শিরোনাম :
মৃত্যুর আগে যে অসিয়ত করে গেছেন ড. ইউসুফ কারজাবি
নভেম্বর ০৪, ২০২২ ১০:২১ পূর্বাহ্ণ

মুফতি গোলাম রাজ্জাক কাসেমী: বিশ্বখ্যাত লেখক, গবেষক, চিন্তক ও সংগঠক আলেম আল্লামা শায়খ ড. ইউসুফ কারজাবি সম্প্রতি ইন্তেকাল করেছেন। বিশ্বজুড়ে ইসলামি মহল ও জ্ঞানের জগতে এখনও চলছে তাকে নিয়ে বিপুল চর্চা ও আলোচনা।

তিনি বিশ্বের আলেম ও ইসলামের সেবায় নিবেদিতদের উদ্দেশে মূল্যবান কিছু ওসিয়ত করেছেন। বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতি ও মুসলিম উম্মাহর ক্রান্তিকালে উপদেশগুলো খুবই দরকারি বিবেচনায় পাঠকদের জন্য তা আরবি থেকে অনুবাদ করেছেন গোলাম রাজ্জাক কাসেমী
১। আলেমদের বন্ধুত্ব হবে কেবল আল্লাহ ও তার দ্বীনের জন্য। বন্ধুত্ব হতে হবে জাতি-সম্প্রদায়, সংস্থা-সংগঠন ও ব্যক্তি প্রভাবমুক্ত। হ্যাঁ, তাদের সঙ্গেও সম্পর্ক হবে। তবে তা হবে কোরআন-সুন্নাহর মানদণ্ড অনুযায়ী।

২। যাবতীয় কর্মের ভিত্তি যেন হয় কোরআন ও সুন্নাহ। সালাফ ও ইসলামের মহান পূর্বসুরিরা যেভাবে ইসলামকে বুঝেছেনÑ সেভাবেই দ্বীনের ওপর চলার চেষ্টা করুন। কালের আবর্তে সীমালঙ্ঘনকারীদের বিকৃতি, ভ্রান্তদের অপপ্রচার এবং মূর্খদের অপব্যাখ্যার ফলে যে সংশয় ও বেদআতের সূত্রপাত হয়েছে ইসলামকে সেসব থেকে হেফাজত করুন।

৩। জালেম ও স্বৈরাচারদের সামনে দৃপ্ত কণ্ঠে সত্য উচ্চারণ করুন। তাদেরকে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করুন। এ ক্ষেত্রে কোনো তিরস্কারকারীর তিরস্কার এবং কোনো জালেমের দাপটের ভয় করবেন না। এ কাজের প্রশংসা করে আল্লাহ তাআলা বলেনÑ ‘তারা আল্লাহর বাণী প্রচার করত, আর তাকে ভয় করত এবং আল্লাহকে ছাড়া অন্য কাউকেও ভয় করত না। আর হিসাব গ্রহণকারীরূপে আল্লাহই যথেষ্ট।’ (সুরা আহযাব : ৩৯)

৪। মুআজ ইবনে জাবাল ও আবু মুসা আশআরিকে (রা.) ইয়েমেনে পাঠানোর সময় রাসুল (সা.) যে ওসিয়ত করেছিলেন তা সব সময় চোখের সামনে রাখুন।

রাসুল (সা.) তাদের বলেছেন, ‘সহজ কর, কঠিন করো না। সুসংবাদ দাও, দুঃসংবাদ দিয়ো না। আনুগত্য কর, বিরোধ করিও না।’ আলেমদের জন্য সব সময় বিশেষত এই যুগে ওই উপদেশ আরো বেশি তাৎপর্যময়। অর্থাৎ আলেমগণ সহজ ও কোমল পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। শক্ত ও রূঢ় আচরণ পরিহার করবেন। কারণ আল্লাহ তাআলা সব বিষয়ে কোমলতা পছন্দ করেন। এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেন ‘যদি আপনি রূঢ় ও কঠোরচিত্ত হতেন তবে তারা আপনার আশপাশ থেকে সরে পড়ত।’ (সুরা আলে ইমরান : ১৫৯)

সহজতা বলতে শাখাগত বিষয়ে সহজ হওয়ার কথা বুঝাচ্ছি; মৌলিক বিষয়ে নয়। এই ভিত্তিতেই আমরা মানুষের সঙ্গে মিশবো। তাই এই যুগে যারা ফরজ কাজ আদায় করে এবং কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে তাদেরকে আমাদের বন্ধু বানাবো। আমাদের দলভুক্ত ভাববো। যদিও কখনো কখনো ছোটখাটো অন্যায়-অপরাধ তাদের থেকে প্রকাশ পায়। পাশাপাশি হিকমতের সঙ্গে সদুপদেশ দিতে থাকবো যেন তাদের অবস্থার উন্নতি হয়। এদের বিরোধিতা করা এবং দ্বীনের দুশমন ভাবা হবে মারাত্মক ভুল। ইসলামের শত্রুরা তখন তাদেরকে পুষে ইসলাম ধ্বংসের কাজে ব্যবহার করবে।
৫। সময় ও প্রেক্ষাপটকে জানুন। ইসলাম ও উম্মাহর শত্রুদের চিনে রাখুন। সময়ের ভাষা বুঝুন। সমকাল ও গন্তব্য সম্পর্কে বে-খবর থেকে নিজেদেরকে, শিক্ষার্থীদেরকে এবং জাতিকে শাখাগত দ্বন্দ্বে শেষ করে দিবেন না। বিশেষ করে ইসলামের দুশমন এবং প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের প্রবাহ সম্পর্কে সজাগ থাকুন। এগুলো আমাদের সন্তানদের কাছে নাস্তিকতা ও ধ্বংসের পথ খুলে দেয় এবং আমাদের মূল্যবোধ ও শরিয়তকে তাদের কাছে গুরুত্বহীন করে তোলে।

