fbpx
           
       
           
       
কওমি মাদরাসা পরিদর্শনে ইরানি চিন্তাবিদ, স্যোশাল মিডিয়ায় নানা তর্ক
আগস্ট ১৯, ২০২২ ৭:০১ অপরাহ্ণ

|| কাউসার লাবীব ||

ইরানী চিন্তাবিদ ড. সাইয়েদ আলী রেযা মাহদী মুসাভী বেশ কিছু সময় ধরে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। ঘুরে দেখছেন দেশের বিভিন্ন স্থাপনা ও ঐতিহাসিক স্থান। গতকাল বৃহস্পতিবার তিনি সফর করেন দেশের প্রাচীন বেশকিছু মাদরাসা। এর মধ্যে রয়েছে হাটহাজারী, মেখল, বাবুনগর, পটিয়া মাদরাসা। সবশেষে তিনি সফর করেন জিরি মাদরাসা।

জিরি আল জামিয়া আল আরাবিয়া পরিদর্শন কালে তিনি জামিয়ার বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখেন। জামিয়া প্রধান মাওলানা হাফেয খোবাইব এর সাথে দীর্ঘক্ষণ নানা বিষয় বিশেষত ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করেন। শিক্ষার্থীরা তাঁকে পন্দনামা ও গুলিস্তাঁ থেকে আবৃত্তি করে শোনালে তিনি বেশ সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। খানাকায়ে আবরারিয়া পরিদর্শন শেষে তিনি তালিমের পাশাপাশি তাযকিয়ার ব্যবস্থা দেখে অভিভূত হন।

এ সময় তার সফরসঙ্গী ছিলেন ইরান দূতাবাসের পাবলিক রিলেশন্স ডিপার্টমেন্টের উপ পরিচালক জনাব মুহাম্মদ সাঈদুল ইসলাম, লেখক-প্রাবন্ধিক মাওলানা শায়খ ওসমান গণি ও জনাব আমজাদ হোসেন।

ইরানী চিন্তাবীদের কওমি মাদরাসা প্রদর্শনের বিভিন্ন মাধ্যমে স্যোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় নানা তর্ক। বিষয়টিকে বিভিন্ন কারণে নেতিবাচকভাবে দেখছেন অনেকেই।

বিষয়টি নিয়ে লেখক, আলেম সাংবাদিক মুফতি এনায়েতুল্লাহ তার ফেসবুকে লিখেন, প্রটোকল বলে একটা শব্দ আছে। প্রটোকলের নির্ধারিত কোনো সংজ্ঞা নেই। দাপ্তরিক রীতিনীতি, আদব-কায়দা, আচরণবিধি, সৌজন্যতা ও শিষ্টাচারের মতো বিষয়কে প্রটোকল বলা হয়। অর্থাৎ ব্যক্তির পদমানক্রম অনুসরণ করত সম্মান ও মর্যাদা দেওয়াকে প্রটোকল বলে।
প্রটোকলের আওতায় এক রাষ্ট্র আরেক রাষ্ট্রের সঙ্গে সৌজন্যমূলক আচরণ করে। তদ্রুপ রাষ্ট্রীয় পদে সমাসীনরা পদমর্যাদা অনুযায়ী মূল্যায়িত হন।

রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে শুরু করে মসজিদ-মাদরাসা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সব জায়গায় নিজ নিজ প্রটোকল কঠোরভাবে মানা হয়। বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও কার্যক্রম প্রটোকল মেনে পালন করা হয়। যেমন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে মোবাইল ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত, এটা মেনেই আপনাকে এ জাতীয় অনুষ্ঠানে যেতে হবে। এখানে এটাই প্রটোকল। আবার কোনো অতিথিকে স্বাগত জানাতে সমমর্যাদার কাউকে পাঠানো কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও আচরণবিধি।

এর ভিন্নতা কূটনৈতিক অশিষ্টাচার। প্রটোকল নিয়ে এমন ‘ত্যানা প্যাচানোর’ কারণ অবশ্য ভিন্ন। এর আগে বলে রাখি, প্রকাশযোগ্য এবং অফিসিয়াল, প্রকাশযোগ্য নয় কিন্তু অফিসিয়াল, অপ্রকাশযোগ্য আন অফিসিয়াল, সৌজন্য সাক্ষাত এবং ফটোসেশনের জন্য সাক্ষাতের আলাদা আলাদা মূল্য রয়েছে।

