fbpx
           
       
           
       
‘চলে গেলেন শেষ আশ্রয়স্থল আল্লামা নূরুল ইসলাম জিহাদী রহ.’
ডিসেম্বর ০১, ২০২১ ৮:১৬ অপরাহ্ণ

মাওলানা আশরাফ আলী নিজামপুরী।।

দেশের সর্ববৃহৎ অরাজনৈতিক সংগঠন “হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ” ও “আন্তর্জাতিক মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুওত বাংলাদেশে”র মহাসচিব এবং ঢাকাস্থ খিলগাঁও মাখযানুল উলূম মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও শাইখুল হাদীস আল্লামা নূরুল ইসলাম জিহাদী রহ. গত ২৯ নভেম্বর (সোমবার) ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।)

আল্লামা নূরুল ইসলাম রহ. ছিলেন বিদগ্ধ ও বিজ্ঞ আলেমেদ্বীন, ঈমানী চেতনার এক মশালবাহী সিপাহসালার ও দরদী অভিভাবক। তিনি ছিলেন আকাবিরে দেওবন্দের একজন বিরল অনুসারী। তাঁর মতো ইলমী প্রজ্ঞা, আধ্যাত্মিক চেতনা, নৈতিক কর্তব্যপরায়ণতা, মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক সম্প্রীতি, অতিথিপরায়ণতা, বিনয়, ভদ্রতাসহ বহু উন্নত বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল এমন গুণী মানুষের সংখ্যা সমাজে খুবই কম। প্রখর মেধা, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, সূক্ষ্ম চিন্তার অধিকারী ছিলেন তিনি।

তার ধৈর্য্য, কর্মদক্ষতা এবং স্থিরতা ছিল অনন্য। যার জ্বলন্ত প্রমাণ—তার দ্বীনের প্রতি আত্মত্যাগ ও পাহাড়সম ধৈর্য এবং বিভিন্ন প্রান্তিকতা ও চতুর্মুখী ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও ধৈর্য্যের সাথে দ্বীনের পথে অটল থেকে তার বুদ্ধিবৃত্তিক দুঃসাহসিক অভিভাবকত্ব, যা আমাদের মুগ্ধ করেছে।

।। এক নজরে বর্ণাঢ্য জীবন ।।

তিনি ১৯৪৮ সালে চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি থানাধীন ধুরুং গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম জনাব আব্দুর রশীদ।

প্রাথমিক জীবনে তার পড়ালেখা শুরু হয় নাজিরহাট বড় মাদরাসায়। সেখানে তিনি পবিত্র কুরআনুল কারীমের হিফযসহ হেদায়াতুন্নাহু জামাত পর্যন্ত অত্যন্ত মেধা ও প্রজ্ঞার সাথে অধ্যয়ন করেন। অতঃপর তিনি উম্মুল মাদারিস দারুল উলূম হাটহাজারীতে চলে আসেন। সেখানে তিনি তাঁর সম্মানিত ওস্তাযদের সুহবতে থেকে অত্যন্ত সুনামের সাথে অধ্যয়ন করেন এবং ১৯৭৪ সালে হাটহাজারী মাদরাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স) সমাপ্ত করেন।

পড়ালেখা শেষ করার পর তিনি চট্টগ্রামের কৈয়গ্রাম মাদ্রাসা, বাবুনগর মাদ্রাসা এবং ঢাকার আশরাফুল উলূম বড় কাটারা মাদরাসায় দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেন। অতঃপর ১৯৮৪ সালে তিনি রাজধানী ঢাকার অন্তর্গত খিলগাঁও-এ আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া মাখযানুল উলূম মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। প্রিয় নবীজীর প্রতি ছিল তাঁর অগাধ ভালবাসা।খতমে নবুওয়তের কাজ করার জন্য তিঁনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুওয়ত বাংলাদেশ’। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মুকাররমের তদানীন্তন খতিব মরহুম আল্লামা উবাইদুল হককে সভাপতি করে তিনি মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কাদিয়ানী ফিতনার বিরুদ্ধে লেখালেখি সহ অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন তিনি। তাঁর ওয়াজের বিষয়বস্তুই ছিল খতমে নবুওয়ত এবং ফিতনায়ে কাদিয়ানী। তাঁর শ্রম, মেধা ও শক্তি দিয়ে কাদিয়ানীদের কাফের ঘোষণা করার জন্য জীবনের শেষমুহুর্ত পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।

উম্মুল মাদারিস দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারীর সাথে তার শিকড়ের সম্পর্ক ছিল। ছাত্র জীবন থেকেই তিনি জামিয়ার মাটি ও মানুষের সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলেন‌। তার উন্নত চারিত্রিক মাধুর্যতা, নিপুণ বিচক্ষণতা এবং অনন্য প্রজ্ঞা দেখে তৎকালীন উস্তাযদের অন্তরের অন্তঃস্থলে জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি।উস্তাযদের প্রতি ছিল তাঁর অগাধ শ্রদ্ধা ও ভালবাসা।

