189744

আল্লামা ইকবাল: সমকালীন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তার চিন্তার প্রাসঙ্গিকতা

কবি মহিম মাহফুজ।।

সময়কে যারা পাঠ করতে পারেন সময়ের আগেই, চিন্তার সিঁড়ি বেয়ে ভবিষ্যৎ সময়ের গন্তব্য নিরূপণ করতে পারেন নির্ভুল পদ্ধতিতে, বিরল চেতনাবান সে মহান যুগস্রষ্টাদের আগমন ঘটে শতাব্দীর সুদীর্ঘ পরিসরে। উনিশ শতকের সে মহাচৈতন্য আল্লামা ইকবাল। তার উপর শান্তি বর্ষিত হোক। আজ তার মৃত্যুর দিন। তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।

পরিচয়প্রবণতা বিবেচনায় ইকবালকে মূল্যায়ন করা হয় কবি, রাজনীতিবিদ, দার্শনিক এবং আধ্যাত্মবাদী হিসেবে। তার রচনায় রয়েছে বহুধারাবিশিষ্ট বৈচিত্র্য। তার জীবন জুড়ে প্রত্যক্ষ করা যায় নানামুখী দিগন্তস্পর্শী দূরলক্ষ্যভেদী বিচরণ। তার রচনা ও জীবন অধ্যয়নসাপেক্ষে তার দার্শনিক সত্তাই প্রধান হয়ে ওঠে। আমৃত্যু তার নিরন্তর তৎপরতা ছিল ইসলামী কল্যাণদর্শন বা মুসলিম রেনেসাঁচেতনার নির্মাণের লক্ষ্যে।

উপমহাদেশে ইসলামী চিন্তাচর্চার ইতিহাস তার আগেও ছিল। এবং পূর্ববর্তী মুসলিম দার্শনিকদের উজ্জ্বল কর্মময় জীবনও মূল্যায়িত হয়েছে। কিন্তু তার পূর্ববর্তীদের চিন্তাচর্চার পরিসীমা অতি প্রশস্ত ছিল ইসলামের আভ্যন্তরীণ বিষয়াবলিতে। তারা বিপুল তৎপরতা নিয়ে মনোযোগী ছিলেন ইসলামের পালনীয় বিধানাবলীর যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা, বিশুদ্ধায়ন ও প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে।

ধর্মের সুস্থির রূপটির স্বরূপ সন্ধানই তাদের তৎপরতায় মৌলিকভাবে প্রাধান্য পায়। তবে আল্লামা ইকবাল দৃষ্টি প্রসারিত করেন ইসলামের অগ্রসরমান ও বিস্তরণশীল দিগন্তের দিকে। পালনের মধ্য দিয়ে ধর্মের প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত হওয়ার সাথে সাথে ধর্মের সম্প্রসারণও আবশ্যিকতা লাভ করে। সে পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মুসলিম উম্মার ঐক্য। প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ইতিহাসের নানা ধারায় বিচরণ। শানিত চিন্তার সমন্বয় এবং বহির্বিশ্বের সাথে যোগাযোগ স্থাপন। এখানেই আল্লামা ইকবাল তার পূর্ববর্তীদের পরিমণ্ডল অতিক্রম করে একটি নতুন দিগন্তের দুয়ার খুলে দিয়েছেন। হাজির করেছেন মুসলিম উম্মার পুনর্জাগরণমূলক কল্যাণদর্শনের নতুন ইশতেহার।

আল্লামা ইকবাল আবির্ভূত হয়েছিলেন সহস্রাব্দের ইসলামী খেলাফত বিলুপ্তির কিছুকাল পরেই। মুসলিম উম্মার আদর্শিক পতন এবং বিশ্বব্যাপী নিগৃহীত হবার বেদনাদায়ক অধ্যায় ইকবাল প্রত্যক্ষ করেছেন। তৎপর হয়ে উঠেছিলেন এই পরিণতির কারণ অনুসন্ধান ও উত্তরণের পথ অন্বেষণ। চিরায়ত জ্ঞানের আকর পবিত্র কোরআনর ভিত্তিভূমির উপর দাঁড়িয়ে প্রাচীন ও আধুনিক নানাবিধ জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমন্বয়ে ইকবাল নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন নবযুগ রচনার নতুন দর্শন। মুসলিম উম্মাহর পুনর্জাগরণের চিরায়ত পথনির্দেশ।

