রবিবার, ২৪ মে ২০২৬ ।। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। ৭ জিলহজ ১৪৪৭


শরিয়তের দৃষ্টিতে কুরবানির সমাজপ্রথা


নিউজ ডেস্ক

নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

|| মাওলানা বুরহানুদ্দীন বিন সাদ ||

কুরবানি আল্লাহ তাআলার মহান একটি বিধান। কুরআন-সুন্নাহ ও ফুকাহায়ে কেরামের বক্তব্যে এর যাবতীয় নিয়ম ও বিধানাবলি বিধৃত হয়েছে। অন্যান্য বিধানের মতো শরিয়তের বাইরে গিয়ে কুরবানির ক্ষেত্রেও নতুন কোনো নিয়মের প্রচলন ঘটানোর মোটেও সুযোগ নেই। এটি সরাসরি শরিয়তের বিধানে হস্তক্ষেপের শামিল। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হল, আমাদের সমাজে কুরবানি-কেন্দ্রীক বিভিন্ন ধরনের ভুল আমল প্রচলিত আছে। তন্মধ্যে অন্যতম হল, কুরবানির গোশত-কেন্দ্রীক সমাজপ্রথা। এটি আমাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত রয়েছে। এর উদ্দেশ্য হল, দরিদ্র ও অসচ্ছল পরিবার, যারা কুরবানি করতে পারে না, কুরবানির দিন তাদের ঘরে ঘরে  কুরবানির গোশত পৌঁছিয়ে দেওয়া। বাহ্যত দৃষ্টিতে এটি একটি ভালো উদ্যোগ মনে হতে পারে। কিন্তু শরিয়তের দৃষ্টিতে এতে মৌলিক কিছু আপত্তির দিক রয়েছে। মনে রাখতে হবে, শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো কাজ বা উদ্যোগ ভালো হিসেবে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য কেবল নিয়তের বিশুদ্ধতাই যথেষ্ট নয়; বরং এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বিষয় হল, কাজটি শরিয়তসম্মত পন্থায় সম্পাদিত হওয়া।

প্রখ্যাত মুফাসসির ও মুহাদ্দিস হাফেজ ইবনে কাসির রহ. (মৃত: ৭৭৪হি.) বলেন—فكل عمل لا يكون خالصا وعلى الشريعة المرضية، فهو باطل.

‘প্রত্যেক ভালো কাজ, যা বিশুদ্ধ হবেনা ও শরীয়ত সমর্থিতপন্থায় সম্পাদিত হবেনা, তা বাতিল ও অগ্রহণযোগ্য।’-(তাফসিরে ইবনে কাসির ৬/১০৩)

মোটকথা, নিয়তের বিশুদ্ধতা ও শরিয়তসম্মত পন্থা; এ দু’য়ের মিশেলেই কোনো কাজ বা উদ্যোগ ভালো হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। এ দু’ শর্তের যেকোনো একটি ছুটে গেলে তা শরিয়তের দৃষ্টিতে ভালো হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে না।

নিম্নে উল্লিখিত সমাজপ্রথার আপত্তির দিকগুলো তুলে ধরা হল।

(ক) নিজের কুরবানির গোশত থেকে এক তৃতীয়াংশ বা কম-বেশি গরিবকে দেওয়া একটি মুস্তাহাব বিষয়; আবশ্যকীয় নয়। কুরবানিদাতারা চাইলে তা দিতে পারেন, আবার প্রয়োজন মনে করলে পুরোটাই নিজের জন্য রেখে দিতে পারেন। এটি তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু সমাজপ্রথার কারণে তার দান স্বতঃস্ফূর্ত হয়েছে কিনা—তা বুঝা কঠিন। অথচ স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি ছাড়া কারো সামান্য জিনিসও নেওয়া বৈধ নয়। হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—إِنَّهُ لَا يَحِلُّ مَالُ امْرِئٍ إِلَّا بِطِيبِ نَفْسٍ مِنْهُ

‘কোনো মুসলমানের সম্পদ তার স্বতঃস্ফূর্ত সন্তুষ্টি ব্যতীত হালাল নয়।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ২০৬৯৫)

(দ্রষ্টব্য: মুআত্তা মুহাম্মাদ, পৃ ৪২১; আহকামুল কুরআন, জাসসাস ৩/২৩৭; বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪; আল মুগনি, ইবনে কুদামা ১৩/৩৭৯; রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৭)

(খ) কুরবানিদাতা তার দানের অংশটি যে কাউকে দেওয়ার অধিকার রাখে। এ অধিকার শরিয়ত তাকে দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্নোক্ত প্রথার কারণে কুরবানিদাতা এ অধিকার হারায়। হয়তো সে তার নিকটাত্মীয় অথবা পরিচিত কাউকে একটু বেশি পরিমাণে দিত। কিন্তু এক্ষেত্রে তার জন্য এমনটি করার সুযোগ থাকে না।

