মোস্তফা ওয়াদুদ
নিউজরুম এডিটর
যারা ইসলামবিরোধী তারাই দেশবিরোধী বলে মন্তব্য করেছেন হেফাজতে ইসলামের যুগ্মমহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক। তিনি বলেন, আমি এ কথাটি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চাই, যারা বাংলাদেশ বিরোধী তারা ইসলাম বিরোধী। আর যারা ইসলাম বিরোধী তারাই বাংলাদেশ বিরোধী।
আজ শনিবার (১২ ডিসেম্বর) বিকালে রাজধানীর মুহাম্মদপুর জামে মসজিদে (মারকায মসজিদ) অনুষ্ঠিত ‘রাবেতাতুল ওয়ায়োজীন বাংলাদেশ’ এর উদ্যোগে আয়োজিত এক ইসলাহী মাহফিলে তিনি এসব কথা বলেন।
বক্তব্যের শুরুতেই শায়খুল হাদিস আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমীর সুস্থতার জন্য দোয়া চেয়ে মাওলানা মামুনুল হক বলেন, সর্বপ্রথম আমি অত্যন্ত ভগ্নহৃদয় এবং গভীর বেদনা নিয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে প্রার্থনার হাত প্রসারিত করে বলছি, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেনো এ জাতির কর্ণধার, শায়খুল হাদিস আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী হাফিজাহুল্লাহ তাআলা। আল্লাহ তায়ালা যেন তার ছায়াকে আমাদের উপর দীর্ঘায়িত করেন। আল্লাহর কুদরতের কাছে কোন কিছুই অসম্ভব নয়। আমরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করি, আমার আল্লাহ পাকের কুদরতের কাছে সবকিছু সম্ভব। আমরা কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি আল্লাহ তা'আলা যেন হযরতের হায়াত দীর্ঘায়িত করেন।
এরপর তিনি ইসলামী সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পয়েন্ট নিয়ে আলোচনা করেন। সর্বপ্রথম পয়েন্ট ছিল ইসলামের সূচনালগ্নে সাহাবীদের মধ্যে যে দুটি পক্ষ তৈরি হয়ে সাহাবায়ে কেরামের মাঝে যে সকল সংঘাতগুলো তৈরি হয়েছিল। সে সংঘাত গুলোর মাঝে আমরা একটি তৃতীয় পক্ষের অনুপ্রবেশ লক্ষ্য করে থাকি। ইসলামের ইতিহাসে যাদেরকে খারেজী সম্প্রদায় বলে আখ্যায়িত করা হয়। খারেজী মানে হল যারা অতিমাত্রায় উগ্র। উগ্রপন্থী একটি গোষ্ঠী। তারা সাহাবায়ে কেরামের উভয় পক্ষের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে উভয়পক্ষকে যুদ্ধে এবং সংঘাতে জড়িয়ে দেয়ার যাবতীয় কৌশল অবলম্বন করেছিল। আজকেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমার কাছে মনে হচ্ছে, যেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রকে, প্রশাসনকে এবং আলেম সমাজকে একটি সংঘাতে জড়িয়ে ফেলবার জন্য তৃতীয় একটি উগ্রপন্থী, বাংলাদেশবিরোধী, ইসলামবিরোধী একটি চক্র সুকৌশলে অপতৎপরতা পরিচালনা করছে।
সংগঠনের সভাপতি মাওলানা আব্দুল বাসিত খানের সভাপতিত্বে ও মাওলানা হাসান জামিলের পরিচালনায় এতে উপস্থিত ছিলেন, মুফতি হাবীবুল্লাহ মাহমুদ কাসেমী, মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী, মাওলানা জালালুদ্দিন আহমেদ, মুফতি রাফী বিন মুনীরসহ সংগঠনের ওয়ায়েজীনগণ।
এ সময় তিনি আরো বলেন, এই চক্রটি লক্ষ্য করছে যে এদেশের আলেম সমাজ তাদের অব্যাহত প্রচেষ্টার মাধ্যমে তাদের ভূমিকার মাধ্যমে তারা সমাজে, জাতির কাছে, এমনকি প্রশাসন এবং রাষ্ট্রের কাছেও তারা গুরুত্বপূর্ণ একটি অবস্থানে রয়েছে। দেশ-জাতির যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আলেমদের কাছে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি কি সে বিষয়টিও লক্ষ্য রাখতে প্রশাসন এবং রাষ্ট্র বাধ্য হচ্ছে। এই অবস্থান তৃতীয় অপশক্তির ইসলামবিরোধী এবং বাংলাদেশবিরোধী শক্তির সহ্য হচ্ছে না। আর না হয় খুবই যুক্তিপূর্ণ ভাষায় আমি কথা বলেছি, আমি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে চ্যালেঞ্জ করে বলছি, ভাস্কর্য ইস্যুতে আমার কোন একটি শব্দ একটি অক্ষর বাংলাদেশের সংবিধান, বাংলাদেশের রাষ্ট্র, এমনকি প্রশাসনের কোনো আইন এবং শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে আমি দেইনি।