এই ধ্বংসাত্মক প্রবাহ আমাদের জন্য বড় ঝুঁকিপূর্ণ। ব্যক্তিত্ব ও মূল্যবোধের হেফাজত করতে এবং ধ্বংসের হাত থেকে সুরক্ষা পেতে এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় চিন্তা-ভাবনা ও চেষ্টা ব্যয় করুন।

৬। ‘ইজমায়ি বিষয়ে পরস্পর সহযোগিতার হাত বাড়াবো এবং ইখতিলাফি বিষয়ে একে অপরকে ক্ষমা করব।’ এই আলোকিত নীতিমালা হোক আমাদের পথ চলার পাথেয়।

৭। যতটুকু সম্ভব সমকালীন জ্ঞানে নিজেকে সজ্জিত করুন। ইমাম গাজালি (রহ.) দর্শনশাস্ত্রে পাণ্ডিত্য অর্জন করার পরই কিন্তু ওই শাস্ত্রের লাগাম টেনে ধরতে সক্ষম হয়েছেন এবং সেখানে দ্বীনের সৌন্দর্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) ভ্রান্ত মতবাদ নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করেছেন। এমনকি ইহুদিবাদ ও খ্রিস্টবাদ নিয়েও প্রচুর পড়েছেন। ফলে তিনি সব ভ্রান্ত দলের খণ্ডন এবং তাদের বিভ্রান্তি নিরসন করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি শুধু শরিয়াহ বিষয়েই ইমাম ছিলেন না, যুক্তিবাদ বিষয়েও প্রাজ্ঞ ছিলেন।
আলেমদের জন্য সাধ্যানুযায়ী আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান যথা : মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাজনীতি, নীতিশাস্ত্র এবং দর্শনশাস্ত্র ও তার মাজহাব-ইতিহাস সম্পর্কে জানার বিকল্প নেই।

৮। উপরোক্ত বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করতে রাষ্ট্রের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মাদরাসা ও জামিয়ার কেবল প্রথাগত কর্মচারী হওয়ার ভাবনা থেকে বের করে নিজেদেরকে দাঈ ও চিন্তাশীলদের কাতারে শামিল করুন। প্রথাগত কর্মচারী ও দাঈর মাঝে পার্থক্য হলো প্রথম শ্রেণী ইসলামের মাধ্যমে রুটিরুজির ব্যবস্থা করে। আর দ্বিতীয় শ্রেণী ইসলামের জন্য বাঁচে, ইসলামের জন্য মরে।

৯। ইসলামি বিশ্বের সঙ্গে পরস্পর সম্প্রীতি ও সম্পর্ক অটুট রাখুন। কারণ আলেমসমাজ একটি বড় শক্তি। তাদের আছে বিশাল জনগোষ্ঠী, অনুুসারী ও প্রভাব-প্রতিপত্তি। প্রতিটি দেশে আলেমগণ এক হয়ে ইসলামি বিশ্বের মাঝে সমন্বয় ও সহযোগিতা বাস্তবায়ন করুন। ইসলামের শত্রুরা আমাদের ছোট ছোট ইখতিলাফগুলোর ব্যাপারে ভালো করেই জানে। যা আলেমদেরকে বিভক্ত করে রেখেছে।

তারা এসবের জট পাকিয়ে স্থায়ী সংকট তৈরি করার পাঁয়তারা করছে এবং একে পুঁজি করেই পরস্পর বিরোধ তৈরি করে যাচ্ছে। তারা কখনো কোনো এক শ্রেণীর সমর্থন করে বুঝাতে চায় যে, তারা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তাদের পক্ষে আছে। মূলত এরা সবারই বিরুদ্ধে এবং সবারই দুশমন। নিঃসন্দেহে এসব জঘন্যতম ষড়যন্ত্র। আমাদেরকে আরো সজাগ ও সতর্ক হতে হবে। যেন তাদের ষড়যন্ত্রকে তাদের বিরুদ্ধেই ফিরিয়ে দিতে পারি।

১০। ইসলামের সুমহান আদর্শে সমাজকে রাঙিয়ে তুলছে এমন প্রতিটি ইসলামি দাওয়াতি কার্যক্রমের পাশে থাকা এবং যথাসাধ্য সহযোগিতা ও রাহবারি করা আলেমদের কর্তব্য। আল্লাহর ভাষায়, ‘ওই ব্যক্তির চেয়ে আর কার কথা উত্তম যে আল্লাহর দিকে আহ্বান জানায় এবং সৎ কাজ করে। আর বলে, অবশ্যই আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা ফুসিলাত : ৩৩)

অনুবাদক: মুহাদ্দিস ও বিভাগীয় প্রধান (আরবি ভাষা ও সাহিত্য) মদিনাতুল উলুম মাহমুদিয়া, নারায়ণগঞ্জ।

-এটি

সর্বশেষ সব সংবাদ