সাক্ষাতপ্রার্থী ও সাক্ষাতদাতা উভয়কেই সমান পদমর্যাদার হতে হবে, এমন নয়। এটা হয়ও না। কিন্তু সাক্ষাতটি কোনো পর্যায়ের সেটা নির্ণয় করা জরুরি। এক্ষেত্রে আগত ব্যক্তির আসন নির্ধারণ ও সম্বোধনসহ নানা কিছু জড়িত।

এবার আসি মূল প্রসঙ্গে।
সম্প্রতি ড. সাইয়্যেদ আলী রেযা মাহদি মুসাভী (পরিচয় স্পষ্ট নয়) নামের এক ইরানি নাগরিক চট্টগ্রামের জিরি, হাটহাজারী, মেখল, বাবুনগর ও পটিয়া মাদ্রাসা পরিদর্শন করেছেন। তন্মধ্যে জিরি মাদরাসার মুহতামিমের সঙ্গে তার সাক্ষাতপর্বের গ্রুপ ছবি প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে ড. মুসাভীর পরিচয়ে বলা হয়েছে- ইরানের ধর্মতত্ত্ববিদ, ড. সাইয়েদ আলী রেযা মাহদী মুসাভী তেহরানের বাসিন্দা। তিনি রাজনীতি বিজ্ঞানে ডক্টরেট করেছেন এবং ৩০টি গ্রন্থের প্রণেতা। মাতৃভাষা ফার্সি ছাড়াও আরবি, ইংরেজি ও উর্দু ভাষায় তার দক্ষতা রয়েছে। তার সফরসঙ্গী ছিলেন ইরান দূতাবাসের পাবলিক রিলেশন্স ডিপার্টমেন্টের উপ-পরিচালক মুহাম্মদ সাঈদুল ইসলাম, প্রাবন্ধিক মাওলানা শায়খ ওসমান গণি ও আমজাদ হোসেন।

ইরানি নাগরিকের বিভিন্ন মাদরাসা পরিদর্শন নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা চলছে। আমার মতে সাক্ষাতটি বিশেষ করে জিরি মাদরাসার মুহতামিমের সঙ্গে পাশাপাশি বসার ছবিটা প্রটোকল মেনে হয়নি। সাক্ষাতটি যদি শুধু সৌজন্যমূলক হতো, তাহলে ছাত্রদের সঙ্গে আলোচনা, গুলিস্তার শের শোনানোর পর্যায়ে যেত না। সৌজন্য সাক্ষাতের সঙ্গে ছাত্রদের সংশ্লিষ্টতার অর্থ ভিন্ন। সেটা নিয়ে আরও বিস্তর আলাপ হতে পারে।

তবে আগমনের কারণ স্পষ্ট করে, পরিচয় প্রকাশ করে শুধু শিয়া নয়, যেকোনো ধর্মের লোক যেকোনো মাদরাসা পরিদর্শন, মুহতামিমের সঙ্গে সাক্ষাত ও মাদরাসার শিক্ষা কার্যক্রম দেখার অধিকার রাখেন। এ বিষয়ে কারও কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু সেটা হতে হবে প্রকাশ্যে, আগমনের কারণ উল্লেখ করে প্রটোকল মেনে।

ভাষাবীদ ও গবেষক আলেম মহিউদ্দীন ফারুকী লিখেন, শিয়াদের নীরব দাওয়া ও দাওয়াত থেকে সাবধান। এদের আক্বীদা সম্পর্কে সচেতন হোন। মাদরাসা পরিদর্শনে সমস্যা নেই। আমার বক্তব্য হচ্ছে, পরিচয় স্পষ্ট করে যিয়ারত, পরিদর্শন হতে পারে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করলে বা কেউ সাথে থাকলেই সে প্রতিষ্ঠান বা তিনি নির্দিষ্ট ঘরানার হওয়া জরুরী নয়। তাই কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দোষারোপ করা উচিত হবে না।

লেখক সাংবাদিক ও তরুণ আলেম ওয়ালি উল্লাহ আরমান জিরি মাদরাসা সফরের পুরো নিউজটি শেয়ার করে লিখেন, কোনো প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করলে বা কেউ সাথে থাকলেই সে প্রতিষ্ঠান বা তিনি নির্দিষ্ট ঘরানার হওয়া জরুরী নয়। তাই কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দোষারোপ করা উচিত হবে না।

