বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬ ।। ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ ।। ২৭ রবিউস সানি ১৪৪৮


মাওলানা আব্দুল মালেক হাফিজাহুল্লাহ ও আমি

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহীত

|| মাওলানা মামুনুল হক ||

ফক্বীহ মাওলানা আব্দুল মালেক হাফিজাহুল্লাহ। তিনি বাংলাদেশের শুধু একজন শীর্ষ আলেমই নন, বরং আমার দৃষ্টিতে একজন ক্ষণজন্মা অতুলনীয় ইলমি ব্যক্তিত্ব। সমকালে এমন গভীর ও প্রশস্ত ইলমের অধিকারী ব্যক্তি সাহসা নজরে পড়বে না। তিনি বাংলাদেশে তিন দশকের বেশি খেদমত করছেন। উচ্চতর গবেষণামূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের ইলমচর্চাকে এক অনন্য উচ্চতায় উন্নীত করেছেন। তুলনামূলক বিশ্লেষণ করতে গেলে বলা যায়, মওলানা আব্দুল মালেক সাহেবের ইলমী খেদমতের আগ পর্যন্ত ভারত-পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশ অনেকটাই পিছিয়ে ছিল। কিন্তু কোনো কোনো বিবেচনায় বলা যায়- বাংলাদেশের ইলমচর্চা এখন পাকিস্তান ভারতের চেয়ে অগ্রসর। এটা বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ ও আলেম সমাজের উপর মওলানা আব্দুল মালেকের এক বিরাট অবদান, যা অস্বীকার করার উপায় নেই।

দুই.

মওলানা আব্দুল মালেক হাফিজাহুল্লাহ আমার খাস উস্তাদ। আমি ওনার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি ফরম পুরণ করে ওনার ছাত্রত্ব গ্রহণ করতে না পারলেও তিনি আমাকে বিশেষ বিবেচনায় তার শিষ্যত্ব গ্রহণের সুযোগ দান করেছেন। ২০০২/৩ সালে যখন মারকাযুদ দাওয়াহ মোহাম্মদপুর বিআরটিসি বাসস্ট্যান্ড সংলগ্নে কার্যক্রম পরিচালনা করতো, আর আমি সাত মসজিদ সংলগ্ন জামিয়া রহমানিয়ায় শিক্ষক ছিলাম। তখন একাধারে প্রায় দেড় বছর আমি মওলানার ছাত্রত্ব গ্রহণের সুবর্ণ সুযোগ লাভ করেছি। মওলানা জাকারিয়া আবদুল্লাহ, মওলানা আনিসুর রহমানরা মারকাযুদ দাওয়ায় উলূমুল হাদিস বিভাগে প্রথম বর্ষের ছাত্র। সে বছর আমি মওলানা আব্দুল মালেক সাহেবের অনুমতি নিয়ে দরসে শরিক হই এবং দরসের বাইরেও মুতালাআর জন্য বিশেষ সহযোগিতা গ্রহণ করি। মওলানা আব্দুল মালেক সাহেবের কাছে ক্লাসে বসে আমি নিয়মিতভাবে যতগুলো কিতাব পড়েছি, হয়তো পরবর্তী সময়ে মারকাযুদ দাওয়াহর নিয়মিত ছাত্ররাও ততগুলো দরস এবং কিতাব পড়ার সুযোগ পায় না। আমি প্রতিদিন পূর্ণ দুটি দরসে বসতাম। দুটি দরসই হুজুর তখন পড়াতেন। একটি দরসে ছিল মুকাদ্দিমায়ে ইবনুস সালাহ। যেটি তিনি ধারাবাহিকভাবে সারা বছর পড়িয়েছেন। উলুমুল হাদিসের প্রাথমিক যে জ্ঞান, সেটি আমি অর্জন করতে চেষ্টা করেছি।

দ্বিতীয় আরেকটি দরস ছিল যেটি উলুমুল হাদিস এবং উলুমুল ফিকহ উভয় বিভাগের সমন্বয়ে পরিচালিত হতো-সেই দারসটিতেও তিন সেমিস্টারে তিনটি কিতাবের দরস হয়েছে। এক সেমিস্টারে ছিলো ফিকহু আহলিল ইরাক ওয়া হাদীসুহুম। আরেক সেমিস্টারে ছিলো আসারুল হাদিসিস শরিফ ফী ইখতিলাফিল আইম্মাতিল ফুকাহা। আরেক সেমিস্টারে ছিলো আর-রাফউ ওয়াত-তাকমীল। এভাবে চারটি কিতাব এবং চারটি বিষয়ে সরাসরি দীর্ঘ দরসের মাধ্যমে মওলানা আব্দুল মালেক সাহেবের কাছ থেকে আমি শিক্ষা গ্রহন করেছি। তাই আমি মওলানা আব্দুল মালেক সাহেবকে আমার ঐ সকল উস্তাদদের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করি যাদের হাতে আমার শিক্ষার ভিত গড়ে উঠেছে। আমার জীবনে মওলানা আব্দুল মালেক হাফিজাহুল্লাহর বাইরে যদি এমন আরো শিক্ষকের নাম বলতে হয়, তাহলে সে নাম হবে শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রাহিমাহুল্লাহ । আর হবেন মুফতি মনসুরুল হক, মওলানা হিজুর রহমান হাফিজাহুমাল্লাহ। পরবর্তীতে আমি মুফতি হেফজুর রহমান দামাত বারাকাতুহুমের কাছেও ফিকহের উপর বিশেষ দরস গ্রহণ করেছি।

