fbpx
           
       
           
       
রঙিন মখমল দিন এবং কিছু রসকষহীন অনুভূতি
জানুয়ারি ২৭, ২০১৮ ১১:২৯ অপরাহ্ণ

বইয়ের নামঃ রঙিন মখমল দিন।  লেখকঃ শরীফ মুহাম্মদ।
প্রকাশকঃ নবপ্রকাশ।  মুদ্রিত মূল্যঃ ২৩০৳

শরীফ মুহাম্মদ। ছোটবেলার শরীফ চাচ্চু। বড়বেলায় এসে কিছুটা লাজুক দৃষ্টি। যেন কাতেবে কালআ’লাম। চোখ পড়ে গেলেই এপাশ ওপাশ করে পালিয়ে যাই। মনে হয় এতোটা মহানত্বের ধারক, এ মানুষটির হাত ছোঁব কী করে? ক্যানো-বা আমি আমার অনাগত লজ্জাকে টেনে টেনে কাছে নিয়ে এসে একটু অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে হাসি মেলে ধরতে চাইবো?

শরীফ চাচ্চুর একটা বই বেরুলো সেদিন। রঙিন মখমল দিন। কিছুটা আত্মজীবন। কিছুটা শৈশব। ঘোরলাগা গদ্যের এক মহা সমারোহ। যেন বা উথলে পড়ছে দরদ। তড়পাচ্ছে ক্রমাগত। প্রিয় মানুষের বই এলে সবার ভেতরই কেমন কেমন নড়ে ওঠে।

অধীর আগ্রহে যাপিত সময় বারেবারেই খুঁজে ফিরি এদিকওদিক। ঠিক এমন সময়েই নাজিল হলেন ইফতেখার জামিল। মধ্যবাড্ডার এক শীত শীত সন্ধ্যায় তিনি আমাদের বগলদাবা করে দিলেন এক রঙিন মখমল দিন।

শরীফ চাচ্চুর বই নিয়ে এমন অনুভূতির সম্মুখীন হলে আমার তার প্রতি তীব্র অভিমানের সৃষ্টি হয়। একটা সময় এমন ছিলো, ‘সকালের মিষ্টি রোদ’ অথবা ‘এই গরবের ধন’ কিংবা অন্যান্য বইসব পাঠকের দ্বারস্থ হলে শরীফ চাচ্চু কী প্রেম আর মুহাব্বত নিয়ে আমাদের ভালোবেসে ফেলতেন।

বইয়ের প্রথম পাতায় চকচকে নিল রঙের হরফে লিখা থাকতো “সাদ আর যিয়াদ, প্রীতি নিয়ো”। কিন্তু এখন? হয়তো কখনো দেখা হয়ে গেলে একটু হাসি। একটু পুরোনো প্রেম। তেড়ে আসতে থাকে। আমার অভিমানটা ঠিক এখানেই। আমাদের মন চায়, তাকে আরো পাই আরো পাই। কাছে থেকে আরও কিছু শিখে নিই।

এবার কথা বলি বই নিয়ে। শরীফ মুহম্মদ সবার চাইতে ভিন্ন। একটু আলাদা থেকে সৃজনের প্রচেষ্টা হতেই হয়তো তিনি আবির্ভূত করেন তার গদ্যাদি। ছোট ছোট শব্দ-বাক্য। দক্ষ নির্মাতার মত তার নির্মাণশৈলী। প্রতিটিতেই যেন ঝরে পড়ছে সুবিস্তৃত অর্থের মাকালগুলো। এটা আমার কাছে সবচাইতে ভাল লেগেছে। হাসি কান্নার মিশ্রণে খলবলিয়ে ওঠা দুরন্ত শৈশবের সেসব বয়ান, থোকায় থোকায় জোনাক জ্বলবার মতই অনেকটা।

শরীফ মুহম্মদের এ শৈশবকথন, এ দুরন্তপনা কিংবা মখমলরঙা ফেলে আসা স্মৃতির পাতা; এসবের ভেতর আমি কেমন যেন নিজের সঙ্গে প্রচণ্ড মিল খুঁজে পেয়েছি একবার আবার হয়তোবা কখনো নিজের সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্রই খুঁজে পাইনি।

যখন উচ্চারিত হচ্ছিলো বারেবারে হাফেজ্জী হুজুরের নাম কিংবা কখনো আব্দুল হাই পাহাড়পুরী, আমার ভেতরে তখন ঢেউয়েরা দোলা দিতে থাকলো অদ্ভুত অভিনবে। গর্ভে ভরে উঠলো ভেতরটা।

মাঝে মাঝে যখন শৈশবের রেললাইন ধরে ময়মনসিংহের ঝকঝকে সকালবেলায় শরীফ মুহম্মদ হেঁটে যেতে থাকেন কুরানখানি বুকে চেপে, তখন আমার সমস্ত জুড়ে সৃষ্টি হয় সুতীব্র ব্যথা। চাপা কষ্টের আবডালে বিড়বিড় করে বলি, এমন শহুরে ইট-পাথুরে জীবনের ভেতর আমি কোথায় তালাশ করব এমন সুখ?

মাঝে মাঝে যখন হীনমন্যতার তীব্র কড়াঘাত টের পাই, তখন আমি মনে করতে চেষ্টা করি রঙিন মখমল দিনের কথা। হাসি-কান্নার মিশ্রণেই তো সব। যেমন করে কামরাঙ্গির চরের খেয়াঘাটে শরীফ মুহাম্মদের নৌকা তীরে এসে তরী ঠেকায় ইলমের গভীর পিপাসায়, শরীফ মুহম্মদের অব্যক্ত ব্যথাগুলো জেগে উঠতে থাকে। মনে পড়ে মায়ের কথা। কিন্তু যেতে হবে তো মানযিলে মাকসাদে।

‘হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালার মতো কেউ কেন আসছেন না যার পেছনে আমরা ছুটে যাবো’

তিনি তো এসব যাতনা সয়েই আজকের শরীফ মুহম্মদ হয়েছেন। হয়েছেন কাতেবে কালআ’লাম। তবে কেন সামান্য প্রতিকূলতার ভেতরে চলে এলেই আমার ভেতরে এত কষ্টের সৃষ্টি হবে? উঁহু। ঝেড়ে ফেলি সব। দেখি আকাশ ছুঁয়ে দেখবার স্বপ্ন। একজন কওমি পড়ুয়া ছাত্র হিসেবে গর্বে আমার বুক ভরে ওঠে।

শরিফ মুহম্মদের ছেচল্লিশ বছরের মিষ্টি রঙের এ জীবন, এখানে এসেও তার ফেলে আসা শৈশবের মুখ দেখবার প্রচেষ্টা আমাদেরকে প্রচণ্ড আনন্দিত করেছে। অন্তত আমাকে করেছে। সুখেও পেয়েছি তীব্র আনন্দ আর দুঃখের সময়েও অনুভব করেছি কান্নার অন্তরালে চাপা চাপা সুখ।

যাইহোক, রঙিন মখমল দিন নিয়ে আলাপ করতে গিয়ে বিচ্ছিন্ন ভাবে কী দিয়ে কি বললাম, কোনোরকম দাড়িকমা ছাড়া; এর জন্য ক্ষমা করবেন শরীফ মুহম্মদ। কিন্তু পাঠক, কিছু শিখতে চাইলে অবশ্যই পড়ুন রঙিন মখমল দিন। দেখুন, আপনার শৈশবকেও কী অদ্ভুতভাবে রাঙিয়ে তুলছে।

বইটি রকমারি ডটকম থেকে কিনতে ক্লিক করুন