মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬ ।। ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩ ।। ১৪ সফর ১৪৪৮


মক্তব ও হিফজখানার শিক্ষকদের প্রতি কিছু নিবেদন

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

|| মুফতি জাবের কাসেমী ||

আপনি যদি মক্তব ও হিফজের শিক্ষক হন, তবে এই কথাগুলো আপনার জন্যই। মনে রাখবেন, শিক্ষকতা কোনো পার্ট-টাইম পেশা নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের দায়িত্ব। একজন মক্তব ও হিফজ শিক্ষক কেবল কুরআনের হরফ শেখান না, তিনি একটি শিশুর ঈমান, চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব গঠনের কারিগর।

যদি আপনার জ্ঞানচর্চা থেমে যায়, শিক্ষাদানের পদ্ধতি পুরোনো হয়ে পড়ে এবং নিজের উন্নতির চেষ্টা বন্ধ করে দেন, তাহলে আপনি শিক্ষার্থীদের যথাযথ হক আদায় করতে পারবেন না। তাই এমন শিক্ষক হওয়ার চেষ্টা করুন, যাকে তার ছাত্ররা সারাজীবন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

১. বন্ধু নয়, একজন আদর্শ পথপ্রদর্শক হোন

অনেক নতুন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের বন্ধু হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন, যাতে তারা জনপ্রিয় হতে পারেন। কিন্তু একজন শিশুর অনেক বন্ধু থাকে; তার প্রয়োজন একজন অভিভাবকসুলভ শিক্ষক ও আদর্শ নেতা।

এমন সম্পর্ক গড়ে তুলুন, যাতে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনে আপনার কাছে নিজের কষ্টের কথা বলতে পারে, আবার আপনার প্রতি সম্মান ও শৃঙ্খলাবোধও অটুট থাকে।

২. নিজের ভুল স্বীকার করতে শিখুন

কোনো শিশুই জন্মগতভাবে মেধাহীন নয়। প্রত্যেক শিক্ষার্থী আল্লাহর অমূল্য আমানত। অনেক সময় আমাদের শিক্ষাদানের দুর্বলতার কারণেই কোনো শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়ে।

মারধর ও কঠোর আচরণ পরিহার করুন। যে শিক্ষার্থী দুর্বল, তাকে আরও বেশি সময় দিন। নতুন পদ্ধতিতে শেখান, ভালোবাসা দিন, উৎসাহ দিন, প্রয়োজনে ছোট উপহার দিয়ে অনুপ্রাণিত করুন এবং তার জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করুন। ইনশাআল্লাহ, একদিন সেই শিক্ষার্থীই সবার আগে এগিয়ে যাবে।

৩. ক্লাসে যদি শিক্ষার্থীরা ঘুমিয়ে পড়ে, তবে আগে নিজেকে মূল্যায়ন করুন

যদি ক্লাসে শিশুরা হাই তোলে বা ঘুমিয়ে পড়ে, তাহলে আগে ভাবুন আপনার পাঠদান কি আকর্ষণীয়?

চিৎকার, ধমক বা মারধর দিয়ে নয়; হাসিমুখে, প্রাণবন্ত পরিবেশে ক্লাস শুরু করুন। সম্ভব হলে সুন্দর কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত করুন, অথবা একজন দক্ষ কারীর তিলাওয়াত শুনিয়ে পরিবেশ তৈরি করুন।

শিশুদের নিয়মিত দরূদ শরীফ পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। এতে তাদের মন সতেজ হবে এবং শেখার আগ্রহও বাড়বে।

৪. কম কথা বলুন, বেশি প্রভাব তৈরি করুন

অযথা চিৎকার করবেন না। অনেক সময় একটি নীরব, দৃঢ় দৃষ্টি শতবার চিৎকার করার চেয়েও বেশি কার্যকর হয়।

একজন বিচক্ষণ শিক্ষক নিজের ব্যক্তিত্ব দিয়েই শ্রেণিকক্ষে শৃঙ্খলা বজায় রাখেন।

৫. অহংকার নয়, মমতা দিয়ে শিশুদের বুঝুন

‘আমার সামনেই খেলছে!’,

‘ইচ্ছে করে পড়ছে না!’,

 ‘এত পড়েও পারে না!’,

‘বারবার ছুটি নিচ্ছে কেন?’

এসব প্রশ্নের উত্তর রাগ বা মারধরের মাধ্যমে কখনো পাওয়া যায় না।

একদিন শিশুটিকে কাছে ডাকুন। হাসিমুখে তার সঙ্গে কথা বলুন। তার জীবনের গল্প শুনুন। হয়তো জানতে পারবেন, সে দারিদ্র্য, পারিবারিক অশান্তি, মানসিক কষ্ট কিংবা অন্য কোনো কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করছে।

একজন শিক্ষকের কাজ শুধু ভুল ধরিয়ে দেওয়া নয়; বরং সেই ভুলের কারণ খুঁজে বের করে শিশুটিকে সঠিক পথে এগিয়ে নেওয়া।

মনে রাখবেন, কোমল চারাগাছকে যত্নে লালন করলে তবেই তা একদিন মহীরুহে পরিণত হয়। কঠোরতা দিয়ে তাকে ভেঙে ফেলবেন না; বরং ভালোবাসা, প্রজ্ঞা ও দোয়ার মাধ্যমে তাকে বেড়ে ওঠার সুযোগ দিন।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে আমানতের যথাযথ হক আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা, ঢাকা

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