এই তথ্যগুলোর মাধ্যমে আমি যেটি সাব্যস্ত করতে চাচ্ছি সেটি হলো, মওলানা আব্দুল মালেক সাহেব শুধু আমার শিক্ষকই নন বরং আমার ছিটে ফোঁটা যতটুকু যোগ্যতা বা জ্ঞান অর্জনের সুযোগ হয়েছে, তার অন্যতম প্রধান ভিত এবং স্তম্ভ হলেন মওলানা আব্দুল মালেক। উপুরোক্ত কথাগুলোর মাধ্যমে আমি বোঝাতে চাচ্ছি যে, মওলানা আব্দুল মালেক হাফিজাহুল্লাহ যেহেতু আমার এমন ঘনিষ্ঠ এবং ইলম ও জ্ঞানের ভিত্তি স্থাপনের বুনিয়াদ হিসাবে রয়েছেন। কাজেই তার ইলম, শিক্ষা এবং তার চিন্তা ও দৃষ্টিঙ্গির প্রতি, আমি যদি কখনো অকৃতজ্ঞ হই তাহলে আমি নিজেই নিজের প্রতি অকৃতজ্ঞ হয়ে যাবো। এছাড়াও আমি মওলানা আব্দুল মালেক সাহেবকে এতো বেশি আত্মমর্যাদা সম্পন্ন, ইলমের গভীরে ডুবন্ত, কিতাবের পাতায় পাতায় বিচরণকারী, দুনিয়া বিমুখ, নির্মোহ ও নির্লোভ একজন মহান সাধক পুরুষ হিসেবে পেয়েছি, যার দৃষ্টান্ত বর্তমান সময়ে পাওয়া কঠিন।

তবে চলমান বিশ্বব্যবস্থা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনীতি, সরকার ও রাষ্ট্রব্যবস্থা-ইত্যাকার বিষয়গুলোতে আমি মওলানা আব্দুল মালেক সাহেবের শিষ্যত্ব গ্রহণ করিনি। তাই এ বিষয়গুলোতে আমি ওনাকে পরিপূর্ণভাবে অনুসরণ করতে পারিনা। এই ক্ষেত্রে আমার শিক্ষকতুল্য অভিভাবকত্ব যারা করে থাকেন তাদের মধ্যে বর্তমান সময়ে আমি সবচেয়ে বেশী আস্থা রাখি মওলানা লিয়াকত আলি সাহেবের উপর।

এই বিষয়গুলোকে সকলের সামনে স্পষ্ট করার মাধ্যমে যে বার্তাটি আমি দিতে চাই সেটি হলো, আমি ব্যক্তি এবং আমার ইলমী অস্তিত্বের প্রতিটি কনা মওলানা আব্দুল মালেক সাহেবের কাছে ঋণী। সেই হিসাবে, আমি হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহুর একটি সুপরিচিত মন্তব্য উদ্ধৃত করতে চাই,

انا عبد من علمني حرفا فهو مولاي

 ان شاء باع وان شاء اعتق و ان شاء استرق

"যার কাছ থেকে একটি অক্ষরের জ্ঞানও শিখেছি, আমি তার গোলাম, তিনি আমার মালিক। তিনি চাইলে আমাকে বিক্রি করে দিতে পারেন, চাইলে মুক্ত করতে পারেন অথবা তিনি চাইলে আমাকে ক্রীতদাস গোলাম হিসাবেও রেখে দিতে পারেন"।

একটি অক্ষর জ্ঞানের যদি এতটা হক থেকে থাকে সেই ক্ষেত্রে আমার ব্যক্তির উপর মওলানা আব্দুল মালেক সাহেবের এর চেয়ে অনেক বড় হক এবং অধিকার রয়েছে বলে আমি মনে করি। সেই হিসাবে তিনি ব্যক্তি মামুনুল হকের ব্যাপারে অনেক কঠোর এবং কড়া কথা বলার সম্পূর্ণ অধিকার রাখেন।

আমার ব্যাপারে মওলানা আব্দুল মালেকে সাহেবের কঠোর অথবা কঠিন কোনো মন্তব্যে উপযাজক হিসেবে কেউ এসে কোনো ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য করাটা আমি শিষ্টাচার বহির্ভূত মনে করি। উপরন্তু, কেউ যদি এসে ওনার ইলম আমল ইখলাস দুনিয়াবিমুখতা এবং ওনার নির্মোহতার মত মহৎ গুণগুলো নিয়ে ভিন্ন কোনো মন্তব্য করতে চায় আমি তাকে নিছক অজ্ঞ  মূর্খ ও ক্ষেত্রবিশেষে সীমালঙ্ঘনকারী বলা ছাড়া আর কোনো মন্তব্য করতে পারব না।

বিষয়টি সকলেই যার যার সীমায় থেকে অনুধাবন করবেন বলে আশা করি।

লেখক: আমির, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