49044

কুরবানী ও মুমিন জীবনের মৌলিক শিক্ষা

মাওলানা আবুল হাসান মুহাম্মদ নাসরুল্লাহ

মুসলমানদের সর্ববৃহৎ ঈদ উৎসব ঈদুল আযহা বা কুরবানীর ঈদ। আদি পিতা হযরত আদম আ. থেকে শুরু হওয়া এ কুরবানীর মূল দীক্ষাই হল-সকল প্রকার ঠুনকো ও খোঁড়া যুক্তি ও বুদ্ধির উর্ধ্বে উঠে আল্লাহর হুকুম আহকামের প্রতি পূর্ণ আত্নসমার্পন করা। আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের নমুনাস্বরুপ হযরত ইবরাহীম আ. নিজ প্রিয় পুত্র ইসমাইলকে আ. আল্লাহর রাহে উৎসর্গ করেছিলেন। আল্লাহর হুকুমের প্রতি অতিশয় আনুগত্যের কারনে আল্লাহ তায়ালা তার এ কুরবানীকে কবুল করে নিলেন এবং বিশ্ববাসীর জন্য আল্লাহর হুকুমের পূর্ণ আনুগত্যতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন।

ঈদুল আযহা ও কুরবানী : হজ্জ্বের মৌসুমে উদযাপিত এ ঈদকে ইসলামী পরিভাষায় ঈদুল আযহা বলা হয়। কারন রাসূলুল্লাহ সা. একে ঈদুল আযহা নামে নামকরন করেছেন। এছাড়া ইয়াওমুন নহরও বলা হয়। জর্দান, ফিলিস্তিন, লেবানন, মিশর, সিরিয়া, তিউনিসিয়া, ইরাক, লিবিয়া ও জাজীরার অধিবাসীরা এ ঈদকে “ঈদুল কাবীর” বা বড় ঈদ নামে সম্বোধন করে থাকেন। বাহরাইনের লোকেরা “ঈদুল হুজ্জাজ”বা হাজীদের ঈদ নামে সম্বোধন করেন। আর ইরান, আফগানিস্তান সহ পাক-ভারত উপমহাদেশের লোকেরা “ঈদুল কুরবান”বা কুরবানীর ঈদ নামে অভিহিত করেন।

আযহা শব্দটিকে আরবীতে “কুরবান”ও বলা হয়ে থাকে। যা ফারসী বা উর্দূতে “কুরবানী”রুপে পরিচিত হয়েছে। কুরবানের শাব্দিক অর্থ হল-নৈকট্য অর্জন করা, কাছাকাছি যাওয়া। পারিভাষিক অর্থে ‘কুরবানী’ ঐ মাধ্যমকে বলা হয়,যার দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য হাছিল হয়। প্রচলিত অর্থে, ঈদুল আযহার দিন আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে শারঈ তরীকায় যে পশু যবহ করা হয়, তাকে ‘কুরবানী’ বলা হয়।

কুরবানীর গুরুত্ব ও তাৎপর্য : কুরবানীর গুরুত্ব অপরিসীম। পবিত্র কুরআন ও হাদীস এ ব্যাপারে ব্যাপক গুরুত্বারোপ করেছে। মহান আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয় হাবীবকে লক্ষ করে বলেনঃ “তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে ছালাত আদায় কর এবং কুরবানী কর”(কাওছার-২)। কাফির-মুশরিকরা তাদের দেব-দেবী ও মূর্তির উদ্দেশ্যে কুরবানী করে থাকে। তার প্রতিবাদ স্বরূপ এ আয়াতের মাধ্যমে মুসলমানদেরকে আল্লাহর জন্য ছালাত আদায়ের ও তাঁর উদ্দেশ্যে কুরবানী করার হুকুম দেওয়া হয়েছে। মুফাসসিরদের কারো মতে এ আয়াতে বিশেষভাবে ঈদুল আযহার নামাজ ও নামায শেষে কুরবানীর নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

মহান আল্লাহ বলেনঃ “আর কুরবানীর পশু সমূহকে আমরা তোমাদের জন্য আল্লাহর নিদর্শন সমূহের অন্তর্ভুক্ত করেছি। এর মধ্যে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে”(হজ্জ-৩৬)। আল্লাহ আরও বলেনঃ”আর আমরা তাঁর (ইসমাঈলের) পরিবর্তে যবহ করার জন্য দিলাম একটি মহান কুরবানী। আমরা এটিকে পরবর্তীদের মধ্যে রেখে দিলাম” (ছাফফাত ১০৭-১০৮)।

আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সা. বলেছেনঃ “সামর্থ থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কুরবানী করল না,সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়”। (সুনানু ইবনু মাজাহ) রাসূলূল্লাহ সা. আরো বলেনঃ কুরবানীর দিন রক্ত প্রবাহিত করা (জবেহ করা) অপেক্ষা আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় মানুষের কোনো আমল হয়না। (সুনানু তিরমিজি)। তিনি আরো বলেনঃ যে ব্যক্তি প্রফুল্ল চিত্তে কুরবানী আদায়ের নিয়তে কুরবানী করে কিয়ামতের দিন তার এবং জাহান্নামের মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে। (আস-সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বি)

এটি ইসলামের একটি ‘মহান নিদর্শন’ যা ‘সুন্নাতে ইবরাহীম’ হিসাবে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নিজে মদীনায় প্রতি বছর আদায় করেছেন এবং সাহাবীগণও নিয়মিতভাবে কুরবানী করেছেন। অতঃপর অবিরত ধারায় মুসলিম উম্মাহ সামর্থ্যবানদের মধ্যে এটি চালু আছে।

এ ছাড়া মানব সভ্যতার সুদীর্ঘ ইতিহাস এটাই সাক্ষ্য দেয় যে,হযরত আদম (আঃ) হতে পৃথিবীর সব জাতিই কোন না কোন পদ্ধতিতে আল্লাহর দরবারে নিজেদের প্রিয় বস্তু উৎসর্গ করেছেন। এ ইতিহাসের স্বীকৃতি প্রদান করে মহান আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্ট ভাবে ঘোষণা করেছেন “আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্যে কুরবানীর এক বিশেষ রীতি পদ্ধতি নির্ধারণ করে দিয়েছি, যেন তারা ওসব পশুর উপর আল্লাহর নাম নিতে পারে যে সব আল্লাহ তাদেরকে দান করেছেন”। (সূরা আল হজ্জ-৩৪)

কুরবানীর কতিপয় মৌলিক শিক্ষা : কুরবানীতে মুমিনের জন্য অসংখ্য শিক্ষনীয় বিষয় রয়েছে। তন্মেধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এখানে তুলে ধরলাম।

বিশ্বব্যাপী তাওহীদ প্রতিষ্ঠা : মহান আল্লাহর তাওহীদ বা একাত্ববাদ বিশ্বের বুকে প্রতিষ্ঠা করা কুরবানীর অন্যতম শিক্ষা। কারণ, একমাত্র বিশ্বজাহানের মালিক মহান আল্লাহর উদ্দেশ্যে, তার নামেই পশু কোরবানী দেয়া হয়। জগতের অন্যান্য ধর্মালম্বীরা যেখানে তাদের দেব-দেবির নামে কোরবানী করে, সেখানে মুসলিম সমাজ তাদের কোরবানী একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে সম্পাদন করার মাধ্যমে তাওহীদের আলোয় আলোকিত করেন গোটা পৃথিবীর সমাজব্যবস্থাকে। মহান আল্লাহর বানীঃ“আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্যে কুরবানীর এক বিশেষ রীতি পদ্ধতি নির্ধারণ করে দিয়েছি, যেন তারা ওসব পশুর উপর আল্লাহর নাম নিতে পারে যে সব আল্লাহ তাদেরকে দান করেছেন”। (সূরা আল হজ্জ-৩৪)

আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্নসমার্পন : কুরবানীর গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্নসমার্পন। আল্লাহর সকল আদেশের সামনে বিনা প্রশ্নে মাথানত করে দেয়াই হল পূর্ণ আত্নসমার্পনের সমুজ্জ্বল বহিঃপ্রকাশ। ঈদুল আযহার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে আমরা হযরত ইবরাহীম (আঃ)ও তদ্বীয় পুত্র ঈসমাইল (আঃ)এর এরুপ পুর্ণ আত্নসমার্পনের চিত্রই পবিত্র কুরআনুল কারীমে দেখতে পাই। যেমন আল্লাহ বলেনঃ “অতঃপর যখন পিতা পুত্র উভয়েই আত্নসমার্পন করলেন, আর পিতা পুত্রকে কুরবানী করার জন্য উপুত করে শায়িত করলেন,আমি তখন তাকে ডাক দিয়া বললামঃ “হে ইবরাহীম! আপনিতো সত্যিই স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করে দেখালেন! আমি এভাবেই সৎকর্মীদের প্রতিদান দিয়ে থাকি”।(সূরা আসছাফফাত ১০৩-১০৫)