গবেষক আলেম লুতফেরাব্বি আদনান লিখেন, প্রায় ৪ বছর আগে মিশরে শরনার্থী হিসাবে আগত এক সিরিয়ান প্রফেসরের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছিল। আমি বাংলাদেশী জেনে কাছে ডেকে খুব দরদমাখা কন্ঠে বললেন: ‘তোমাদের দেশসমূহে শিয়াদের প্রভাব বিস্তারে বিভিন্ন পরিকল্পনা চলছে। দেশে ফিরে এই বিষয়ে কাজ করো। নাহলে অদূর ভবিষ্যতে পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে….’। তিনি ইরানের কেন্দ্রীয় মুফতীর অধীনে কাজ করেছিলেন কিছু দিন। শিয়াদের পরিকল্পনা সম্পর্কে বলতে গিয়ে এক ভয়ংকর তথ্য দিয়েছেন তিনি। মুফতীর বক্তব্য অনেকটা এমন: ‘আমাদের উদ্দেশ্য হলোঃ হযরত উমর রাঃ পারস্যের যে আগুন নিভিয়েছিলেন সেই আগুন পূনরায় প্রজ্জ্বলিত করা। এছাড়া বর্তমানে যা দেখছো তার সবই “তাক্বিয়া”!’ ঘটনা যাই হোক, শিয়াদের মুসলিম বিদ্বেষ ও বিধ্বংসী পরিকল্পনা সম্পর্কে যারা কিঞ্চিতও অবগত তারা কখনোই সুর নরম করে কথা বলতে পারেনা।

আরেক তরুণ আলেম ওবাইদ আশরাফ লিখেন, ১৯৯০/৯১সাল। কুমিল্লা কাসেমুল উলূম মাদরাসায় পরিদর্শনে আসে সে সময়কার ইরানী রাষ্ট্রদূত। মাদরাসায় দান করবে। তৎকালীন শায়খে সানী তাঁকে মাদরাসা ঘুরিয়ে নিয়ে আসলেন শাইখুল হাদীস আশরাফ উদ্দীন রহ এর কামরায়। যেখানে তখন চলছিল বুখারী শরীফের দরস। তিনি বললেন, কে? শায়খে সানী বললেন, হুজুর! ইরানের রাষ্ট্রদূত। তখন তিনি বললেন, ধূর! হাদীসের দরসে শিয়া। এখানে কেন? যান। ভদ্দলোক তখনি মাদরাসা প্রস্থান করে। আর দেয়নি কোন অনুদানও। এই ছিল তাদের ঈমান আর গায়রত!

এরপর তিনি ফাতাওয়ায়ে শামির উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেন, শিয়াদের বিষয়ে হানাফীদের দু’টি মত পাওয়া যায়। এর মধ্যে প্রণিধানযোগ্য মতে তাদের তাকফিরের বিষয়টিই বলা হয়েছে।

শ্যোসাল মিডিয়া বিষয়টি নিয়ে নানা বিতর্ক শুরু হলে আমরা যোগাযোগ করি ড. আ ফ ম খালিদ হোসাইন’র সঙ্গে। তিনি জানান, ইরানী স্কলারের জিরি মাদরাসা সফর ছিল সাধারণ একটি বিষয়। তিনি জানতে পারেন চট্টগ্রাম অঞ্চলের মাদরাসাগুলোতে ফার্সি পড়ানো হয় এবং এসব মাদরাসা ছাত্র-শিক্ষক ফার্সি ভাল দক্ষ। তাই তিনি চট্টগ্রামের হাটহাজারী, মেখল, বাবুনগর, পটিয়া ও সবশেষে জিরি মাদরাসা সফর করেন।

তিনি কোনো মজলিসে কথাও বলেননি বা তার আকিদা বিষয়ে কোনো কিছু উল্লেখও করেননি। একজন মেহমানকে যেভাবে সম্মান করতে হয় আমরা তাকে সেভাবে সম্মান করেছি। বিষয়টি নিয়ে কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ হওয়া কাম্য। শিয়াদের ব্যাপারে দারুল উলুম দেওবন্দের আদর্শ, মুফতি তকি ওসমানী ও মুফতি রফি ওসমানীর ফতোয়ার সাথে আমি পূর্ণ একমত।

কেএল/এটি

সর্বশেষ সব সংবাদ