আদর্শ সমাজ গঠনে রাসুল সা. প্রতিষ্ঠিত হিলফুল ফুজুলের তাৎপর্য
সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২১ ৪:১১ অপরাহ্ণ

আবদুর রশীদ।।

মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা. ছিলেন সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব। যিনি মানুষের মাঝে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সর্বদা কাজ করেছেন৷ তিনি যেমনি ছিলেন দয়ালু ও অতিব কোমল হৃদয়ের অধিকারী, তেমনি ছিলেন জুলুম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধী৷ তিনি ছিলেন মানবজাতির পথপ্রদর্শক এবং তাঁর জীবন জুড়ে রয়েছে মানবজাতির জন্য অনুপম আদর্শ৷ একমাত্র তাঁর আদর্শে একটি জাতি সভ্য ও সফল হিসেবে গড়ে উঠতে সক্ষম৷

রাসূল সা. এর জীবনের এমন একটি কাজ রয়েছে যা আজও মানবজাতিকে শান্তির পথ দেখিয়ে আসছে৷ যার নাম ‘হিলফুল ফুজুল’ বা শান্তিসংঘ৷ মাত্র ২৫ বছর বয়সে, নবুয়তপ্রাপ্তির ১৫ বছর পূর্বে তিনি এ কাজটি করেছিলেন৷ রাসূল সা. আরব সমাজের অনৈতিকতা, শোষণ ও নির্যাতন বন্ধের লক্ষ্যে তাঁর সমবয়সী কিছু যুবককে নিয়ে এই ‘হিলফুল ফুজুল’ বা শান্তিসংঘ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন৷ এ সংঘের প্রতিটি কর্মসূচি প্রতিটি যুবসমাজের জন্য শিক্ষনীয়৷ একটি আদর্শ সমাজ গঠনে বর্তমান ‘হিলফুল ফুজুল’-এর নীতিমালা প্রয়োগ খুবই জরুরী ৷

‘হিলফুল ফুজুল’-এর নীতিমালা বর্তমান সমাজে প্রয়োগের মাধ্যমে যেভাবে আদর্শ সমাজ গঠন করা যায়—

মজলুম ও অসহায়দের সাহায্য করা: সমাজে নানা প্রকৃতির মানুষের বসবাস একটি প্রাকৃতিক বিষয়৷ ধনী-গরিব, বড়-ছোট ও সাধা-কালো বিভিন্ন স্বভাবের মানুষ একটি সমাজে জীবন কালাতিপাত করে৷ তাই মাঝে মাঝে গরিবরা ধনীদের কর্তৃক শোষিত হয়, ছোটরা বড়দের কর্তৃক শাসিত হয় এবং কালো মানুষ সাধা মানুষ কর্তৃক হেয় প্রতিপন্নতার পাত্র হয়৷ অসহায় মানুষের অবস্থান চরম অসহায়ত্বে নিমজ্জিত হয় এবং সমাজে জালেমদের কর্তৃক সাধারণ মানুষ জুলুমের শিকার হয়৷ সুতরাং, সমাজের এই অপনীতি রোধ করতে হলে জালেমদের জুলুম রুকতে এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে একটি ‘হিলফুল ফুজুল’-এর মত যুবকদের নিয়ে শক্তিশালী ন্যায়নীতি সংঘ প্রতিষ্ঠা করতে হবে৷

যারা সমাজের সর্বপ্রকার অন্যায় বন্ধে নিজেদের উৎসর্গ করবে৷ অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়াতে এবং সামাজিক শৃঙ্খলতার কাজে বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের ক্ষেত্রে অর্থের প্রয়োজনীয়তা একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়৷ তাই এর জন্য অর্থনৈতিক ‘কর্জে হাসানা’ ফান্ড প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য৷

সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা: সমাজে প্রতিনিয়ত ছোট-বড় সমস্যা দেখা দেওয়া স্বাভাবিক ৷ তবে সমস্যা সমাধানের বিশেষ কার্যকরী ভূমিকা থাকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ৷ সমাজে কিছু কিছু মানুষ রয়েছে যারা সমস্যাকে আরো জটিলতার রূপ দিতে পছন্দ করে; ফলে সমস্যা আরো ভয়ঙ্কর রূপ নেই ৷ এনটা কোনো ধরনের কাম্য নয় ৷ যার বা যাদের সামনে উচ্চশৃঙ্খলতা দেখা দিবে, সাথে সাথে তাদের উচিত শক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করে সমস্যা নিরসনে এগিয়ে আসা ৷ সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সমাজের গণ্যমান্য মানুষ, মেম্বার ও চেয়ারম্যানের শরণাপন্ন হওয়া উচিত ৷ এর বাইরেও যদি এমন একটি শান্তি সংঘ প্রতিষ্ঠা করা যায়, যা সমস্যা সমাধানে সবচেয়ে কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে সক্ষম ৷ তবেই সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব ৷

বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে মৈত্রী ও প্রীতির সম্পর্ক স্থাপন করা: একটি সমাজের পাশাপাশি আরো অন্যান্য সমাজের বসবাস থাকে এবং এক এলাকার মানুষ অন্য এলাকার মানুষের সাথে ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি৷ যদি মৈত্রী ও সম্প্রীতি গড়ে তোলা যায়, তাহলে যে কোনো প্রকার উদ্যোগ নেওয়া, কর্মসূচি গ্রহণ করা ও প্রয়োজনীয় কোনো অভিযানে বের হওয়া অনেকটাই সহজ হবে ৷ ফলে একটি সফল শক্তিতে পরিণত হবে। এ মৈত্রী ও সম্প্রীতি গড়ে তোলতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে— এর মধ্যে বিবাহ বন্ধন একটি অন্যতম সফল মাধ্যম৷

