198465

সবাইকে কাঁদিয়ে মহামনীষীর প্রয়াণ

বেলায়েত হুসাইন ।।

সময়টা ২০১২-১৩ সাল। উত্তরা বাবুস সালাম এয়ারপোর্ট মাদরাসার ২০ সালা আড়ম্বরপূর্ণ ইসলামি মহাসম্মেলন। দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান ইসলামি মনিষীগণ দুইদিনব্যাপী এই সম্মেলনে আমন্ত্রিত অতিথি। আমি পড়ি পাশেই অবস্থিত বাইতুস সালাম মাদরাসায়। আন্তর্জাতিক ইসলামি সম্মেলন উপলক্ষে বাদ আসর আমাদের ছুটি।

রেললাইনের পথ মাড়িয়ে বাবুস সালামের দিকে যাচ্ছি। শুনতে পাচ্ছি সম্মেলনের মাইকের আওয়াজ। একজন বয়স্ক লোক কিছুটা গেঁয়ো ভাষায় বিয়েতে ‘হলুদকোটা’ প্রসঙ্গে আলোচনা করছেন। বলছেন, এসব নিয়ে কেউ আলোচনা করেনা, কিন্তু প্রতিনিয়ত আমাদের এসব রীতি-রেওয়াজের সম্মুখীন হতে হয়। ‘হলুদকোটা’র নানা অপসংস্কৃতির কথা বলে উপস্থিত শ্রোতাদের বোঝাচ্ছেন যে, এটি মূলত বিধর্মী রেওয়াজ। এগুলি আমাদের এড়িয়ে চলা উচিত।

বন্ধুদের সঙ্গে মূল সম্মেলনস্থলে পৌঁছে গেছি। এর আগে তাদের বলেছি, বক্তা সম্ভবত গ্রামের মানুষ, ইলম-কালাম কম- এজন্য বাদ আসর বয়ান করতে দেয়া হয়েছে। আর কীসব ‘হট’ টপিক থাকতে হলুদকোটা নিয়ে কথা বলছেন, নিশ্চয়ই দূরের কোন অজপাড়াগাঁ থেকে উনি এসেছেন। মঞ্চের দূর থেকে মাথায় সবুজ রুমাল জড়ানো বয়োবৃদ্ধ বক্তাকে দেখে আরও নিশ্চিত হলাম, তিনি আলোচিত কেউ নন।

কিন্তু নতুন ঢাকায় আসা আমি যখন উপস্থিত এক শ্রোতাকে তাঁর নাম জিজ্ঞাসা করলাম, উত্তর শুনে তখন আমার একেবারে কিম্ভূতকিমাকার অবস্থা। বললেন, উনি আল্লামা শাহ আহমাদ শফি!

তখনও হেফাজতে ইসলামের উত্থান হয়নি; এরপরও মাদরাসা মহল ঠিকই আল্লামা আহমাদ শফিকে অন্তত নামে হলেও চিনত এবং জানত। কারণ, হাটহাজারি মাদরাসার মুহতামিম মানে সারা বাংলার ‘মুরব্বি ও রাহবার’।

আমিও তাঁকে নামে চিনতাম এবং জানতাম। ভাবতাম, হাটহাজারির মুহতামিম মানে তিনি দেশের সবচেয়ে বড় আলিম, তাঁর ভাবসাবই আলাদা। কিন্তু বাবুস সালামে দেখার পর তাঁর প্রতি শ্রদ্ধায় মন ভরে উঠল; কতো বড় মানুষ! আর কি তাঁর সাদাসিধে জীবন!

হুজুর আমাদের ছেড়ে গত ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ সালে মহান প্রভুর ডাকে সাড়া দিয়ে পরলোকগমন করেছেন। বোধশক্তির পর থেকে মনের গভীরে তিনি স্বতন্ত্র এক আসনে সমাসীন ছিলেন। তাঁর ব্যক্তিত্বের ওপর আমাদের কোন আপত্তি ছিল না, তবে আপনজন ও তাঁর আশপাশের কিছু মানুষের কারণে বিতর্কিত হয়ে পড়েছিলেন। মনেপ্রাণে চাইতাম- হে আল্লাহ! বিতর্কিত অবস্থায় হুজুরকে তোমার কাছে টেনে নিওনা।

আল্লাহ হজরতের অসংখ্য ভক্ত ও অনুরক্তের এই দোয়া কবুল করেছেন এবং মৃত্যুর মাত্র কয়েকঘন্টা আগে ‘বিতর্কের উৎস’ থেকে প্রিয় বান্দাকে মুক্তি দিয়েছেন। এর সঙ্গে সঙ্গেই সবাই আবার তাঁকে হৃদয়ের মণিকোঠায় তুলে নিলেন, ভক্তরা জানত না হজরত খুব শিগগির তাদের থেকে বিদায় নিচ্ছেন।

কিন্তু আল্লাহর হিকমত বান্দা আর কতটুকু বুঝতে পারে! প্রতিপালক পরিক্ষার খাতা গুটিয়ে নেয়ার ইচ্ছে করে আগেরদিন রাতেই প্রিয় বান্দাকে ‘জাতীয় দায়বদ্ধতা’ থেকে মুক্তি দান করলেন এবং সবশেষ নিজের কাছে টেনে নিলেন শাইখুল ইসলাম আল্লামা আহমাদ শফি রহ.কে। আর এভাবেই উপমহাদেশের এক মহামনবের মহাপ্রয়াণ সম্পন্ন হলো।

লেখক: শিক্ষক, মারকাযুদ দিরাসাহ আল ইসলামিয়্যাহ- ঢাকা।

-এটি

ads