চিরায়ত জ্ঞানের উৎস পবিত্র কুরআন এবং হাদীসের জ্ঞান লাভের মাধ্যম হিসেবে আল্লামা ইকবাল বিবেচনা করেছেন তিনটি উপায়। ক. মুসলিম উম্মাহর পালনীয় জীবনে আধ্যাত্মবাদের চর্চা। খ. জ্ঞানচর্চার গভীরে প্রবেশ করে প্রকৃতির স্বরূপ ও নিগুঢ় তত্ত্ব অনুসন্ধান। গ. মানবজাতির সামগ্রিক ইতিহাসের পাশাপাশি পবিত্র কোরআনে নির্দেশিত জাতি ও জনপদভিত্তিক ইতিহাস অধ্যয়ন।

বৈশ্বিক পরিমন্ডলে মুসলিম উম্মার তৎকালীন পরিস্থিতি বিবেচনায় আল্লামা ইকবালের এ দর্শন যতটা প্রাসঙ্গিক ছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে তার প্রাসঙ্গিকতা বহুগুণে বর্ধিত। ইসলামের শিকড় থেকে মুসলিম উম্মার আদর্শিক বিচ্যুতি ইকবালের সমকালে যতটা ব্যাপক ছিল বর্তমানে যে কোন বিবেচনায় সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি অত্যন্ত শোচনীয়। মৌলিক আদর্শ থেকে বিচ্যুতির ফলে বিশ্বমুসলিম সমাজ আজ দিকভ্রান্ত এক যাযাবর জনগোষ্ঠীর তুলনায়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে মুসলমানদের চিরকালীন প্রতিপক্ষ।

বিশ্বমুসলিমসমাজে তাই আজ আক্ষরিক অর্থেই গৃহযুদ্ধ দৃশ্যমান। আর এতে যথারীতি সাপ ও ওঝা হিসেবে সেই সনাতন প্রতিপক্ষকেই দেখা যায়। অপরদিকে সাধারণ মুসলমান সমাজ পরস্পর বিবাদে লিপ্ত ধর্মের পালনীয় বিষয়াবলীর শুদ্ধাশুদ্ধি নির্ণয়ে। এতে মীমাংসার সম্ভাবনা আশা করাও দুরাশার শামিল।

মুসলিম উম্মার অগ্রগামী ও অনুগামী সমাজের বিপরীতমুখী বিষয়ে অপ্রয়োজনীয় তৎপরতা এবং প্রয়োজনীয় প্রসঙ্গে নির্লিপ্ততার মধ্য দিয়ে ইসলামের সুস্থির পরিসরেই তারা সীমাবদ্ধ থাকছেন। ইসলামের সম্প্রসারণ ও বিস্তরণশীল চিন্তাদর্শন বলতে গেলে উভয় শ্রেণীর চিন্তাজগতে সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত। দোর্দণ্ড প্রতাপের সাথে গোটা বিশ্ব শাসন করা মুসলিম জাতি আজ আত্মপ্রতিরক্ষা করতেও অক্ষমতার চূড়ান্ত পর্যায়ে।

মুসলিম উম্মার এই ঘোড়তম দুর্দিনে আল্লামা ইকবালের পুনর্জাগরণী চিন্তাচর্চার প্রয়োজন সীমাহীন আবেদন নিয়ে হাজির হয়েছে। আল্লামা ইকবাল তাই সমকালীন বিশ্বে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রাসঙ্গিক। ইসলামের অস্তিত্বের সাথে সম্প্রসারণ সমানভাবে গুরুত্ববহ। তেমনি এ প্রসঙ্গে ইকবালর প্রয়োজন প্রতিটি কালেই অনস্বীকার্য।

আল্লামা ইকবাল তাই প্রতিটি কালেই সমকালীন। প্রতিটি কালেই আল্লামা ইকবালের চিন্তাদর্শন প্রাসঙ্গিক। মুসলিম উম্মার গৌরবময় অতীত পুনরুদ্ধার করতে এবং মুসলমানদের ভবিষ্যৎবিজয় নিশ্চিত করতে আল্লামা ইকবাল পূণর্পঠিত হবার বিকল্প নেই।

লেখক, সম্পাদক- কল্যাণচিন্তা ও সংস্কৃতির কাগজ আনতারা।

ওআই/আবদুল্লাহ তামিম

Please follow and like us:
error1
Tweet 20
fb-share-icon20

ad