|| ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন ||
সরকারি প্রটোকলের মধ্যে দিয়ে আমরা লাহোরের সমাধি প্রাঙ্গণের দিকে এগিয়ে যাই। তখন বিকেলপ্রভাতের আলো ধীরে ধীরে গাঢ় হয়ে আসছিল, এবং বাতাসে মুগ্ধতার হালকা শীতল স্পর্শ। চারপাশে বিস্তৃত সবুজ বীথি, ঘাসের সমুদ্র এবং সমাধির সৌধ—সবকিছু যেন এক নিস্তব্ধ, মহিমান্বিত চিত্রপটের অংশ। লাহোরের শাহদারাতে, ১৬৪৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর, ৬৮ বছরের জীবনের পর এখানে চিরনিদ্রায় শায়িত হন এককালের অদম্য শক্তি ও প্রজ্ঞার অধিকারিণী—সম্রাজ্ঞী নূর জাহান।
আমি কলেজের দীর্ঘকালীন ইতিহাস পাঠদান থেকে জানি, নূর জাহান শুধু মুঘল সম্রাজ্ঞী ছিলেন না; তিনি ছিলেন সিংহাসনের আড়ালে ক্ষমতার প্রকৃত কেন্দ্র (Power behind the throne)। সম্রাট জাহাঙ্গীরের শিকারপ্রিয়তা, বিলাসী স্বভাব ও অসুস্থতার মধ্য দিয়ে, নূর জাহান রাজ্য চালানোর পুরো দায়িত্ব নিতেন—সত্যান্বেষী কৌশল, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং বিচক্ষণ জোটবদ্ধতার মাধ্যমে। বিদেশি পর্যটকরা তাকে দেশ শাসক হিসেবেও বর্ণনা করেছেন। তাঁর নামে মুদ্রা জারি হতো, রাজ্য পরিচালনার দায়িত্বে তিনি ছিলেন সমকক্ষ সম্রাট।
আমরা চত্বরে আসরের সালাত আদায় করি। মুঘল স্থাপত্যশৈলীর নিখুঁত সৌধ আমাদের চারপাশে যেন শিহরণ জাগায়। গাইড আমাদের সূক্ষ্ম প্রতিটি কারুকার্যের অর্থ ব্যাখ্যা করেন। সিঁড়ি দিয়ে আমরা ওপরে ওঠি; আন্ডারগ্রাউন্ডে, যেখানে সাধারণ দর্শনার্থীর জন্য প্রবেশ নিষিদ্ধ, আমরা ধীরে ধীরে নামি। মোবাইলের আলোয় অন্ধকারে সামনে অগ্রসর হই। হৃদয় ভয়ে কেঁপে ওঠে যখন দেখি, একেবারে সাদামাটা মাটির ফ্লোরে, এককালের দোর্দন্ড প্রতাপশালী সম্রাজ্ঞী চিরনিদ্রায় শায়িত। পাশে তাঁর কন্যা লাডলি বেগমের কবর। কোনো বড় মহিমা নেই—কেবল মোটা রশি দিয়ে কবর চিহ্নিত। মনে হয়, মৃত্যুর পর আর জৌলুশের প্রয়োজন নেই—কেবল শান্তি।
এক সময়ের সম্রাজ্ঞী, যিনি রাজ্য শাসন করতেন, যিনি স্থাপত্য ও শিল্পকলায় অভূতপূর্ব প্রভাব ফেলেছিলেন, আজ তিনি নিঃশব্দে এই মাটির নিচে বিশ্রাম নিচ্ছেন। সূর্য উদয় বা অস্তের সঙ্গে সমাধির দিকে আলোকরশ্মি পড়ে—প্রকৃতি যেন শেষ শ্রদ্ধা জানাচ্ছে।
এককালে তাঁর সমাধিসৌধের তাঁরই একটি কবিতার পঙক্তি উৎকীর্ণ ছিল,
بر مزارِ ما غریبان نه چراغی نه گُلی
نه پرِ پروانه سوزد، نه صدایِ بلبلی
"আমাদের মতো গরীব-অসহায়দের কবরের উপর না কোনো প্রদীপ জ্বলে, না কোনো ফুল থাকে;
না প্রজাপতির পাখা সেখানে পুড়ে, না বুলবুলের কোনো সুর শোনা যায়।"
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর 'কবর-ই-নূরজাহান্' কবিতায় এর ভাবার্থ ফুটিয়ে তুলেছেন, যেখানে বলা হয়েছে,
"গরিব গোরে দ্বীপ জ্বেলো না,
ফুল দিও না কেউ ভুলে/
শামা পোকার না পোড়ে পাখ,
দাগা না পায় বুলবুলে"
"আজকে তোমায় দেখতে এলাম জগৎ-আলো নূরজাহান!
সন্ধা-রাতের অন্ধকার আজ জোনাক-পোকায় স্পন্দমান।"
নূরজাহান ও জাহাঙ্গীর যুগ যুগ ধরে গভীর আগ্রহের বিষয় হয়ে রয়েছেন; তাঁদের সম্পর্ককে ঘিরে অসংখ্য কাহিনি, উপকথা ও জনশ্রুতি প্রচলিত রয়েছে।
নূর জাহানের প্রতিভার ছোঁয়াঃ
বহুমাত্রিক প্রতিভায় তিনি ঋদ্ধ ছিলেন নুর জাহান। অসি ও মসি দু'টোতে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত । শিল্পকলায় অসংখ্য নিদর্শন রেখ গেছেন—‘নূরমহলি’ পোশাক, ব্রোকেড বস্ত্র, লেস-সাজ, চন্দনবর্ণের কার্পেট, সারাই ও বিনোদন উদ্যান। তাঁর পিতার সমাধি নির্মাণ তত্ত্বাবধান, লাহোরের পাথর মসজিদ, নিজস্ব সমাধিসৌধ—সবই তাঁর সৃজনশীলতার সাক্ষ্য বহন করে।
ই’তিমাদ-উদ-দৌলার সমাধি, যা তিনি নিজে তত্ত্বাবধান করেছিলেন, পরবর্তীতে তাজমহলের অনুপ্রেরণা হয়েছে। কিন্তু শাহজাহানের সময় নূরজাহানকে তিনি বন্ধী করলেও, লাহোরে তিনি নিজ পরিবারসহ একটি সরল ও সংযমী জীবন কাটান। বার্ষিক দুটি লক্ষ রূপির ভাতা, এককালের সম্রাজ্ঞীর মর্যাদা—সবই কেবল অতীতের স্মৃতি।
আমরা প্রাঙ্গণে মাগরিবের সালাত আদায় করি। চারপাশে রাতের আঁধার নেমে আসে। ক্ষমতা, বিত্ত-বৈভব, এবং প্রতিপত্তি—সবই একসময় উজ্জ্বলতা ছড়িয়েছিল, কিন্তু অবশেষে লয়প্রাপ্ত হয়ে অদৃশ্য হয়। জীবনের শেষও এভাবেই নিঃশব্দে আসে। আর এটাই পৃথিবীর চিরন্তন নিয়ম।
নূর জাহান—সম্রাজ্ঞী, কৌশলী রাজনীতিবিদ, শিল্প-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক, এবং এক অনন্য নারী—আজও আমাদের কল্পনায় এবং ইতিহাসের পাতায় অমর।
লেখক: অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক ধর্ম বিষয়ক উপদেষ্টা
জেডএম/