তাঁর সম্মানিত উস্তাযদের সুহবত আর ভালবাসায় ইলমী সুধা পান করে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। তখন থেকেই জামিয়ার মাটি ও মানুষের সাথে তাঁর গভীর সম্পর্কের সূচনা হয়। সে সম্পর্ক এত গভীর যে যার কারণে হাটহাজারীর মাটিতেই (জামিয়ার কবরস্থানে) তার প্রিয় উস্তায ও শাইখ আল্লামা শাহ আহমদ শফী রাহ.-এর কবরের পাশেই তাকে সমাহিত করা হয়।

হাটহাজারী মাদরাসার সাথে তার এত গভীর সম্পর্ক ছিল যে, তৎকালীন মুহতামিম উস্তাযুল আসাতিযা শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী রাহ. তাকে হাটহাজারী মাদরাসার সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কমিটি ‘মজলিসে শুরা’র অন্যতম সদস্য হিসেবে নির্বাচন করেন।

এরপর থেকে মৃত্যু অবধি জামিয়ার বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে অনন্য ভূমিকা রাখেন আল্লামা নূরুল ইসলাম রাহ.।

।। আত্মার সম্পর্ক ।।

তাঁর সাথে আমার সম্পর্ক ছিল আত্মার সম্পর্ক । ছাত্রজীবন থেকেই তাঁর সাথে আমার পরিচয় ও সুসম্পর্ক ছিল। তিনি আমাকে খুবই মুহাব্বত ও স্নেহ করতেন। যখনই হাটহাজারী মাদরাসায় আসতেন মেহমানখানায় আমাকে ডেকে পাঠাতেন । ঐকান্তিকভাবে তার সাথে কোশল বিনিময়সহ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় হত। ১৯৯৭ সনে সাতক্ষীরা বংশীপুর মাদরাসার বার্ষিক সভায় শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী রাহ. ও আল্লামা নূরুল ইসলাম জিহাদির সফরসঙ্গী হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার এবং সুন্দরবন পরিদর্শন করার জন্য নৌকায় চড়ে ভ্রমণের কথা আজও আমার মনে পড়ে। সর্বশেষ গত ১ অক্টোবর ‘২১ ইং ঢাকার প্রেসক্লাবে আল্লামা শাহ আহমদ শফী রাহ., আল্লামা জুনাঈদ বাবুনগরী রাহ. ও আল্লামা মুফতী আব্দুচ্ছালাম চাটগামী রাহ.-এর জীবন, কর্ম ও অবদান শীর্ষক আয়োজিত সেমিনারে তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে আমি ঢাকায় গিয়েছিলাম। সেমিনার শেষে তাঁর প্রতিষ্ঠিত খিলগাঁওস্থ মাখযানুল উলূম মাদরাসায় আমার একান্তভাবে অনেক কথাবার্তা হয়েছিল তাঁর সাথে। সাথে হাটহাজারী মাদরাসার সিনিয়র শিক্ষক ডক্টর নূরুল আবছার আযহারী সাহেবও ছিলেন। দীর্ঘ দুই ঘণ্টাব্যাপী আলাপচারিতার পরও তিনি যেন আমাকে ছাড়তেই চাইছিলেন না। একপর্যায়ে তিনি বলেন “হাটহাজারী মাদরাসার কাউকে পেলে আমি আমার অসুস্থতার কথা ভুলে যাই” সেদিন কথায় কথায় অনেক সময় পার করে দিয়েছিলেন তিনি।

আহ! যদি আমি জানতাম তিনি এর কয়েকদিন পর মাওলার ডাকে সাড়া দিয়ে চলে যাবেন, তাহলে তার কাছে আরও সময় চেয়ে নিতাম। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস আমরা আরেক নিভৃতচারী অভিভাবককে হারালাম। সত্যি তার এই চলে যাওয়া ইলমী কাননের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেলো!

দিনদিন আমরা ছায়াহীন হয়ে যাচ্ছি। বিগত এক-দেড় দশকে আমরা অনেক বিদগ্ধ আলেম ও অকৃত্রিম অভিভাবক হারিয়েছি।

এমন অভিভাবক সঙ্কটের মাঝেও যাঁদের উপস্থিতি, জ্ঞান-প্রজ্ঞা, সাহসিকতা ও প্রেরণায় হকের পথে আদর্শিক অভিযাত্রায় আমরা অকৃত্রিম ছায়া ও মায়ার পরশ পেতাম আল্লামা নুরুল ইসলাম রাহ. ছিলেন তাদেরই একজন।

আমি তাঁর মৃত্যুতে খুবই মর্মাহত, ব্যথিত ও শোকাভিভূত।
মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে দরখাস্ত করছি,আল্লাহ তা’আলা যেন তাঁকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন।

লেখক: বিশিষ্ট লেখক ও সিনিয়র মুহাদ্দিস, দারুল উলূম হাটহাজারী মাদরাসা, চট্টগ্রাম।

এনটি