আমার বিরুদ্ধে অপরাজেয় বাংলার সেখানে দাঁড়িয়ে কারা প্রথমে উস্কানি দিয়েছিল। তারাই বাংলাদেশ বিরোধী। তারা ইসলামবিরোধী। তারা চাইছে আজকে বাংলাদেশ যে স্থিতিশীল। সে স্থিতিশীলতা ধ্বংস করে এদেশের সরকার এবং প্রশাসনকে এদেশের আলেম সমাজের বিরুদ্ধে মাঠে নামিয়ে বাংলাদেশকে একটি অনিবার্য সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে। আমার কথা যদি সেদিন বিশ্বাস না হয়ে থাকে আজ আপনারা আমার কথার প্রমাণ শুনুন। তারা হেফাজতের আমির আল্লামা বাবুনগরীর নামে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করার সাহস পেয়েছে কি কারণে? যে হেফাজতের আমীর বলেছেন মদিনা সনদের কথা। আমি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চাই, রাষ্ট্রকে, সরকারকে ও সরকারি দলের সমস্ত কর্মীদেরকে, জনগণকে, এবং প্রশাসনকে সতর্ক করতে চাই, লক্ষ্য করুন এই অপশক্তির টার্গেট কোথায়? তারা আজকে শুধু আমিরে হেফাজতের বিরুদ্ধে এক হাত নেইনি। তারা শুধু হেফাজতের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেইনি। তারা বরং বাংলাদেশের সরকারও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে।
মদিনা সনদের কথা বলায় যদি আমিরে হেফাজতকে রাষ্ট্রদ্রোহী সাব্যস্ত করা হয়, এ কথার পরিণাম কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষকে আজকে সেটা বুঝতে হবে।
এদেশে মদিনা সনদের কথা সর্বপ্রথম আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী বলেননি। মদিনা সনদের কথা সর্বপ্রথম এদেশের প্রধানমন্ত্রীত্বের আসনে বসে জননেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন। মদিনা সনদের কথা বলায় যদি আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়। এই অপশক্তি আগামীকাল শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করবে। আজ আমরা যারা এই অপশক্তির বিরুদ্ধে মাঠে অবতীর্ণ হযযেছি। তোমরা যারা শেখ হাসিনার আনুগত্য করো, যারা শেখ হাসিনার রাজনীতি মেনে বাংলাদেশের রাজনীতি করো, তোমরা যদি এখন বগল বাজাও, তোমরা যদি এখন হাতে তালি মারো, তোমরা যদি এখন মুক্তিযুদ্ধ নামের মঞ্চের বিরোধী অপশক্তিকে আস্কারা দাও। তাহলে সেদিনের জন্য অপেক্ষা করো যেদিন তারা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেও রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করবে।
তিনি বলেন, আজকে বাংলাদেশ এবং ইসলামের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। এই ষড়যন্ত্রের বিষয়ে আমাদেরকে জাতির সামনে সুন্দরভাবে, সঠিক উপায়ে আমাদের কথা তুলে ধরতে হবে। যারা বোঝে না তাদের বুঝাতে হবে। যে এরা শুধু আলেম সমাজের বিরুদ্ধাচারী নয়। এরা শুধু হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধাচারী নয়। এরা তাদেরই বিরুদ্ধে, যারা মদিনা সনদের কথা বলে।
তিনি বলেন, হজরত ইমাম হোসাইন রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু এর একটি যুদ্ধের ভূমিকার কথা আমরা জানি। হজরত ইমাম হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর কুফার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। ইয়াজিদের খেলাফত তিনি মেনে নেননি। অথচ অনেক বড় বড় সাহাবায়ে কেরাম তার বাইয়াত গ্রহণ করেছিলেন। আনুগত্য করেছিলেন। কিন্তু হজরত হোসাইন সেটা করেননি। কেন করেননি? তিনি জানতেন কুফায় যে তিনি অগ্রসর হচ্ছেন, এ পথ কতটা বিপদসংকুল! এ পথ কতটা কঠিন পরিণাম ডেকে আনতে পারে তার জীবনে! এইসব বিষয়ে সম্যক অবগতি হজরত হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু এর ছিল। তারপরও তিনি কেন গিয়েছিলেন? অনেক বড় বড় সাহাবায়ে কেরাম তাকে বলেছিলেন হুজুর আপনি এই পথে পা বাড়াবেন না। ইয়াজিদের পক্ষ থেকে যারা আছে তারা কিন্তু অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। ওবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ কিন্তু অত্যন্ত পাষাণ। সে কিন্তু আপনার বিরুদ্ধে অত্যন্ত বড় ধরনের মারাত্মক পদক্ষেপ নিতে পারে। সব জেনে বুঝেও হাসিমুখে হজরত হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু কুফার পথে পা বাড়িয়েছিলেন।
