150113

মা আমার পৃথিবী

আল মামুন নূর । । 

আজ তিন মাস মা আমার কাছে। শহরে থাকায় প্রচণ্ডরকম কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও কেবল আমার দেখভালের জন্য এক মুহূর্তের জন্যও বাসা থেকে কোথাও যাননি তিনি। পাশেই আপুদের বাসা; কিন্তু আমি কখন বাসায় আসি, কখন যাই— এই চিন্তায় বাসা থেকে তেমন কোথাও বেরোননি। কোথাও গেলেও আমি বাসায় ফেরার আগেই আবার চলে আসছেন।

সকালবেলা ফজর পড়ে বাসায় ফিরেই রোজ দেখেছি আমার জন্য খাবার প্রস্তুত। সত্তরোর্ধ বয়সী মা আমার শারীরিক সমস্যা থাকা সত্ত্বেও এতো সকালে কীভাবে এগুলো করেছেন, তা ভেবে অবাক হয়েছি প্রতিনিয়ত। বাসা থেকে বেরোচ্ছি, এমন মুহূর্তে বলেন—‘একটুখানি হা কর, বেদানাগুলো খেতে খেতে যা।’ একটা পেয়ারা হাতে দিয়ে বলেন—‘সময় করে খেয়ে নিস।’

মাঝেমধ্যে সত্যিই বিরক্ত হয়েছি এই বলে, এতো কিছু খাওয়া যায় নাকি? কর্মস্থলে পৌঁছুনোর পরে ১০ টার দিকে রোজ মায়ের ফোন—‘কিছু খেয়েছিস? একটু পানি খা, পিয়নকে দিয়ে বাইরে থেকে কিছু একটা আনিয়ে নে।’

দুটো বাজতে না বাজতেই আবার ফোন—‘কী খাবি দুপুরে? পেট ভরে খাবি, কাজ পরে, আগে খেয়ে নে।’ মাঝেমধ্যে বিরক্ত হয়ে বেয়াদবের মতো বলেছি—‘মা! কাজ করি তো, এতোবার ফোন দেন কেনো?’ কিছু না বলে ফোনটা রেখে দিয়েছেন; কিন্তু ফোন দেওয়া বন্ধ হ নি একটিবারের জন্যও।

প্রত্যেকটা মুহূর্তে কোথায় আছি, কী করছি, তার আপডেট মাকে দিতে হয়েছে। সারাটা দিন একা একা বাসায় আমার ফেরার অপেক্ষায় থেকেছেন। কাজের প্রেসারে বাসায় ফিরতে প্রতিনিয়ত রাত ১০টা-১১টা বেজেছে। ফজর থেকে নিয়ে এই পুরো সময়টা বাসায় একা একা থেকেছেন; দিনের পর দিন, শুধু আমার টেককেয়ারের জন্য। কোথাও গেলে হয়তো আমি বাসায় এসে না খেয়ে ঘুমিয়ে যাবো, এই চিন্তায় বাসা থেকে বেরোন নি।

একদিন রাস্তায় প্রচণ্ডরকম জ্যাম থাকায় বাসায় ফিরেছি রাত সাড়ে বারোটা বাজে। দরোজায় একবার নক করার সঙ্গে সঙ্গে দরোজা খুলে গেলো। মা দাঁড়িয়ে ছিলেন দরোজার ওপাশেই। ঢুকে ফ্রেশ হয়ে মাকে বললাম—‘খেয়ে এসেছি, আর কিছু খাবো না রাতে।’

কিছুক্ষণ পরে মায়ের রুমে গিয়ে দেখি তিনি খাবার খাচ্ছেন। বললাম—‘এতোক্ষণ আপনি কেনো না খেয়ে ছিলেন?’ বললেন—‘তুই বাসায় ফেরার আগে আমি কিচ্ছুটি খেতে পারি না।’ আমি জাস্ট আমার রুমে এসে কিছুক্ষণ চোখের জল ফেললাম এই ভেবে, কারণে-অকারণে এই মাকে কতো কষ্ট দিই!

রাতে যখন খাবার খেয়ে ঘুমোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছি, এমন সময় প্রতিনিয়ত ফলের ট্রে হাতে মা আস্তে করে মাথার কাছে এসে বসেছেন। আনার ছিলতে ছিলতে মায়ের প্রশ্ন—‘তোর খারাপ লাগছে নাকি? মুখটা কেমন শুকনো শুকনো লাগছে! মশা আছে নাকি? মশারি দেবো? দেখি হা কর, আনার খা। এখানে বোতলে পানি রেখে গেলাম, খেয়ে নিস।’

বেয়াদবের মতো কিছুক্ষণ পরে মাকে ডাক দিয়ে বলেছি—‘এগুলো নিয়ে যান, খাবো না।’ ট্রে নিতে নিতে কাঁথা বের করে নিজ হাতে আমার গায়ে চড়িয়ে দিয়েছেন৷ এরপর আমি যখন ঘুমিয়ে পড়েছি, তখন মা ঘুমোতে গেছেন। রোজ সকালে উঠে দেখেছি মোবাইল, ল্যাপটপ আমার বিছানার পাশে নেই। আমি ঘুমোনোর পরে এগুলো মা সরিয়ে রেখেছেন।

নূন্যতম কোনো খেদমত মায়ের করতে পারিনি আমি৷ তাকে কথায়-কাজে কষ্ট দিয়েছি শুধু। আজ সকালে ভাইয়া জোর করে মাকে নিয়ে গেলেন। মা আমাকে একা রেখে যেতে চাননি। বারবার কান্না করেছেন, আমি কীভাবে একা থাকবো এই ভেবে। এমন মায়ের একজন ব্যর্থ সন্তান আমি।

আমার একটুখানি সুখ দেখতে চেয়েছেন মা। আমাকে একটুখানি টেনশনমুক্ত দেখতে চান তিনি। সন্তান হিসেবে আমার সুখ ছাড়া আর কোনো চাওয়া-পাওয়া মায়ের দেখি নি। কিন্তু মায়ের এই নূন্যতম চাওয়া আমি পূরণ করতে শতো ভাগ ব্যর্থ হয়েছি। কয়েকগুণ বেশি কষ্ট নিয়ে মা ঢাকা থেকে চলে গেলেন।

বিদায় দিয়ে বাইরে থেকে এসে যখন তালা খুলে ঘরে ঢুকলাম, আর সহ্য করতে পারলাম না। মা নেই ঘরে। মনে হচ্ছে, দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাই। এই মুহূর্তে মা আমার মাথার পাশে বসে থাকতেন, গায়ে কাঁথা টেনে দিতেন। আমি আজ একা। যেনো উদ্ভ্রান্ত, সর্বহারা৷ মা ছাড়া আমার পৃথিবী শুন্য। লাভ ইউ মা!

আরএম/

ad

পাঠকের মতামত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *