ তিরমিযী শরিফের ব্যাখ্যাগ্রন্থের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে হজরত তিরমিজি শরিফের এক অনন্য বৈশিষ্ট্যের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তিরমিজি শরিফ কেবল হাদিস সংকলনের একটি কিতাব নয়; এটি ফিকহ, ইজতিহাদ, ইখতিলাফের আদব এবং মুহাদ্দিসদের সূক্ষ্ম গবেষণার এক অনন্য ভাণ্ডার। ইমাম তিরমিজি (রহ.) শুধু হাদিস বর্ণনা করেননি; বরং প্রতিটি অধ্যায়ে হাদিসের ফিকহি তাৎপর্য, উলামায়ে কিরামের মতভেদ এবং তার দলিলসমূহ অত্যন্ত প্রজ্ঞার সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন। তাই তিরমিজি শরীফ শুধু একটি হাদিসগ্রন্থ নয়; এটি একজন আলিমের গবেষণামনস্কতা, ফিকহি প্রজ্ঞা ও ইলমি পরিপক্বতা গড়ে তোলার এক অনন্য শিক্ষালয়।

শেষে হজরত আমাদের দারসে নেজামি শিক্ষাব্যবস্থার একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, আমাদের শিক্ষা-ধারায় সাধারণত যাঁরা প্রথমে তিরমিজি শরিফের দরস প্রদান করেন, পরবর্তীকালে তাঁরাই সহিহ বুখারি শরিফের দরসের আসনে অধিষ্ঠিত হন। কারণ, তিরমিজি শরিফের দরস একজন উস্তাদের গবেষণাশক্তি, ফিকহি গভীরতা ও ইলমি পরিপক্বতার পরিচয় বহন করে। এক অর্থে তিরমিজি শরিফ প্রস্তুতির ময়দান, আর সহিহ বুখারি সেই অভিযাত্রার সর্বোচ্চ শিখর।

হজরতের এ কথাগুলো শুনে আমার হৃদয়ে ভেসে উঠল আমার দুই প্রিয় উস্তাদের মুখচ্ছবি। আলহামদুলিল্লাহ, যাঁদের কাছ থেকে তিরমিজি শরিফ পড়ার সৌভাগ্য লাভ করেছি, পরবর্তীকালে সেই দুই মহামান্য উস্তাদই সহিহ বুখারি শরিফের দরসের আসনে সমাসীন হয়েছেন। একজন আজও ইলমের নূর ছড়িয়ে যাচ্ছেন, আর অপরজন ইলম, আমল ও আখলাকের উজ্জ্বল উত্তরাধিকার রেখে মহান রবের সান্নিধ্যে চলে গেছেন।

আল্লাহ তাআলা আমাদের আকাবিরে দীনের ইলম, আমল, ইখলাস ও আদর্শ থেকে যথাযথভাবে উপকৃত হওয়ার তাওফিক দান করুন। তাঁদের রেখে যাওয়া ইলমি উত্তরাধিকার ধারণ করে দীনের খেদমতে জীবন উৎসর্গ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: উস্তাদ, আল জামিয়া আল ইসলামিয়া পটিয়া, চট্টগ্রাম

এমএন/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