ইখলাস বা একনিষ্ঠতা : সকল কাজে ইখলাস বা একনিষ্ঠতাই ইসলামের মহান শিক্ষা। ইখলাস ছাড়া পরকালীন কোনো কাজই আল্লাহ তায়ালা কবুল করেননা। আন্তরিকতা ও মহব্বতবর্জিত ইবাদত প্রানহীন কাঠামো মাত্র। তাই কুরবানীও একমাত্র আল্লাহ তায়ালার রেজাবন্দী হাসিলের জন্য দিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ তায়ালার আদেশঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালার নিকট কুরবানীর পশুর গোশত ও রক্ত পৌছেনা। তার নিকট তোমাদের তাকওয়া (ইখলাস) পৌছে”। (সূরা হাজ্জ্ব-৩৭)।মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ “বলুন! হে মুহাম্মদ! আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ সব কিছুই আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের জন্যে। তাঁর কোন শরীক নেই। আমাকে তাঁরই নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং আমি সকলের আগে তাঁর অনুগত ও ফরমাবরদার”। (সূরা আল আনআম-১৬২)।

ইখলাসপূর্ণ কুরবানী হওয়ার কারনেই আল্লাহ তায়ালা হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর কুরবানী কবুল করে নিয়েছিলেন। উক্ত কুরবানীকে বিশ্ববাসীর জন্য দৃষ্টান্তস্বরুপ করে আল্লাহ ঘোষণা দেনঃ আর আমরা তাঁর (ইসমাঈলের) পরিবর্তে যবহ করার জন্য দিলাম একটি মহান কুরবানী। আমরা এটিকে পরবর্তীদের মধ্যে রেখে দিলাম’(সূরা আসছাফফাত ১০৭-১০৮)

তাকওয়া ভিত্তিক জীবন-যাপন : কুরবানীর সুমহান দীক্ষা-তাকওয়া ভিত্তিক জীবন-যাপন। জীবনের সকল ক্ষেত্রে তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জনই মুমিনের প্রকৃত সফলতা। বস্তুত আল্লাহ তায়ালা তার আমলকেই কবুল করেন, যার আমলে তাকওয়া বা খোদাভীতির সন্নিবেশন ঘটেছে। আদমপুত্র হাবিলের কোরবানী আল্লাহ তায়ালা কবুল করেছিলেন তাকওয়ার প্রভাবের কারণেই। হাবিলের কোরবানী কবুল হওয়ার তাৎপর্য পবিত্র কুরআনে এভাবেই চিত্রিত হয়েছেঃ”সে (হাবিল)বলল আল্লাহ তো মুত্তাকীদের কুরবানীই কবুল করেন। যদি তুমি আমাকে হত্যা করতে আমার দিকে হস্ত প্রসারিত কর, তবে আমি তোমাকে হত্যা করতে তোমার দিকে হস্ত প্রসারিত করব না। নিশ্চয়ই আমি বিশ্ব জগতের পালন কর্তা আল্লাহকে ভয় করি”। (সূরা আল-মায়িদাহ-২৭-২৮)

দরিদ্র ও অনাথের সুখে-দুঃখে অংশীদার :কুরবানীর অন্যতম শিক্ষা দরিদ্র ও অনাথের সুখ-দুঃখে ভাগীদার  হওয়া। ঈদুল আযহার নামাজে সমাজের সকল শ্রেনীর মানুষের সহবস্থানের পাশাপাশি আত্নীয় স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্র –অনাথের মাঝে কোরবানীর গোশত বন্টন আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে-তোমার সম্পদে সমাজের সকল শ্রেনীর মানুষের অধিকার রয়েছে। শুধুমাত্র ব্যক্তিভোগের নাম ইসলাম নয়। ইসলাম সমাজের সকল ধরনের মানুষের অধিকার নিশ্চিত করে। মহান আল্লাহ তায়ালার বানীঃ “এবং তাদের ধন সম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতদের হক রয়েছে”। (সূরা-আয-যারিয়াত-১৯)

কুরবানী মুসলমানদের শুধুমাত্র ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং পরিশুদ্ধ জীবন গঠনের নিয়মতান্ত্রিক অনুশীলনও বটে। এর মাধ্যমে মুসলমান তাওহীদী আদর্শে উজ্জীবীত হয়ে ইখলাস, তকওয়া অর্জনের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্নসমার্পনের অপূর্ব নজির স্থাপন করতে পারে। শ্রেণিভেদ, জাতিভেদের উর্দ্ধে উঠে মুসলিম সমাজে গড়ে তুলতে পারে পারস্পরিক ভ্রাত্রিত্ববোধ। উপহার দিতে পারে সুন্দর এই পৃথিবীতে আল্লাহর একাত্ববাদের চেতনায় উজ্জিবীত এক আলোকিত সমাজব্যবস্থা।

লেখক পরিচিতি : আরবী প্রভাষক, নাঙ্গুলী নেছারিয়া ফাযিল মাদরাসা, কাউখালী, পিরোজপুর।

-এটি

ad