194531

কুরবানী কিছু ভুল চিন্তার অপনোদন

শায়েখ সাজিদুর রহমান হাফিজাহুল্লাহ।।।
মুহতামিম, জামিয়া দারুল আরকাম আল-ইসলামিয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া, শায়খুল হাদিস, জামিয়া ইউনুছিয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও সহ সভাপতি, বেফাক।

আজকের আমাদের আলোচ্য বিষয়টি অত্যন্ত নাযুক, স্পর্শকাতর ও সংবেদনশীল বিষয়। আমরা সবাই জানি, কুরবানী ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান এবং তা বিশেষ ধরণের ইবাদত। কুরবানী ইসলামের অন্যতম শিআ‘র তথা পরিচয়-নিদর্শনমূলক একটি ইবাদত। আযান, জুমআ‘, জামাআ‘ত ইত্যাদি যেমনিভাবে ইসলামের পরিচয় বহন করে তেমনি কুরবানীও ইসলামের পরিচয় বহন করে।

কুরবানী কুরআন মাজীদের বিভিন্ন আয়াত ও রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। কুরআন মাজীদে যেমন এর বিধান এসেছে তেমনি হাদীস শরীফে এর ফযীলত, তাৎপর্য, মাসায়েলও পদ্ধতি ইত্যাদি বিষয় বর্ণিত হয়েছে। এই জন্যই আমরা দেখি ফিকহ-ফতোয়ার কিতাবগুলোতে বেশ বিস্তৃত একটি অধ্যায় হলো, কিতাবুল উযহিয়াহ, কুরবানী সংক্রান্ত অধ্যায়।

তাহলে বোঝাই যাচ্ছে, কুরবানীর মত এত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদতের ক্ষেত্রে এর বিকল্প অনুসন্ধান করা, এই ইবাদত পালনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বাহানা তালাশ করা, এই ইবাদতকে ভিন্নভাবে দেখার চেষ্টা করা; এগুলো হয় ইসলাম সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকার কারণে অথবা ইসলামের প্রতি বিদ্বেষের কারণে। কারণ যেটাই হোক বিষয়টা মারাত্মক গুরুতর। এই সামান্য পরিসরে খুব বেশি বিস্তৃত আলোচনার অবকাশ নেই। তবে এখানে কয়েকটি বিষয় সংক্ষেপে আলোচনা করা যায়।

এক.ঈদুল আযহার দিনে আমরা যে কুরবানী করে থাকি, সেই কুরবানীর নির্দেশনা কুরআন মাজীদে এসেছে نسك ও نحر শব্দে। সূরা আনআ‘মের ১৬২ আয়াতে نسك শব্দের অর্থ হলো, আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিলের জন্য আল্লাহর জন্য জবাইকৃত পশু। আর সবচেয়ে ছোট সূরা, সূরা কাওসারে نحر শব্দের অর্থ জবাই করা। نحر শব্দটির মূল ব্যবহার উট জবাইয়ের ক্ষেত্রে হলেও সাধারণ পশুজবাইকেও نحر বলা হয়। তাছাড়া এই কুরবানীর মূল সূত্র ‘মিল্লাতে ইবরাহীমী’র কুরবানী প্রসঙ্গেও সূরা ছাফ্ফাতে ১০৭ আয়াতে ذبحশব্দ এসেছে। অর্থ হলো, জবাইকৃত পশু।

তাহলে আমরা نسك, نحر,ذبح, এসব শব্দ থেকে বুঝতে পারি যে, কুরবানী আদায় হবে তখনই যখন যথাযোগ্য পশু আল্লাহর নামে জবাই করা হবে। পশু জবাইকরা ছাড়া কুরবানীর বিধান কোনোভাবেই আদায় হতে পারে না।

দুই.তিরমিযী শরীফের একটি হাদীস লক্ষ্য করুন। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘কুরবানীর দিন বান্দা যত আমল করে এর মধ্যে আল্লাহর কাছে বান্দার সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো পশু জবাই করা।’

এরপরে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন, ‘কিয়ামতের দিন এসব কুরবানীর জন্তুগুলো শিং, পশম ও খুর সহ (জীবিত হয়ে) উপস্থিত হবে।’এর অর্থ হলো, কুরবানী কবুল হলে আখেরাতে বান্দার নাজাত লাভের ওসীলা হতে পারে কুরবানী।

