|| মিনহাজ উদ্দীন আত্তার ||
একটি স্বীকৃতি শুধু একটি কাগজের সনদ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা, আত্মমর্যাদার অনুভূতি এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনার স্বপ্ন। ২০১৭ সালে কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসকে ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি বিষয়ে স্নাতকোত্তর সমমানের আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল। দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হওয়ায় কওমি অঙ্গনে তৈরি হয়েছিল নতুন আশার আলো। অনেকেই মনে করেছিলেন, এই স্বীকৃতির মাধ্যমে কওমি শিক্ষিতদের জ্ঞান, যোগ্যতা ও মেধার যথাযথ মূল্যায়নের পথ উন্মুক্ত হবে।
কিন্তু স্বীকৃতির কয়েক বছর পর বাস্তবতার দিকে তাকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—কওমি সনদের আইনি স্বীকৃতি কি কর্মক্ষেত্রে প্রকৃত মর্যাদা নিশ্চিত করতে পেরেছে?
রাষ্ট্রের স্বীকৃতি নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক অর্জন। তবে কোনো শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত মর্যাদা শুধু ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তার প্রতিফলন ঘটে কর্মক্ষেত্রে, নিয়োগনীতিতে, পদোন্নতির সুযোগে এবং সমাজে সেই শিক্ষার গ্রহণযোগ্যতায়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে কওমি শিক্ষিতদের সামনে এখনো কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
কওমি মাদ্রাসা বাংলাদেশের একটি প্রাচীন ও স্বতন্ত্র শিক্ষাধারা। শত বছরের ঐতিহ্য, আত্মত্যাগ, দ্বীনি জ্ঞানচর্চা ও নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে এই ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশের অসংখ্য মসজিদের ইমাম, খতিব, শিক্ষক, গবেষক ও ধর্মীয় নেতৃত্ব এই শিক্ষা ব্যবস্থা থেকেই গড়ে উঠেছেন। তাই এই শিক্ষাধারার শিক্ষার্থীদের মেধা ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন সময়ের দাবি।
সম্প্রতি কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের ‘জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৬’ নিয়ে আলোচনার পর কওমি অঙ্গনে নতুন করে কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অনেকের অভিযোগ, দাওরায়ে হাদিসকে স্নাতকোত্তর সমমানের স্বীকৃতি দেওয়া হলেও বাস্তব নিয়োগ কাঠামোতে সেই মর্যাদার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেনি। ফলে স্বীকৃতি ও বাস্তব সুযোগের মধ্যে একটি ব্যবধান রয়ে গেছে বলে অনেকে মনে করছেন।
বিশেষ করে আলিয়া মাদ্রাসায় কওমি সনদধারীদের শিক্ষক হিসেবে সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে পদমর্যাদা, পদোন্নতি ও পেশাগত অগ্রগতির বিষয়গুলো নতুন করে পর্যালোচনার দাবি রাখে। যদি একটি সনদকে উচ্চশিক্ষার সমমান দেওয়া হয়, তাহলে সেই যোগ্যতার যথাযথ ব্যবহার ও মূল্যায়নের সুযোগও থাকা প্রয়োজন। অন্যথায় স্বীকৃতি কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়।
একজন শিক্ষিত মানুষের প্রকৃত মর্যাদা শুধু তার সনদের নামের ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে সেই জ্ঞান ও দক্ষতা সমাজে কতটা কাজে লাগানোর সুযোগ তিনি পাচ্ছেন তার ওপর। কওমি শিক্ষিত আলেমদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই। তাঁদের দীর্ঘ অধ্যয়ন, আরবি ভাষা, হাদিস, তাফসির, ফিকহ ও ইসলামী জ্ঞানের দক্ষতাকে আধুনিক কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করা হলে দেশ উপকৃত হবে।
তবে এ আলোচনায় একটি ভারসাম্যের বিষয়ও মনে রাখা জরুরি। কওমি শিক্ষার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, ঐতিহ্য ও স্বকীয়তা রক্ষা করেই এর আধুনিক কর্মক্ষেত্রে সম্প্রসারণ ঘটাতে হবে। স্বীকৃতি মানে শুধু অন্য একটি শিক্ষাধারার অনুকরণ নয়; বরং নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে যোগ্যতার ন্যায্য মূল্যায়ন নিশ্চিত করা।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে কোনো শিক্ষাধারার শিক্ষার্থী তার পরিচয়ের কারণে পিছিয়ে থাকবে না। যেখানে যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততার ভিত্তিতে প্রত্যেক নাগরিক তার যথাযথ সুযোগ পাবে। কওমি সনদের স্বীকৃতি যদি সত্যিকার অর্থে সফল করতে হয়, তবে এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে ন্যায্য নিয়োগনীতি, পেশাগত উন্নতির সুযোগ এবং সামাজিক মর্যাদার বাস্তব নিশ্চয়তা।
কারণ প্রকৃত স্বীকৃতি তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা শুধু সনদে নয়—মানুষের কর্মজীবন, আত্মমর্যাদা ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনায় প্রতিফলিত হয়।
কওমি সনদ তাই শুধু একটি শিক্ষাগত পরিচয় নয়; এটি লাখো শিক্ষার্থীর আশা, শ্রম ও স্বপ্নের প্রতীক। সেই স্বপ্নের প্রতি সুবিচার করা রাষ্ট্র, সমাজ ও সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের যৌথ দায়িত্ব।
লেখক, আলেম ও কৃষি উদ্যোক্তা; ফাউন্ডার, কতকিছুর হাট; ই-মেইল: minhazantor10@gmail.com
আইও/