||নওমুসলিম মুহাম্মদ রাজ||
রাতের নিস্তব্ধতায় মাঝে মাঝে আমি নিজের বুকের ভেতরেই একটা প্রশ্ন ছুড়ে দিই আমি কি সত্যিই রাসূলুল্লাহ সা.কে ভালোবাসি, নাকি শুধু মুখে বলি? আমার এই প্রশ্ন যত গভীরে নেমে যায়, তত বেশি দেখি। আমাদের প্রজন্মের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে ‘নবীপ্রেম’ নামের এক অনন্য ধন। আমরা ব্যস্ত মিউজিক, সিরিজ, ক্লাব, হিপহপ, শর্ট ভিডিও, GF BF আর পাশ্চাত্য সংস্কৃতির গ্ল্যামার নিয়ে; আর সীরাতুন্নবী সা. আমাদের বুকের শেলফে থাকলেও হৃদয়ের শেলফে জায়গা পাচ্ছে না।
চোখ বন্ধ করলেই মনের পর্দায় ভেসে ওঠে মদিনার সেই মসজিদে নববীর দৃশ্য। মাটির মসজিদ, খেজুর গাছের গুঁড়ি স্তম্ভ, ধুলোমাখা বাতাস। কিন্তু সেই সাধারণ মাটির ওপরই বসে আছেন মানবতার সেরা মানুষ আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মদ সা.। চারপাশে বসে আছেন সাহাবারা! কারও চোখে অশ্রু, কারও হৃদয়ে কাঁপা কাঁপা তৃষ্ণা। তারা বসে আছে শুধু এক চাওয়ায়: ‘আর কিছু শুনি নবীজির মুখ থেকে, আর একটু কাছে যাই, আর একটু বেশি ভালোবাসি।’
বিলাল (রা.)-কে কল্পনা করি। গরম মরুভূমির বুকে, বুকের ওপর পাথর চাপা, শরীর রক্তাক্ত, চারপাশে অত্যাচারীদের হাসি। কিন্তু তাঁর জিহ্বা থেকে শুধু একটাই শব্দ, “আহাদ, আহাদ!” আল্লাহ এক, আল্লাহ এক। এই উচ্চারণে শুধু আক্বিদা না, এর ভেতরে ছিল নবীপ্রেমের উত্তাপও কারণ যে রাসূল সা. তাঁকে তাওহীদের মিষ্টি স্বাদ চেখান, তাঁকে ছেড়ে দেওয়াটা তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল।
আবু বকর (রা.)-কে দেখি হিজরতের পথে। সওর গুহার অন্ধকারে তিনি নিজের শরীরকে বানিয়ে দিচ্ছেন ঢাল, যেন নবীজি সা. এর শরীরে একটুখানি আঘাতও না আসে। বিষধর সাপের গর্তে পা ঢুকিয়ে বসে আছেন, সাপের বিষ ধীরে ধীরে তাঁর শরীরে ছড়িয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তাঁর চোখে পানি আসে নবীর প্রতি মমতায় নিজের ব্যথায় নয়। কী অদ্ভুত এক প্রেম যেখানে নিজের কষ্ট তুচ্ছ, প্রিয় নবীর কষ্টই বড়।
উহুদের ময়দানে উম্মে আম্মারা (রা.)-কে দেখি। যুদ্ধের উত্তাপে অনেক সাহসী পুরুষ কেঁপে উঠলেও, তিনি নিজের শরীরকে বানিয়ে নিলেন নবী সাঃ এর রক্ষার বর্ম। তলোয়ারের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েও তাঁর জিহ্বায় উচ্চারিত হচ্ছিল, “আমার বাবা-মা আপনার জন্য কুরবানি হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ!” নিজের জীবনকে বাজি ধরে তারা পাহারা দিয়েছে এক মানুষকে; কিন্তু সে মানুষটা আমাদের কাছে শুধু কতগুলো বইয়ের কাভারে বন্দি হয়ে আছে।
তারপর আমি তাকাই আমাদের দিকে! এই যুগের তথাকথিত স্মার্ট, ডিজিটাল, আপডেট প্রজন্মের দকে। আমরা নাকি উম্মতে মুহাম্মদ সাঃ। আইডি কার্ডে “Islam” লেখা, দেয়ালে আরবি ক্যালিগ্রাফি, বাসায় একটা কুরআন কিন্তু আমাদের প্লেলিস্টে কী আছে, আমাদের ওয়াচ হিস্টরিতে কী আছে, আমাদের ঘোরাফেরা, রিলেশনশিপ, লাইফস্টাইলে কী আছে সেগুলো যদি আয়নার মতো সামনে চলে আসে, তখন কি সত্যিই বলতে পারব, ‘আমি নবীজিকে ভালোবাসি’?