পথিক ও মুসাফিরের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা: দূরদূরান্ত থেকে মানুষ বিভিন্ন সমাজ বা এলাকা অতিক্রম করে যার যার নির্দিষ্ট গন্তব্য পানে ছুটে চলে৷ পথিমধ্যে তাদের বিভিন্ন স্থানে বিরতি গ্রহণ করতে হয় ৷ মুসাফির ব্যক্তিগণ মাঝখানে নামায ও খাবারের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন স্থানে বিরতি গ্রহণ করে৷ তাই তাদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উক্ত নির্দিষ্ট স্থানের বাসিন্দাদের উপর কর্তব্য৷ এছাড়াও পথহারা পথিকের সঠিক স্থান দেখিয়ে দেওয়াও অত্যন্ত অপরিহার্য৷ সুতরাং, এমন একটি সমাজ গঠনে ‘হিলফুল ফুজুল’-এর মতো একটি শান্তিসংঘের দাবিদার৷

কোনো জালেমকে মক্কায় প্রবেশ করতে না দেয়া এবং দুষ্কৃতকারীদের অন্যায় আগ্রাসন প্রতিরোধ করা: সাধারণত এই পয়েন্টে মক্কার কথা আসলেও প্রতিটি স্থানে এর ব্যবহার গুরুত্বের দাবিদার৷ যেমন- প্রতিটি মসজিদ ও মাদ্রাসায় কোনো জালেমকে প্রবেশ করতে না দেওয়া।

অর্থাৎ- ইসলামী প্রতিষ্ঠানগুলোতে কোনো অসৎ ও জালেম ব্যক্তিকে পরিচালনার দায়িত্বে ক্ষমতার আসনে সমাসীন না করা৷ দূর্ভাগ্যবশত বর্তমান পরিস্থিতির দিকে লক্ষ্য করলে দেখায় যায় যে, প্রতিটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অসৎ ও জালেমদের পদচারণা অত্যধিক৷ অপরদিকে বিভিন্ন দুষ্কৃতকারীদের বসবাস থাকে প্রতিটি সমাজে৷ তাই তাদের সর্বপ্রকার অহেতুক আচরণের দাঁত ভাঙ্গা জবাবের ব্যবস্থা করা আবশ্যক ৷ এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে একটি শক্তিশালী শান্তিসংঘ অপরিহার্য৷

সর্বোপরি একটি শান্তিসংঘ প্রতিষ্ঠা করতে আমরা বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারি— প্রথমত, সমাজের একটিভ যুবকদের বাঁচায় করা ৷ দ্বিতীয়ত, সব যুবকদের একটিভ রাখতে সাংগঠনিক কার্যকরী ভূমিকা পালন করা ৷ তৃতীয়ত, সব যুবকদের নিয়ে একটি সোশাল সাইট থাকা এবং সেখানে সমাজের নানা বিষয় তুলে ধরা ও সমস্যা নিরসনে সকলে মিলে সরাসরি তার পদক্ষেপ গ্রহণ করা ৷ চতুর্থত, উক্ত সংঘের ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক ‘কর্জে হাসানা’ ফান্ড থাকা চাই ৷ উক্ত শান্তিসংঘের মাধ্যমে সামাজ কল্যাণমূখী বিভিন্ন উদ্যোগ ও কর্মসূচি গ্রহণ করা ইত্যাদি ৷

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এখন মানুষের বিচরণ মহাকাশে৷ কিন্তু আজও মানুষের জীবনে শান্তি নেই৷ দূর্নীতি, সন্ত্রাস, ধর্ষণ, খুন, ছিনতায় ও নারী নির্যাতন ইত্যাদি মানুষের জীবনকে অস্থির করে তুলছে ৷ জবরদখল, জালিয়াতি, শ্রমিকের পাওনা অনাদায়, আত্মসাৎ ও মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড এখন নিত্যদিনের খবর৷ পাশ্চাত্যের অপসংস্কৃতীর সয়লাবে ভেসে যাচ্ছে বর্তমান যুব সমাজ৷ যাদের হাতেই ধ্বংস হত সমাজের অন্যায়; আজ তাদের হাতেই ধ্বংস হচ্ছে প্রতিটি সমাজ৷ তাই রাসূল সা.-এর আদর্শের প্রতি যুবকদের ফিরে আসতে হবে৷ তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘হিলফুল ফুজুল’-এর আলোকে আদর্শ সমাজ গঠনে প্রতিটি যুবককে আত্মনিয়োগ করতে হবে ৷ আল্লাহ তা’য়ালা রাসূল সা.-এর সফল শান্তিসংঘের কর্মসূচি প্রতিটি সমাজে বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমাজের অন্যায়-অনাচার দূর করার পাশাপাশি শান্তি প্রতিষ্ঠা করার তৌফিক দান করুক ৷ আমিন !

লেখক: শিক্ষার্থী, সরকারি সিটি কলেজ চট্টগ্রাম।

-এটি