হাদীস শরীফে এর পরের অংশ হলো, ‘কুরবানীর পশুর রক্ত মাটিতে গড়িয়ে পড়ার আগেই আল্লাহর কাছে কবুলিয়াতের এক বিশেষ অবস্থানে পৌঁছে যায়।’

একেবারে সর্বশেষ বাক্যটি হলো, ‘সুতরাং তোমরা আনন্দের সঙ্গে কুরবানী করো।’

আমাদের আলোচ্য বিষয়ে এই হাদীসটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এর প্রতিটি অংশই আমাদের মনোযোগের দাবী রাখে। দেখুন, পুরো হাদীসের সবকটি অংশ জুড়েই মূল বার্তা হলো, কুরবানীর দিন আল্লাহর নামে কুরবানীর পশু জবাই করাই হলো ইবাদত। আর এই ইবাদতই আল্লাহর সন্তুষ্টিঅর্জনের উপায় ও বান্দার আখেরাতে নাজাত লাভের উপায়।

তিন. অনেক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কীভাবে কুরবানী করেছেন। কী নিয়ত করেছেন, কেমন পশু সংগ্রহ করেছেন, কুরবানীর সময় কী দুআ‘ করেছেন ইত্যাদি সব হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত উম্মতের মধ্যে এই ইবাদত অবিচ্ছিন্ন ধারায় তাওয়াতুর ও তাওয়ারুসের সাথে একটি শিআ‘ররূপে মুসলমানদের সম্মিলিত ও সুপ্রকাশ্য ইবাদত হিসাবে চলমান আছে। অতএব কেউ যদি কুরবানীর বিধান পালনে বাহানা তালাশ করে তবে সে নিশ্চিতই শরীয়ত অস্বীকারকারী।

চার.কুরবানী যেদিন করা হয় সেই দিনের নাম হাদীস শরীফে এসেছে يوم الأضحى, আরো এসেছে يوم النحر। দুনো শব্দের অর্থের মধ্যে আল্লাহর নামে ইবাদত হিসাবে পশু জবাইয়ের বিষয়টি রয়েছে। তাহলে পশু জবাই ছাড়া কুরবানী কীভাবে হতে পারে?

পাঁচ. যেহেতু কুরবানী ইসলামের একটি ইবাদত সুতরাং নিছক পশু জবাই কোনোভাবেই কুরবানীর উদ্দেশ্য হতে পারে না। তেমনি শুধুই উৎসবের গোশতের প্রয়োজন পূরণের জন্যও কুরবানী নয়। তাহলে তো আর কুরবানীর ক্ষেত্রে এত নিয়ম-কানুন, এত এত মাসআলা-মাসায়েলের প্রয়োজন হতো না। কুরবানীর পশু এমন হতে হবে, এমন হলে হবে না, এই সময়ের মধ্যে কুররবানী করতে হবে, এর আগে-পরে করলে হবে না, ইত্যাদির প্রয়োজন হতো না।

গোশত খাওয়ার জন্যই যদি কুরবানী হতো তাহলে তো কুরবানীর ক্ষেত্রে ইখলাসের শর্ত থাকতো না। এই শর্ত থাকতো না যে, শরীকদের একজনও যদি গোশত খাওয়ার নিয়ত করে তাহলে কারোই কুরবানী হবে না।

তাহলে বোঝা গেলো, কুরবানীর মধ্যে মূল হলো ইবাদত। তবে আল্লাহই এই বিধান দিয়েছেন, নিয়মমতো শরীয়ত মুতাবেক কুরবানী হওয়ার পরে কুরবানীর গোশত নিজেরাও ভোগ করতে পারবে। আত্মীয়-স্বজনকেও দেবে এবং দরিদ্রদেরকেও দান করবে।

