ভ্যাকসিন গ্রহণ রাসূল সা.-এর সুন্নতেরই অনুসরণ: মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ
জুলাই ২৮, ২০২১ ৮:৪৭ অপরাহ্ণ

নুরুদ্দীন তাসলিম।।

ইসলামে চিকিৎসার গুরুত্ব ও করোনার টিকা বিষয়ে শরয়ী দৃষ্টিকোণ:

‘করোনা ভাইরাস থেকে সুরক্ষিত থাকতে ভ্যাকসিন নেওয়ার কথা বলছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। রোগ থেকে মুক্ত ও সুস্থ থাকতে ডাক্তারের উপর আস্থা ও ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণের ব্যাপারে ইসলামের কোন ধরনের বিরোধ নেই,- আওয়ার ইসলামকে এক বিশেষ আলাপচারিতায় বলছিলেন দেশের অন্যতম ফিকহ বিশেষজ্ঞ, রাজধানীর শাইখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারের মহাপরিচালক মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ।

করোনা ভাইরাস থেকে সুরক্ষিত থাকতে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের মানুষও টিকা নিচ্ছেন, নেবেন। টিকা গ্রহণ নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে নানা ধরণের কথা।-এর শরয়ী দৃষ্টিকোণ নিয়ে জানতেও সাধারণের মনে আগ্রহের কমতি নেই। ইসলামে চিকিৎসার গুরুত্ব, করোনার টিকা গ্রহণে শরয়ী দৃষ্টিকোণ ও টিকা সম্পর্কিত বেশ কিছু বিষয়ে আওয়ার ইসলামের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে প্রতিবেদককে এ কথা বলেন মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ।

এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে গিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্ণনা করেছেন, মৃত্যু ছাড়া এমন কোন রোগ নেই যার চিকিৎসা নেই’।

‘মৃত্যু সবার জন্য অবধারিত। তবে কার মৃত্যু কখন ঘটবে এ ব্যাপারে কেউ নিশ্চিত না। তাই হাদিসের বাণী অনুযায়ী মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রত্যেক রোগের চিকিৎসা আছে এবং তা গ্রহণে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা নেই’।

রাসূল সা. চিকিৎসা গ্রহণের আদেশ দিয়েছেন, নিজেও চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন:

‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদিসের মাধ্যমে চিকিৎসা নিতে শুধু উৎসাহিত করেন নিয়ে ববং আদেশ দিয়েছেন- বলছিলেন তিনি।

তার ভাষায়, ‘চিকিৎসায় উৎসাহ আর আদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবন। তিনি নিজেও রোগ সারাতে চিকিৎসা নিয়েছেন; যার স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে হাদিসের কিতাব সমূহে।

‘বুখারী শরীফের হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাথা ব্যথা হয়েছিল। তিনি আবু তাইয়্যেবা নামে একজনকে ডেকে নিজের মাথা হিজামা করতে করিয়েছিলেন। এর বিনিময়ে তিনি তাকে দিনার অথবা খাদ্য সামগ্রী দিয়েছিলেন’।

এছাড়া রাসুল সালাম-এর জীবনে কায়ী করার বর্ণনা পাওয়া যায়। কায়ী বলা হয় লোহা জাতীয় বস্তু গরম করে ব্যথার জায়গায় সেক দেওয়া। বর্তমান আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে থেরাপি বলা হয়, তাই হাদিসের যুগের কায়ী বলে উল্লেখ করেন মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ।

‘থেরাপির মাধ্যমে মানুষ অনেক ব্যাধি থেকে আরাম লাভ করে থাকে। থেরাপির মাধ্যমে  নিজেও চিকিৎসা নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি’।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চিকিৎসা গ্রহণ বিষয়ে তিনি আরো বলেন, ‘এছাড়াও হাদীসে বর্ণিত হয়েছে কোন এক সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রচন্ড জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন। জ্বর থেকে সুস্থতায় তিনি উম্মাহাতুল মুমিনীনদের বলেছিলেন তাকে লুদুদ করাতে। লুদুদ বলা হয় নাকে দপ দেওয়া’।

আরেক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমকে বলেছেন আমাকে একটা বরতনে( পাত্রে) বসাবে এরপর  ৭ পুকুর থেকে স্বচ্ছ পানি নিয়ে এসে তা আমার শরীরে ঢালবে। সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম রাসূলের নির্দেশ অনুযায়ী এমনই করেছিলেন। এর মাধ্যমে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন।

এগুলো ছিল হাদিসের আলোকে তিব্বুন নববী( নবীজি সাল্লাল্লাহু সালামের চিকিৎসা)’র চিত্র।

তিনি আরো বলেন,  ‘আল্লামা ইবনুল কাইয়ুম যাওযী রহ. যাদুল মাআদ নামে কিতাব লিখেছেন, যার চতুর্থ খন্ড পুরোটাই রাসূল সাল্লাল্লাহু সাল্লাম ও সাহাবীদের চিকিৎসা নিয়ে’। ইসলামের চিকিৎসার গুরুত্ব নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। যার অন্যতম প্রমাণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চিকিৎসা বিষয়ে বিস্তর এই কিতাব’।

‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চিকিৎসা গ্রহণে মুখে আদেশ করেছেন এবং নিজের জীবনেও চিকিৎসা গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন করেছেন। তাই বর্তমান যুগে করোনাসহ যাবতীয় রোগ ও রোগ নিরাময়ে ডাক্তারদের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণে কোন ধরনের সন্দেহের অবকাশ নেই’।

আল্লাহ তায়ালার ওপর আস্থা-বিশ্বাস রেখেই চিকিসা গ্রহণ করতে হবে:

মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদের ভাষায় চিকিৎসা গ্রহণের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো; ডাক্তারের কাছ থেকে ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রীকে মুসলমান কখনো রোগ থেকে মুক্তির মৌলিক উপকরণ মনে করতে পারবে না। চিকিৎসা গ্রহণের সাথে সাথে মুসলমানের মনে অবশ্যই এই বিশ্বাস থাকতে হবে যে, আল্লাহ তায়ালাই সব ধরনের রোগ থেকে শেফা দানকারী’।

‘আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি সালাম-এর মাধ্যমে রোগ থেকে মুক্তির জন্য আমাদের চিকিৎসা গ্রহণের কথা বলেছেন এজন্যই আমরা চিকিৎসা গ্রহণ করছি। মূলত রোগ থেকে মুক্তি দাতা আল্লাহ তায়ালা। ওষুধগুলো মাধ্যম ছাড়া কিছু নয়’।

‘আল্লাহ তায়ালার উপর পুরোপুরি বিশ্বাস রেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণে ঔষধ-ভ্যাকসিনকে রোগ নিরাময়ের মাধ্যম মনে করে তা গ্রহণ করলে এটা শুধু জায়েজ নয়; বরং সওয়াবের কাজ’ বলে মনে করেন মুফতি মিযানুর রহমান সাঈদ।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা, হজ ও ওমরায় অগ্রাধিকার পেতেও  ভ্যাকসিন গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:

তিনি বলছেন, ভ্যাকসিন গ্রহণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আরো একটি দিক হলো; করোনাভাইরাস-এর বিধি-নিষেধ শেষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়টি সামনে এলে সরকার হয়তোবা তাদের নিয়ম অনুযায়ী ভ্যাকসিনকে প্রাধান্য দিয়ে সেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা বিষয়টি প্রাধান্য দেবেন যারা ভ্যাকসিন নিয়েছেন। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ক্ষেত্রে এবং তা সুশৃংখলভাবে পরিচালিত হওয়ার ক্ষেত্রে ভ্যাকসিন নেওয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। ভ্যাকসিনকে প্রাধান্য দিয়েই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার ঘোষণা আসাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়; বলছিলেন মুফতি মিযানুর রহমান সাঈদ।

এক্ষেত্রে তিনি বলছেন, ‘আমরা খেয়াল করেছি বিধি-নিষেধ ও নির্দিষ্ট পরিসরে এ বছর যে হজ পালিত হল সেখানে সেসব লোকেরাই সুযোগ পেয়েছেন যারা ভ্যাকসিনের নিয়েছেন। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি হজ ও ওমরার ওপর সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেওয়ার পরেও ভ্যাকসিন গ্রহীতারা প্রাধান্য পেতে পারেন , এক্ষেত্রে বাকিরা পিছিয়ে থাকার সম্ভাবনাও অমূলক নয়’।

‘ভ্যাকসিন গ্রহণে চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দিন’

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার ক্ষেত্রে সরকার ভ্যাকসিন গ্রহণকে প্রাধান্য দিলে ভ্যাকসিন গ্রহণ না করে থাকলে তখন জটিলতা তৈরি হতে পারে তাই সরকারের এমন ঘোষণার আগেই ১. নিজেদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা। ২. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নতের অনুসরণ। ৩. আল্লাহ তায়ালার উপর পরিপূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস। ৪. শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার সুবিধার্থে, হজ ও ওমরায় আগ্রাধিকার পেতে দেশের ওলামায়ে কেরাম, ছাত্র ও সর্বস্তরের মানুষকে ভ্যাকসিন গ্রহণে উৎসাহিত করেছেন মুফতি মিযানুর রহমান সাঈদ।

ভ্যাকসিন নিয়ে বিভ্রান্তি:

‘ভ্যাকসিন নেওয়ার পরেও আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে তাহলে নিয়ে কি লাভ? ভ্যাকসিন নিলে তাড়াতাড়ি মৃত্যু হবে, ভ্যাকসিন-এর মাধ্যমে শরীরে কি প্রবেশ করানো হচ্ছে তা বুঝা সম্ভব নয়, এর মাধ্যমে বড় ধরনের অসুস্থতায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল’ ভ্যাকসিন বিষয়ে মানুষকে নিরুৎসাহিত করতে এ ধরনের বিভিন্ন বিভ্রান্তিমূলক কথা যারা ছড়াচ্ছেন তাদের কাছে শক্তিশালী কোন দলির আছে বলে আমার জানা নেই বলছেন মুফতি মিযানুর রহমান সাঈদ। তিনি বলছেন, এসব ধারণাপ্রসূত এক ধরনের গুজব। তাই এসব গুজবে কান দেয়া উচিত হবে না বলে মনে করেন এই ফকিহ।

প্রসঙ্গত, করোনা ভাইরাস থেকে সুরক্ষায় বাংলাদেশ সরকার গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে টিকা দেওয়া শুরু করলেও মাঝখানে টিকার সরবরাহসংকটে বেশ কিছুদিন কার্যক্রম বন্ধ ছিল। তবে কয়েক দিন আগে থেকে আবারও টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আগামী ৭ আগস্ট থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে টিকাদান কার্যক্রম শুরুর সিদ্ধান্ত হয়েছে।

অ্যাস্ট্রাজেনেকার, সিনোফার্ম, ফাইজার-বায়োএনটেক আর মডার্নার টিকা মিলিয়ে দেশে এখন পর্যন্ত ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৪ হাজার ৪৭৯ জন মানুষ করোনা (কোভিড-১৯) টিকার আওতায় এসেছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর রহমান স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানা গেছে।

এটি