শনিবার, ২৩ মে ২০২৬ ।। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। ৬ জিলহজ ১৪৪৭


একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ধর্মীয় অভিভাবক ও নেতা দরকার

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

|| মুফতি এনায়েতুল্লাহ ||

পবিত্র কোরআন-হাদিসের যথাযথ ব্যাখ্যা, ধর্মীয় বিষয়াদি, ধর্মীয় বিধি-বিধান, ধর্মীয় মতাদর্শ, ধর্মীয় বিশ্বাস ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের বিষয়ে যে গভীর জ্ঞান রাখেন এবং যার মাধ্যমে ওই ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান, শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক নির্দেশনাবলী পরিচালিত হয়- তাকে ধর্মীয় নেতা বলে। সাধারণভাবে আমরা আলেম-উলামা কিংবা ইমাম-খতিব ও পীর-মাশায়েখদের বুঝি। সে অর্থে আমাদের দেশে একক কোনো ধর্মীয় নেতা নেই। যাকে এক কথায়, মুসলমানদের আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় অভিভাবক বলা যায়।

তবে আল্লামা আহমদ শফী (রহ.) ধর্মীয় নেতার অভাব কিছুটা পূরণ করেছিলেন। রাজপথের আন্দোলন সংগ্রাম, মুসলমাদের স্বার্থ রক্ষাসহ নানা বিষয়ে তিনি নেতৃত্ব দিয়ে জাতিকে ভারমুক্ত রেখেছিলেন। তার মৃত্যুর পর আর সে অর্থে একক কোনো নেতা তার জায়গা পূরণ করতে পারেননি। যদিও মুসলমানের ধর্মীয় জীবনের গতিপথ নির্ধারণ, দিক-নির্দেশনা প্রদান ও পথ নির্ণয়ে এমন নেতার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে বিভিন্ন মাদরাসার শিক্ষক, মুহতামিম, শায়খুল হাদিস, মসজিদের ইমাম-খতিব, খানকার পীর, ধর্মবিষয়ক লেখক এবং ধর্মীয় দল কিংবা সংগঠনের নেতারা এ দায়িত্ব আলাদা আলাদাভাবে পালন করে আসছেন।

দেশে ধর্মীয় বিধান লঙ্ঘনের মতো কোনো ঘটনা ঘটলে, ধর্ম অবমাননা হলে, ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের নিয়ে কটূক্তি করলে তারা প্রতিবাদ করেন। এর বাইরে ধর্মীয় কোনো বিষয়ে মতামত প্রদান, জনমত গঠন ও সমাজে শৃঙ্খলা রক্ষায় ভূমিকা রাখছেন। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে যৌথ নেতৃত্বের মাধ্যমে এ কাজ পরিচালিত হচ্ছে।

এ কথা বলতে দ্বিধা নেই, আলেম-উলামাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় সংগঠন, দল ইত্যাদি পরিচালনা করতে যেয়ে নানা অস্বস্তিকর ও জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। আন্দোলন-সংগ্রাম করতে হয়েছে রাজপথে। কিন্তু ফলাফল কিংবা দাবি আদায়ের ক্ষেত্রে সেভাবে সাফল্য আসেনি। উল্টো দমন-পীড়নের শিকার হতে হয়েছে, অনেককে অপদস্থ করা হয়েছে।

এই সময়টা যদি নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে হিসাব করি তাহলে ৩৫ বছরে আলেম-উলামাদের প্রাপ্তির হারের চেয়ে ত্যাগের পরিমাণ অনেক অনেক গুণ বেশি। দীর্ঘ এই সময়টাতে দলীয় ভাঙন, প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধ এবং নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব আমাদের দেখতে হয়েছে। যৌক্তিক অনেক ইস্যুতে আন্দোলন-সংগ্রাম করেও ফলাফল ঘরে তুলতে পারিনি। আনুগত্যের রাজনীতিতে আটকে পড়ে অনেক নেতা জনপ্রিয়তা হারিয়েছেন, নেতৃত্বের দৌড়ে অনেকের অবস্থান দুর্বল থেকে দুবর্লতর হয়েছে।

তবু সাধারণ মানুষ আলেম-উলামাদের নেতৃত্বে প্রতি বার বার আস্থা রেখেছেন, কিন্তু আমাদের নেতারা সেই আস্থার মূল্য দিতে পারেননি।

এ অবস্থায় একটি বড় প্রশ্ন সামনে চলে আসে। বর্তমান সময়ে ধর্মীয় নেতারা কি এই দায় কাঁধে নিয়েই এগোবেন? নাকি বিষয়টি নিয়ে তারা কার্যকর কিছু ভাববেন? আলেম-উলামাদের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা, কওমি মাদরাসার স্বকীয়তা অক্ষুণ্ন রাখাসহ নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বাঁচাতে কিছু না কিছু করতেই হবে।

