|| মুফতি হাসান সানী (রাসেল) ||
মোবাইল একটি ছোট্ট ডিভাইস। আকারে ছোট হলেও এর উপকার যেমন অনেক, তেমনি এর ক্ষতিও ভয়ঙ্কর। অজান্তেই এই ডিভাইসের মাধ্যমে মানুষ শত-সহস্র গুনাহে জড়িয়ে পড়ে, অথচ সেগুলোকে অনেক সময় গুনাহ বলেও মনে করা হয় না। আমরা মানুষ হিসেবে ভালো কাজের চেয়ে মন্দ কাজের দিকেই দ্রুত ঝুঁকে পড়ি, আর নিজেকে পাপের পথে ঠেলে দিতেও দ্বিধা করি না। অথচ নেক কাজগুলোকে কঠিন মনে করি।
এই ছোট্ট ডিভাইসটি মানুষকে চিন্তাহীনভাবে মূল্যবান সময় গুনাহে নিমজ্জিত রাখে। জীবনের অমূল্য সময়কে কালো অধ্যায়ে পরিণত করে। অথচ মানুষ জানেই না তার জীবনের সময় কত মূল্যবান।
সময়ের গুরুত্ব বোঝাতে আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন,
وَالْعَصْرِ ★ إِنَّ الْإِنسَانَ لَفِي خُسْرٍ
অর্থ: সময়ের কসম! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। (সুরা আসর: ১-২)
এই আয়াত থেকেই বোঝা যায় সময় কত মূল্যবান। অথচ আজ শিশু থেকে যুবক, যুবক থেকে মধ্যবয়স্ক– সবাই মোবাইলের কাছে বন্দি। মোবাইল স্ক্রিনের ঝলমলে আলো যেন গোটা সমাজকে গ্রাস করেছে। সেখানে বৃদ্ধরাও বাদ নেই; তারাও আজ আনন্দ খুঁজে ফিরছেন মোবাইলের পর্দায়।
মোবাইলের প্রথম থাবা—সময় নষ্ট:
মোবাইল আমাদের মূল্যবান সময় নষ্ট করে দেয়। ধরুন, ফজরের পর থেকে দুপুর পর্যন্ত প্রায় ৫-৬ ঘণ্টা সময়। মোবাইল না থাকলে এই সময়টুকু মানুষ নানা কাজে ব্যয় করত– গল্প করা, কাজ করা, পরিবারের সাথে পরামর্শ করা, কিংবা অন্য কোনো উপকারী কাজে ব্যস্ত থাকত।
কিন্তু যখন হাতে মোবাইল থাকে, তখন চিত্রটা বদলে যায়। জীবন ধ্বংসকারী রিলস, ভিডিও কিংবা অনর্থক স্ক্রলিংয়ে সময় কেটে যায়। মানুষ একটার পর একটা দেখে। ভাবে, ‘এটা দেখেই শেষ’। এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে যায়, কিন্তু হুঁশ ফিরে না। অথচ আল্লাহ তাআলা আমাদের অনর্থক কাজের জন্য সৃষ্টি করেননি। তিনি বলেন,
أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَاكُمْ عَبَثًا
অর্থ: তোমরা কি মনে করেছ, আমি তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি? (সুরা মুমিনূন: ১১৫)
মোবাইলের দ্বিতীয় থাবা—ছাত্রজীবন ধ্বংস:
একজন ছাত্র বা ছাত্রীর হাতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে মোবাইল তুলে দেওয়া মানে তার জীবনকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া। শয়তান এই ডিভাইসের মাধ্যমে তরুণদের মন-মস্তিষ্ককে অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, গান-বাজনা ও অনর্থক বিনোদনে ডুবিয়ে দেয়। আজ কমবয়সী ছেলে-মেয়েদের বড় অংশ এসব বিষয়ে আসক্ত হয়ে পড়ছে।
নোট আদান-প্রদান, অনলাইন ক্লাস কিংবা পড়াশোনার অজুহাতে আমরা নিজেরাই সন্তানদের হাতে মোবাইল তুলে দিচ্ছি। মনে করছি এটি তাদের উন্নতির মাধ্যম। অথচ অনেক সময় সেই মোবাইলই ভদ্র সন্তানকে অবাধ্য করে তোলে। মা-বাবাকে অসম্মান করা, দায়িত্বহীনতা ও চরিত্রহীনতা বেড়ে যায়। অধিকাংশ তরুণ-তরুণী ফোনের স্ক্রিনে অশ্লীল দৃশ্য দেখে সময় কাটায়। অথচ আল্লাহ তাআলা দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,
قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ
অর্থ: মুমিন পুরুষদের বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটা তাদের জন্য অধিক পবিত্র। (সুরা নূর: ৩০)
আর নারীদের সম্পর্কে তিনি বলেন,
وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ
অর্থ: মুমিন নারীদেরও বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। (সুরা নুর: ৩১)
আজকের যুবসমাজ আল্লাহর এই নির্দেশনা থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। ফলে সকাল দুপুরে গড়ায়, আর সভ্য জীবন অসভ্যতার দিকে চলে যায়। একসময় শুধু অশ্লীলতা দেখাতেই নয়, বরং ভিউ ও টাকার লোভে নিজেরাও অশ্লীলতায় জড়িয়ে পড়ে। অথচ তারা জানে না, চোখ, কান, অন্তর—সবকিছুকেই জিজ্ঞাসা করা হবে। আল্লাহ বলেন,
إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَٰئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا
অর্থ: নিশ্চয়ই কান, চোখ ও অন্তর—এদের প্রত্যেকটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।
(সুরা বনি ইসরাইল: ৩৬)
মোবাইলের তৃতীয় থাবা—অনলাইন জুয়া:
আজ মোবাইলের মাধ্যমে যুবসমাজ অনলাইন জুয়ায় জড়িয়ে পড়ছে। ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে লোভনীয় অফার ও বিজ্ঞাপন তাদের সামনে আসছে। এসবের ফাঁদে পড়ে গরিব বাবার স্বপ্নবাজ ছেলেও দ্রুত ধনী হওয়ার আশায় জুয়ায় অংশ নিচ্ছে।
কেউ অবৈধভাবে টাকা কামিয়ে ধনী হচ্ছে, বাড়ি-গাড়ি করছে। আবার কেউ সর্বস্ব হারিয়ে মাদকাসক্ত হচ্ছে। কেউ নতুন করে জুয়ার টাকা জোগাড় করতে মা-বাবা বা আত্মীয়দের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। কোথাও কোথাও এ নিয়ে মারামারি, হামলা, এমনকি হত্যার ঘটনাও ঘটছে।
আবার কেউ ঋণে ডুবে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। সেই ঋণের বোঝা বইতে হচ্ছে অসহায় বাবা-মাকে। আমরা সন্তানদের সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করি। অথচ আজ জুয়া খেলতে বাইরে যেতে হয় না; তার হাতের মোবাইলটাই তাকে বড় জুয়াড়ি বানাতে যথেষ্ট। আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে জুয়া নিষিদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
অর্থ: হে ঈমানদারগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদি এবং ভাগ্য নির্ধারণকারী তীরসমূহ শয়তানের অপবিত্র কাজ। সুতরাং তোমরা এগুলো থেকে বেঁচে থাক, যাতে তোমরা সফল হতে পারো। (সুরা মায়িদাহ: ৯০)
শেষ কথা:
মোবাইল হাতে থাকলেই যে তা দিয়ে গুনাহ করতে হবে- এমন কোনো কথা নেই। বরং এই ডিভাইসকে আমরা জ্ঞান অর্জন, দ্বীনি কাজ, হালাল উপার্জন, ভালো যোগাযোগ ও উপকারী কাজে ব্যবহার করতে পারি। মোবাইল আমাদের ধ্বংসের কারণও হতে পারে, আবার সফলতার মাধ্যমও হতে পারে। সিদ্ধান্ত শুধু আমাদের।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করার তাওফীক দান করুন। আমিন।
লেখক: প্রবন্ধকার, শিক্ষক, ইমাম ও খতিব
আইও/