বৃহস্পতিবার, ০১ জানুয়ারি ২০২৬ ।। ১৭ পৌষ ১৪৩২ ।। ১২ রজব ১৪৪৭


জিয়া-এরশাদকে বৈধ রাষ্ট্রপতি বলা যায় না: সংসদে প্রধানমন্ত্রী

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

আওয়ার ইসলাম: জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনক্ষমতাকে অবৈধ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘পঁচাত্তরে জাতির পিতার হত্যার পর জিয়া ক্ষমতা দখল করেন। তাকে অনুসরণ করে এরশাদ প্রথমে মার্শাল ল’ জারি করেন। এরপর নিজেই ক্ষমতা দখল করেন। হাইকোর্ট এই দু’জনের ক্ষমতা দখলকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন। এর ফলে এই দু’জনের কাউকেই বৈধ রাষ্ট্রপতি বলা যায় না।’

রবিবার (৮ সেপ্টেম্বর ) জাতীয় সংসদে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুতে আনা শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

জিয়া ও এরশাদের ক্ষমতা দখলে আওয়ামী লীগ বিরোধিতা করেছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এক মিলিটারি ডিক্টেটর থেকে আরেক মিলিটারি ডিক্টেটর আসুক, সেটা কখনোই আমাদের কাম্য ছিল না। এর বিরুদ্ধে আমরাই প্রতিবাদ করেছি। আমরা চেয়েছি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া।’

এরশাদের ক্ষমতা গ্রহণের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘জেনারেল এরশাদ যে ১৯৮২ সালে ক্ষমতা দখল করেছিলেন, সেই ক্ষমতা দখলের সুযোগটা কিন্তু খালেদা জিয়াই করে দিয়েছিলেন। এ কারণেই তিনি খালেদা জিয়াকে শুধু দুটি বাড়িই নয়, নগদ ১০ লাখ টাকাসহ অনেক সুযোগ-সুবিধা দিয়েছিলেন। যে কারণে জিয়া হত্যার ব্যাপারে যে মামলা হয়েছিল, সেই মামলা বিএনপি চালায়নি। তবে, বহু বছর পরে ১৯৯১ সালে বা তারপর খালেদা জিয়া জেনারেল এরশাদকে তার স্বামী হত্যার জন্য দায়ী করেছেন।’

এরশাদের আমলে আওয়ামী লীগ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে চেয়েছি বলেই অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেও ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে অংশ নেই। ওই নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ হলে এ ধরনের বিতর্কিত হতে হতো না। একটি গণতান্ত্রিক ধারা প্রতিষ্ঠিত হতো। এরশাদ নিজেই সেই সংসদ ভেঙে দিয়ে আবারও বিতর্কিত হয়ে যান। এরপর ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে কোনও দল অংশ নেয়নি। তখন আন্দোলনের মুখে তিনি ১৯৯০ সালে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।’

রওশন এরশাদের নেতৃত্বে ২০১৪ সালে জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় দলটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০১৪ সালের নির্বাচন নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করেন। কিন্তু ওই নির্বাচনে যদি জনগণের অংশগ্রহণ না থাকতো, তাহলে আমরা ৫ বছর ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারতাম না।’

শক্তিশালী বিরোধী দল ছাড়া কখনোই গণতান্ত্রিক ধারা মজবুত হয় না মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি থেকে শুরু করে সব দল অংশ নেয়। কিন্তু অংশ নিয়েও বিএনপি এই সংসদকে অবৈধ বলে। আবার তারা সংসদে ফিরেও এসেছেন। এজন্য তাদের সাধুবাদ জানাই। তাদের অংশগ্রহণে বিরোধী দল সংখ্যায় বেড়েছে। গণতান্ত্রিক ধারাটা অব্যাহত আছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তারা (বিএনপির এমপি) সংসদে বসেন, আবার বলেন নির্বাচনে জনগণ ভোট দেয়নি। ভোট না দিলে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির সরকারকে আমরা যেভাবে উৎখাত করেছিলাম, তারাও জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সেভাবে সরকারকে উৎখাত করতে পারতো। কিন্তু জনসমর্থন নেই বলে তারা তা পারছে না।’

১৯৯১ সালে বিএনপির শাসনামলে এরশাদের জেল হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এরশাদ সাহেব যখন পদত্যাগ করেছিলেন, তখন তাকে গ্রেফতার করে বন্দি রাখা হয়েছিল। রওশন এরশাদকেও বন্দি করে দিনের পর দিন নির্যাতন করেছিল। কারাগারের ভেতরও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানকে হেয় করা হয়েছে। আমরা তো সেই ধরনের অভদ্র আচরণ করছি না। আমরা যথেষ্ট উদারতা দেখাচ্ছি। দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত আসামি হলেও খালেদা জিয়াকে অনেক সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে।’

বঙ্গবন্ধুর শুরু করা সাভার স্মৃতিসৌধ ও শহীদ মিনারের কাজ সম্পন্ন করাসহ এরশাদের বেশ কিছু কাজের প্রশংসা করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘এরশাদের মধ্যে অমায়িক আচরণ ছিল।’ মানুষের প্রতি তার দরদ ছিল বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

এর আগে রওশন এরশাদ বলেন, ‘তিনি অনেক জনদরদি নেতা ছিলেন। উনি দেশ ও জনগণের জন্য অনেক উন্নয়ন কাজ করেছেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় যে কাজ অসমাপ্ত রেখে গেছিলেন, তার অকাল ও মর্মান্তিক মৃত্যুতে তিনি যা শেষ করে যেতে পারেননি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তা সম্পন্ন করার চেষ্টা করেন। তিনি অনেক জনপ্রিয় ছিল তা তার মৃত্যুর পরও বোঝা গেছে। তার চার চারটি জানাজা করতে হয়েছে।’ এ সময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এরশাদপত্নী।

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু মাত্র ১৭ সেকেন্ডের বক্তব্যে বলেন, ‘আমি তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। দোষে-গুণে মানুষ, সেগুলো আজ আলোচনা না করাই ভালো।’ এ কথা বলে বক্তব্য শেষ করেন তিনি।

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের আরেক সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুল রহমান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে মেজর থেকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল করে সেনাপ্রধান করেন। তবে যখন উনি প্রেসিডেন্ট হন, তার সঙ্গে আমাদের মতানৈক্য তৈরি হয়। তবে উনি বিনয়ী ছিলেন। তিনি অনেক উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন।’

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেন, ‘হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ গণতন্ত্র রক্ষা ও গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ করেছেন। তিনি একটি রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন। তিনি পল্লী উন্নয়নসহ দেশের উন্নয়নে কাজ করে গেছেন। তিনি প্রশাসনকে বিকেন্দ্রীকরণ করেন, উপজেলা পদ্ধতির প্রবর্তন করেন।’

শোক প্রস্তাব উত্থাপনের পর তার কর্মময় জীবন নিয়ে আলোচনা করেন জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যরা। শোক প্রস্তাবের ওপর বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের এমপি শাজাহান খান, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু, ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারি, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মশিউর রহমান রাঙ্গা, সাবেক মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ প্রমুখ।

আরএম/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