তিনি বলেন, শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহমতুল্লাহি আলাইহি এ ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের উদ্ধৃতি টেনেছিলেন, আমরা জানি, ইতিহাস থেকে পড়েছি, খলকে কোরআনের মাসআলা। আল্লাহর কুরআন এটা কি সৃষ্ট নাকি এটা অনাদি? এই মাসালা নিয়ে বিতর্ক ছিল। সময়ের অত্যাচারী শাসক কোরআন-সুন্নাহবিরোধী একটি বেদাতি আকিদা লালন করতো। সে সমকালীন সকল আলেমদের ডেকে রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি করেছিল। বলেছিল যে, এ কথা সকল আলেমকে বলতে হবে কোরআন সৃষ্ট এটা অনাদি নয়। যুগের প্রায় সবাই মনে করেছিলেন এই শাসক এর সাথে সংঘাতে গেলে সে তো আমাদের শেষ করে ফেলবে। সকলেই কৌশলের অবলম্বন করেছিলেন। অনেকে বলেছিলেন কোরানের ব্যাপারে আবার মন্তব্য হল এটা সৃষ্টি। অর্থাৎ আমার কথাটা সৃষ্টি। তারা কোরআনকে হাদেস বলে নাই। তখন শাসক মনে করেছে যে, যাক হাদেস বলেছে, তাকে ছেড়ে দাও। সবাইকে ছেড়ে দিয়ে। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল চিন্তা করলেন এখন আমিও যদি অন্য হুজুরদের মত কৌশল অবলম্বন করে বলে যাই, তাহলে পৃথিবীর ইতিহাস সেটাই লেখা হবে, যে সময়ের অত্যাচারী শাসক সময়ের সকল ওলামা হক কথাটি অনুচ্চারিত রেখে তারা কৌশল অবলম্বন করে নিজেদের রক্ষা করে গেছেন।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল বললেন, আমি বলবো তবে আমি কোন অন্ধকার কুঠুরিতে বলবো না। আবদ্ধ করে বলবো না। আমি গোটা দেশের জনসম্মুক্ষে জামে মসজিদে বলবো। জামে মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহির দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জনগণ এবং শাসককে সামনে রেখে বলেছিলেন, কোরআন কদিম। এটা হাদেস নয়। এরপর থেকে ইতিহাস লিখে, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি এর উপর অত্যাচারের স্টিমরোলার পরিচালিত হয়েছিল। যার রক্তের স্রোত দিয়ে পৃথিবীর বুকে আল্লাহর ঝাণ্ডা সমুন্নত হয়েছিল। এবং হক চিরদিনের জন্য মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।
আজকে আমি ওদের দীপ্তকণ্ঠে বলতে চাই, আজকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয়া হচ্ছে। আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছি, বার বার বলেছি, তিনি বাংলাদেশের মরহুম একজন জাতীয় নেতা। তার প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভালবাসার কোনো ঘাটতি আমাদের নেই। আমরা তার রুহের মাগফেরাত কামনা করি।
কিন্তু এই বঙ্গবন্ধুর নামের আড়ালে যারা ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের দেশে একটি শিরকি সংস্কৃতিকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করে। আর অন্য সকলে কৌশল অবলম্বন করে নীরবতা পালন করলেও, যুগের কিছু আহমদ ইবনে হাম্বল জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও হকের কথা উচ্চারণ করতে হবে।
তিনি বলেন, আমরা স্পষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করছি, সরকারের সাথে, প্রশাসনের সাথে, রাষ্ট্রের সাথে, আমরা সাংঘর্ষিক কোন কথা কখনোই বলিনি। সংবিধান রাষ্ট্র ও রাজনীতি নিয়ে দীর্ঘ পড়াশোনা করার পর আমরা মাঠে ময়দানে কথা বলি। কাজেই আমাদের কথাগুলো কে বিকৃত করে আমাদের নামে যে সকল মামলা দায়ের করবার চেষ্টা করা হচ্ছে। আলহামদুলিল্লাহ ইতিমধ্যে দুটি মামলা সরাসরি নাকচ করে দেয়া হয়েছে। সত্য এভাবেই উদ্ঘাটিত হবে। যারা রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করেছে তাদের খোঁজ করলে দেখা যাবে, তারাই দেশবিরোধী ও রাষ্ট্রবিরোধী। তোমরা প্রস্তুতি গ্রহণ করো, তোমাদেরকে আগামীতে বাংলাদেশ বিরোধী অবস্থানের জন্য আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।
এমডব্লিউ/