নতুন কোনো গান রিলিজ হলে সঙ্গে সঙ্গে জেনে যাই; নতুন কোনো সিরিজ এলে রাত জেগে দেখি; নতুন কোনো ট্রেন্ড হলে প্রথমেই রিল বানাই। কিন্তু শেষ কবে আমরা একটা পূর্ণ সীরাত লেকচার মনোযোগ দিয়ে শুনেছি, শেষ কবে নবীজি সাঃ এর চোখের অশ্রুর কোনো ঘটনা শুনে আমাদের চোখে পানি এসেছে, সেটা হয়তো মনে করতেও কষ্ট হয়। আমরা একেকজনকে ‘আইডল’ বানিয়ে ফেলেছি গায়ক, অভিনেতা, র্যাপার, ইউটিউবার কিন্তু যে মানুষটাকে আল্লাহ নিজে ‘উসওয়াতুন হাসানাহ’ বলেছেন, তাকে অনুকরণের তালিকায়ই রাখিনি।
GF–BF কালচারকে আমরা এখন ‘নরমাল’ বলে মেনে নিয়েছি। ক্লাব-কালচার, হারাম ফ্লার্ট, গোপন চ্যাট, লুকানো কল এসবকে আমরা ‘মডার্ন লাইফ’ বলে সাজিয়ে নিয়েছি। কিন্তু যখন কেউ নবীপ্রেম, সুন্নাত, হালাল হারামের কথা বলে, তখনই আমরা বলি, ‘ভাই, এত এক্সট্রা হওয়া ঠিক না; ঈমান তো মনে আছে!’ মনে ঈমান রাখার এই ধারণার আড়ালে লুকিয়ে থাকে আমাদের গুনাহের প্রতি আসক্তি আর দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা।
আমরা অনেক সময় সমাজ, কালচার, ইউটিউব, নেটফ্লিক্স, ফ্রেন্ড সার্কেল এসবকে দায়ী করি। বলি, ‘সময়টা খারাপ’, ‘জগৎটা বদলে গেছে’, ‘পরিবেশ ভালো না’। সব কথা আংশিক সত্য। কিন্তু শেষ হিসাবের দিন আল্লাহ যখন জিজ্ঞেস করবেন,
‘তোমার কান দিয়ে কী শুনেছ? চোখ দিয়ে কী দেখেছ? সময় কোথায় ব্যয় করেছ?’ সেখানে আমি ‘কালচার’-এর নামে আদালতে দাঁড়িয়ে পার পেয়ে যাব না। আমার স্ক্রিন, আমার কানে হেডফোন, আমার হাতে মোবাইল এই সিদ্ধান্ত তো শেষ পর্যন্ত আমিই নিয়েছি।
সাহাবাদের কেউ জোর করে নবীপ্রেমী বানায়নি। তারা নিজেরা ঠিক করেছিলেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সা. আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। এই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল না কোনো রোমান্টিক ডায়লগ, ছিল বাস্তব কুরবানি: ঘর ছেড়ে হিজরত, রক্ত দিয়ে যুদ্ধ, রিজেক হারিয়ে আল্লাহর পথে ধরা, নিজের ইচ্ছাকে কুরবানি করে সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরা। আমাদের সামনে আজও সেই রাস্তা খোলা, শুধু যুদ্ধটা বদলে গেছে তলোয়ারের বদলে স্ক্রিন, ময়দানের বদলে নিউজফিড, শত্রুর বদলে গুনাহের কালচার।
