নবীযুগে নারীরা ইসলাম নির্দেশিত শালীন পোশাক না পরে নিজেদের মতো করে পোমাক পরে রাসূলুল্লাহ সা. এর নিকট আসতেন এবং রাসূল সা. তাদেরকে কখনো কিছুই বলেননি মর্মে জামায়াতের আমির ড. শফিক সাহেব যে বক্তব্য দিয়েছেন তা সম্পূর্ণ ভুল এবং অজ্ঞতার শামিল। হয়তো তিনি না বুঝেই নারী সাহাবী ও নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাপারে মারাত্মক অবান্তর ও অশোভনীয় মমন্তব্য করে বসেছেন। তার উচিত ভুল স্বীকার করে তাওবা করা এবং প্রকাশ্যে এই বক্তব্য প্রত্যাহার করে নেওয়া।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ঢাকা মহানগরের আমির মাওলানা মাহবুবুর রহমান ঢাকুবী এসব কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন, অশালীন পোশাক পরে কোনো নারী সাহাবী মসজিদে নববীতে এসেছেন এমন ইতিহাস পাওয়া যায় না। অথচ, বিষয়টা তিনি এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যেন বিষয়টা খুবই স্বাভাবিক ছিল। এটা নিঃসন্দেহে নারী সাহাবীদের রুচি-পছন্দ ও লাজ-লজ্জার ওপর চরম মিথ্যাচার। অথচ, নারী সাহাবীগণ কাপড় পরিধানের ব্যাপারে খুবই সচেতন ছিলেন যা হাদীসের আলোকে সুস্পষ্ট বুঝে আসে।
আম্মাজান আয়িশা সিদ্দীকা রা.-এর সাথে আপন ভাতিজী হাফসা বিনতে আবদুর রহমান রা. একবার দেখা করতে এলেন। তার মাথায় তখন পাতলা কাপড়ের ওড়না ছিল এবং তিনি নিতান্তই কম বয়সী ছিলেন। সায়্যিদা আয়িশা রা. ওড়নাটা ছিঁড়ে দু টুকরো করে দুটোকে জোড়া দিয়ে পুরু করে দিলেন আর বললেন, এমন পাতলা কাপড় পরিধান বৈধ নয়।
এমনিভাবে সায়্যিদা আসমা বিনতে আবু বকর রা. কে একবার হাফসা রা. এর স্বামী মুনজির অতি মূল্যবান কুহুস্তানি মারভী কাপড় হাদিয়া পাঠিয়েছিলেন। কাপড়টা ছিল বেশ পাতলা ও মোলায়েম। কাপড়টা ধরেই আসমা রা. মন্তব্য করলেন, উঁহু, এই কাপড় পরা যাবে না। এতে দেহসৌষ্ঠব প্রকাশিত হয়ে যাবে। ভাতিজী-জামাই মুনজিরের মন খারাপের তোয়াক্কা না করেই তিনি কাপড়টা ফেরত দেন।
নবীযুগে যেখানে কাপড় নির্বাচনে নারীরাএমন সতর্ক ছিলেন তাদের ব্যাপারে কথা বলতে জামাআত আমীর ডা. শফিকের প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক ছিল।
এছাড়া জামাআত আমির নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে অবান্তর মন্তব্য করে বলেছেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অশালীন পোশাক পরিহিত নারীদের কখনোই বলেননি, আগে আপনার কাপড় ঠিক করে আসুন।
তার এহেন বক্তব্যের দ্বারা সাধারণ মানুষের মাঝে ভুল বার্তা ও বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। অথচ, বাস্তবতা হলো, একজন ভদ্র রুচিবান মানুষও অশালীন কাপড় পরিহিতা কারও সাথে কথা বলতে হলে আগে তাকে শালীন পোশাক পড়তে বলবেন। এটাই সুস্থ ও স্বাভাবিক রুচিবোধের দাবী। তাছাড়া এহেন পরিস্থিতিতে কী করনীয়? কীভাবে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সামলাতে হয়? তা নবী সা. নিজ আমল দ্বারা দেখিয়েছেন এবং শিখিয়ে দিয়ে গেছেন।
সায়্যিদা আসমা বিনতে আবু বকরকে তিনিই ‘জাতুন নিতাকাইন’ উপাধি দিয়েছিলেন। সম্পর্কে তিনি স্ত্রীর বড় বোন। সম্মানিত আত্মীয়া। একদিন ঘরে ঢুকে দেখলেন, আয়িশা রা.-এর সাথে তিনি বসা। পরনের পোশাকটি তুলনামূলক পাতলা। নবী করীম সা. সাথে সাথে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। আয়িশা রা. বুঝতে পারলেন, কিছু একটা ঘটেছে। বোনকে চলে যেতে বললেন। আসমা রা. চলে গেলেন। আয়িশা রা. বেরিয়ে নবীজী কে জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে? নবী করীম সা. বললেন, তার অবস্থা দেখেছো? কোনো মুসলিম নারীর উচিত নয় এমন কাপড় পরিধান করা যা এটা ও এটা (মুখমণ্ডল ও হাতের আঙুল) ছাড়া আর কিছু উন্মুক্ত করে ফেলে। [সুনানুল কুবরা, ১৩৪৯৭]
অন্য বর্ণনামতে, আসমা রা. একটি পাতলা শামি কাপড় পরে নবীজীর সামনে চলে এলে তিনি ভর্ৎসনা করে বলেন, কোনো মেয়ে সাবালিকা হয়ে গেলে চেহারা ও হাতের তালু ব্যতীত আর কিছু উন্মুক্ত হয়ে যাওয়া উচিত নয়।
(আলবানি হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন। তিনি বাইহাকীর একটি বর্ণনার বরাত দিয়ে বলেছেন, মূলত কাপড় পাতলা ছিল না; হাতা ছিল বড়; যদ্বরুণ হাতের কব্জির নিম্নাংশ উন্মুক্ত হয়ে যাচ্ছিল।) [সহিহুল জামে, হা.-৭৮৪৭]
এই ধরনের স্পষ্ট বিবরণ থাকার পরও তিনি ‘কখনো নিষেধ করেন নি’ বলে যেভাবে অস্বীকার করা হয়েছে, তা নিতান্ত ভুল ও মারাত্মক অপরাধ। তার উচিত তাওবা করা ও প্রকাশ্যে ভুল স্বীকার করা; যাতে তার ভুলকে অন্যরা দলিল বানাতে না পারে।
বস্তুত, ইসলামকে ইসলামের মত করে মানতে ও উপস্থাপন করতে হবে। ইসলামি প্যারাডাইমকে মূল ধরে আলাপ অগ্রসর করতে হবে। প্রয়োজন হলে সেক্যুলার প্যারাডাইমের দুর্বলতা ও অসারতা তুলে ধরে এগুতে হবে। ইসলাম সেক্যুলার চিন্তা বা গণতন্ত্রের সাথে কনট্রাডিক্ট নয় প্রমাণ করার জন্য যাচ্ছেতাই ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর প্রচেষ্টা গর্হিত অপরাধ। তাই প্রতিটি বিবেকবান মানুষের উচিত ধর্মীয় যেকোনো বিষয়ে কথা বলতে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ভুলের জন্য তৎক্ষণাৎ তাওবা করে নেওয়া।
এনএইচ/