ছয়. যেহেতু কুরবানী ইসলামের একটি ইবাদত, সেহেতু অন্যান্য ইবাদতের মত এই ইবাদতও কাদের উপর ওয়াজিবএবং কাদের উপর ওয়াজিব নয়, কোন পরিস্থিতিতে ওয়াজিব ও কোন পরিস্থিতিতে ওয়াজিব নয় ইত্যাদি বিষয় ইসলামে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে। সুতরাং এখানে বিষয়টা কাউকে চাপিয়ে দেওয়ার মত বিষয় নয়। এই বিষয়ে কারো অস্পষ্টতা থাকবার কথা না। এখানে আরেকটি বিষয়, আচ্ছা, দেশে কি দৈনিক হাজার হাজার গরু, মহিষ, ছাগল ইত্যাদি জবাই হচ্ছে না? বাজারে কি গোশত বিক্রি হচ্ছে না? তাহলে কুরবানীর বিষয়টাকে ভিন্ন রকম সেন্টিমেন্ট দিয়ে বিচার করা হচ্ছে কেন?

সাত.বর্তমানে করোনা-পরিস্থিতির কারণে অর্থনীতির বেহাল অবস্থার কথা সবারই জানা আছে। কিন্তু আমরা সবাই জানি, দেশের খামারীরাসহ লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন-জীবিকার বড় একটা মৌসুম হলো কুরবানীর সময়। এই সব লোকজনের অধিকাংশই নিম্নবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্তের মানুষ। এখন কুরবানীর ক্ষেত্রে সামর্থ্যবানদের উৎসাহ-উদ্দীপনায় ভাটা পড়লে এতে বিপুল এই জনগোষ্ঠী মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে।

আট. কারো কারো পক্ষ থেকে কুরবানীকে কেন্দ্র করে অধিক হারে করোনা সংক্রমণের আশঙ্কা ব্যক্ত হচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্যে আমাদের বক্তব্য হলো, দেশে প্রয়োজনীয় কাজগুলো কি থেমে আছে? হাট-বাজার কি এখন বন্ধ হয়ে আছে? রাস্তা-ঘাটে কি গাড়ী-যানবাহন কম চলে? তাহলে শুধু জামাত, জুমআ‘ ও কুরবানী নিয়েই এত আশঙ্কা? হ্যাঁ, কীভাবে সতর্কতার সাথে কুরবানীর এই ইবাদতটুকু পালন করা যায় সবারই সচতেন হওয়ার প্রয়োজন আছে।

নয়.বলা হচ্ছে, কুরবানীর অর্থ দরিদ্রদেরকে বিতরণ করে দেওয়া অধিক শ্রেয়। এখানে আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, দরিদ্রদের সহযোগিতার প্রসঙ্গে এক শ্রেণীর মানুষ শুধু হজ¦-কুরবানীর মত ইসলামী ইবাদতগুলোকে নিয়ে আসেন কেন? খেলাধূলা, মদ-জুয়া, অশ্লীল বিনোদন ইত্যাদি ক্ষেত্রে সীমাহীন অপচয়ের প্রসঙ্গে তারা একটি শব্দও ব্যয় করেন না কেন? আমরা মনে করি, এই শ্রেণীটির পরিচয় সম্পর্কে কোনো ঈমানদারের সংশয় থাকা উচিত না। তাছাড়া দেশের মানুষ জানে, দরিদ্রদের কঠিন সময়ে ধর্মপ্রাণ আল্লাহমুখী মানুষজনই সবার আগে সবসময় এগিয়ে আসে।

দশ. সবশেষে কথা এই যে, করোনার মহামারি থেকে আমাদের পরিত্রাণ লাভের অন্যতম উপায় হতে পারে ইসলামের এই ইবাদতটি আরো অনেক বেশি জযবা ও উদ্দীপনা নিয়ে, অনেক বেশি ইখলাস ও আল্লাহমুখিতা নিয়ে পালন করা। এই ইবাদতের মাধ্যমে আমরা যেন সাইয়িদুনা হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ও সাইয়িদুনা হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালামের মতো আল্লাহর বিধানের সামনে সমর্পিত হতে পারি, সেই চেষ্টা করা। কয়েকটি কথা আরজ করা হলো। আল্লাহ যেন আমাদেরকে কবুল করেন। আমীন।

লেখক: মুহতামিম, জামিয়া দারুল আরকাম আল-ইসলামিয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া, শায়খুল হাদিস, জামিয়া ইউনুছিয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও সহ সভাপতি, বেফাক।

-এটি

ad