(দ্রষ্টব্য; তাবয়িনুল হাকায়েক ৬/৪৮৬; আলবাহরুর রায়েক ৮/১৭৮)

(গ) অনেক মানুষ এমন আছেন, যারা যে কারো হাদিয়া বা সদকা গ্রহণ করতে চান না। আর শরিয়তও কাউকে যে কারো হাদিয়া বা সদকা গ্রহণ করতে বাধ্য করেনি। কিন্তু সামাজিক এই রীতির কারণে গোশতগ্রহণকারী প্রত্যেকেই অন্য সকলের হাদিয়া বা সদকা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। বলাবাহুল্য, এ ধরনের ঐচ্ছিক বিষয়ে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা শরীয়ত সমর্থন করে না।

(ঘ) এ-ধরনের বাধ্যবাধকতা আরোপের আরেকটি বড় ক্ষতির দিক হল, সমাজের কিছু মানুষ এমন থাকে, যাদের আয়-রোজগার হারাম পন্থায় হয়। সেক্ষেত্রে জেনে-বুঝে অন্যদের জন্য তাদের কুরবানির গোশত গ্রহণ করতে হয়। অথচ হারাম উপার্জনের মাধ্যমে কুরবানি করাই বৈধ নয় এবং জেনে-শুনে এ কুরবানিকৃত পশুর গোশত অন্যদের জন্য গ্রহণ করাও জায়েয নয়।

(দ্রষ্টব্য: সহিহ মুসলিম, হাদিস ১০১৫; জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম ১/২৫৯; আলমুলতাকাত, পৃ: ২৬৮; গামযু উয়ুনিল বাসায়ের ১/৩৪৫; আয-যখিরাতুল বুরহানিয়্যাহ ৭/৩৩০; আদ-দুররুল মুখতার ৬/৩৮৫)

(ঙ)মান্নতের কুরবানি ও মৃত ব্যক্তির অসিয়তের কুরবানির গোশতের একমাত্র হকদার হল জাকাত গ্রহণের উপযুক্ত গরিব-মিসকিন। প্রচলিত সমাজপ্রথায় যেহেতু কুরবানির একটি অংশ ধনি-গরিব সবার মাঝে বণ্টন করা হয় এবং কুরবানিদাতাও এর কিছু অংশ পায়, তাই সমাজপ্রথার বণ্টনের কারণে মান্নত ও অসিয়তের কুরবানির গোশত (যা শুধু গরিবদের দিতে হয়) স্বচ্ছল লোকদের ঘরেও পৌঁছে যায়। যা কোনোক্রমে জায়েজ নয়।

(দ্রষ্টব্য: মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হাদিস ১৩৩৬৫; মুখতারাতুন নাওয়াযিল ৩/২০১; আলমুহীতুর রাযাবি ৬/৬৩; খুলাসাতুল ফাতাওয়া ৪/৩২২; ফাতাওয়ায়ে বাযাযিয়া ৬/৩৯৫; তাবয়িনুল হাকায়েক ৬/৪৮৬; রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৬-৩২৭)

মোটকথা, প্রচলিত সমাজপ্রথায় শরিয়ত পরিপন্থী বহুমুখী সমস্যা রয়েছে। তাই এ পন্থা পরিহারযোগ্য। বরং শরিয়তের শিক্ষা মোতাবেক প্রত্যেককে তার কুরবানির অংশ দান করার বিষয়ে স্বাধীন রাখতে হবে। কুরবানিদাতা নিজ দায়িত্ব ও বিবেচনা মতো যাকে যে পরিমাণ হাদিয়া করতে চায় করবে। এবং গরিব-মিসকিনকে যে পরিমাণ সদকা করতে চায় করবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময় থেকে শত শত বছর যাবৎ এ নিয়মই চলমান আছে। সুতরাং সুন্নাহসম্মত নিয়মই অনুসরণ করা কর্তব্য। যা প্রয়োজন তা হল, প্রত্যেক কুরবানিদাতা তার পাড়া-প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনের প্রতি লক্ষ রাখবে। তাদেরকে নিজ কুরবানির হাদিয়া পৌঁছাবে। বিশেষত, আশপাশের যারা কুরবানি করতে পারেনি, তাদের বাড়িতে গোশতের হাদিয়া যথা সময়ে পৌঁছে দিবে। ইসলাম এসবের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছে।

লেখক: উস্তাযুল হাদিস ওয়াল ফিকহ, জামিয়া ইসলামিয়া দারুল ঈমান (বেগম মসজিদ কমপ্লেক্স) নতুন বাজার, সদর চাঁদপুর।

ফিকহ ও ইফতা, মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা।

জেডএম/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