বলতে দুঃখ হয়, আমাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য খুব স্থির নয়। রাজনীতিতে আমাদের অবস্থান বারবার বদলেছে। কড়া সমালোচক পরিণত হয়েছে বন্ধুতে, আবার রাজনৈতিক বন্ধু হয়েছেন শত্রু। অর্থাৎ আমাদের নেতাদের অবস্থান নাটকীয়ভাবে বদলেছে। যেটাকে ভোটার-সমর্থকরা সুযোগ বুঝে অবস্থান বদলানোর প্রবণতা বলে ধরে নিয়ে আমাদের নেতাদের একধরনের সুযোগসন্ধানী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

এ অবস্থায় আমাদের নেতৃবৃন্দ চাইলে, আন্তরিকভাবে ভাবলে নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠন করতে পারেন। তুলনামূলকভাবে স্থির ও সংযত হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে জাতিকে দিক-নির্দেশনা দিতে পারেন। এর জন্য প্রয়োজন সাহস, দূরদৃষ্টি এবং সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।

বাস্তবতা হলো, আওয়ামী লীগ সরকারের পতন, ইন্টেরিম আমল, নির্বাচন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময় আমাদের নেতারা খুব শক্তিশালী বা আত্মবিশ্বাসী নেতা হিসেবে প্রমাণিত হননি; বরং আলাদা আলাদাভাবে তাদেরকে অনেক সময় দুর্বল, অপরিণত, রাগান্বিত এবং সহজে প্রভাবিত হওয়া ব্যক্তি হিসেবেই দেখা গেছে। আর সমন্বয়হীনতার জন্যই এটা ঘটেছে। এ অবস্থা বেশিদিন চলতে পারে না।

নির্বাচন পরবর্তী ইসলামি নেতাদের অবস্থানকে আরও জটিল করে তুলেছে। নির্বাচনে জয়-পরাজয়, জোট গঠনে অনৈক্য, ধর্মীয় রাজনীতির জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি ও বিরোধী দলীয় জোটের সঙ্গে থাকা ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলো কেমন যেনো সৌজন্যের রাজনীতিও ভুলে গেছে। এটাও একটি বড় ব্যর্থতা। এ অবস্থা আমাদের আরও দুর্বল করে দিচ্ছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশলগত অবস্থান নিয়ে আমার কোনো অভিযোগ নেই, আমি নিজেদের মধ্যকার সম্পর্ক উন্নয়নে বিশ্বাসী। সেই সঙ্গে মনে করি, এর কোনো বিকল্প নেই। নিজেদের মধ্যকার অবিশ্বাস, কাঁদা ছোড়াছুড়ি, খোঁচাখুচি, অবজ্ঞাসূচক সম্বোধন ও নিজেদের সিদ্ধান্তই সঠিক-যথার্থ এবং সে বা তারা ভুল এটা প্রমাণের মানসিকতা এখন এমন জায়গায় দাঁড়িয়েছে, যেখানে আমাদের সব দলের নেতারা ক্রমেই রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সংকটে ডুবে যাচ্ছেন। জনমতের ঢেউ তার বিরুদ্ধে উঠছে। অনেকে তো আমাদের মানসিক স্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। সাধারণ মানুষের চোখে আমাদের আচরণ অস্থির ও বিচক্ষণতাহীন বলে মনে হচ্ছে। এটা রাজনীতিতে চরম সংকটের ইঙ্গিতবাহী।

এ অবস্থায় কোনো নেতা চাইলে নিজের অবস্থান পুনর্গঠন করতে পারেন। তিনি নিজেকে আল্লামা শফি (রহ.)-এর মতো ধর্মীয় নেতার উত্তরসূরি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। এ জন্য প্রয়োজন সাহস, দূরদৃষ্টি এবং সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।

সামনে অনেক সময় রয়েছে। যেকোনো নেতা চাইলে নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারেন। নেতৃত্বসুলভ আচরণ, সংযম এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মনোভাব এবং জনগণের মূল্যবোধ ও ইচ্ছার প্রতি দায়বদ্ধতার মতো গুণগুলো অর্জন করতে পারলে- ভবিষ্যতে তাদের জন্য সুযোগ তৈরি হতে পারে। আমরা এমন নেতার, এমন অভিভাবকের অপেক্ষায়।

লেখক: সিনিয়র আলেম সাংবাদিক ও বিশ্লেষক

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