নবীপ্রেম আসলে কেমন? এটা শুধু আবেগী স্ট্যাটাস না; মাহফিলে গিয়ে দু’ফোঁটা কান্না করা না; ইউটিউবে ‘নশিদ প্লেলিস্ট’ বানিয়ে রাখা না। নবীপ্রেম মানে নিজের সম্পূর্ণ লাইফস্টাইলকে ধীরে ধীরে তাঁর সুন্নাতের দিকে ফিরিয়ে আনা। আল্লাহর রাসূল সাঃ যা ভালোবেসেছেন, আমিও তা ভালোবাসব; তিনি যা অপছন্দ করেছেন, তা থেকে আমি দূরে থাকার চেষ্টা করব এই সিদ্ধান্তের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ঈমানের এক বিশাল ইবাদত।
আমরা যারা আজ ইয়াং আমরাই আগামী দিনের এই উম্মাহর মুখ। আমাদের হাতে স্কিল আছে, ট্যালেন্ট আছে, সোশ্যাল মিডিয়া আছে, ইনফ্লুয়েন্স আছে। যদি এই সবকিছু শুধু ট্রেন্ড, ফান আর ফলোয়ারের পেছনে খরচ হয়ে যায়, তাহলে কেয়ামতের দিন এগুলোই আমাদের আফসোসের পাহাড় হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু যদি আমরা নবীপ্রেমকে কেন্দ্র করে আমাদের স্কিল সাজাই গান গাওয়ার গলা দিয়ে নাশিদ, স্পিচের গিফট দিয়ে দাওয়াত, ভিডিও এডিটিং দিয়ে হালাল কনটেন্ট, লেখার ট্যালেন্ট দিয়ে হৃদয় ছোঁয়া ঈমানি লেখা তাহলে হয়তো আমরা ‘সাহাবাদের মতো না’, কিন্তু ‘সাহাবি-মনা’ এক প্রজন্ম হিসেবে দাঁড়াতে পারি।
আজ যদি আমরা সত্যিকারের তওবা করি, গোপন গুনাহগুলো আল্লাহর সামনে খুলে বলি, স্ক্রিনের আড়ালে করা প্রতিটি ভুলের জন্য কান্নায় ভিজে যাই, আর সিদ্ধান্ত নিই ‘এখন থেকে আমার সময়, আমার কান, আমার চোখ, আমার হৃদয় সবকিছু নবীপ্রেমের পথে ব্যবহার করব’ তাহলে এখনো দেরি হয়ে যায়নি। আল্লাহর দরজা আজও খোলা, নবীজি সাঃ এর উম্মত হওয়ার গৌরব আজও আমাদের জন্য উন্মুক্ত।
হে আল্লাহ,আমাদের এই হারিয়ে যাওয়া প্রজন্মকে ক্ষমা করে দিন। আমাদের বুক থেকে গুনাহের নেশা টেনে বের করে, তার জায়গায় নবী সাঃ এর সুন্নাতের প্রেম বসিয়ে দিন। আমাদের রাতগুলো হারাম বিনোদনের বদলে ইস্তেগফার, দোয়া আর কাঁদায় ভরে দিন। আমাদের দিনগুলোকে খেদমত, দান, দাওয়াত আর সুন্নাতের আলোয় সাজিয়ে দিন।
যেন কেয়ামতের ময়দানে, যখন সব নফস ‘নফসি, নফসি’ বলবে, তখন আমরা আপনার প্রিয় রাসূল সা. এর মুখে শুনতে পারি, ‘এরা আমার উম্মত, এরা আমার তরুণেরা; ফিতনার অন্ধকারেও এরা আমার সুন্নাত আঁকড়ে ধরেছিল।’
এই প্রত্যাশা, এই কান্না আর এই ফিরে আসার আকুতি নিয়েই আমি লিখছি। নিজেকেও বদলানোর জন্য, আমার মতো হারিয়ে যাওয়া হৃদয়গুলোকেও জাগিয়ে তোলার জন্য।
লেখক: মহাপরিচালক- হাফেজ্জী চ্যারিটেবল সোসাইটি অব বাংলাদেশ
এলএইস/