সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬ ।। ১৬ চৈত্র ১৪৩২ ।। ১১ শাওয়াল ১৪৪৭

শিরোনাম :

ভালো থাকিস বন্ধু ‎প্রাণের সিকান্দার!

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

|| ‎মিযানুর রহমান জামীল ||

‎এভাবে আড়াল হয়ে যাবি কখনও জানতাম না। জানলে হয়তো তোর অভিমান ভাঙার সুযোগ পেতাম; কারণ তুই বড্ড অভিমানী! সেদিন তোর ফোন রিসিভ করিনি কেন— তার শোক আমাকে এখনও বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। তোর সাথে যতটুকু বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল, তারচে বেশি কলম ও কলবের সম্পর্ক ছিল। মজা করে বলতি, তোর লেখায় আমি আলাদা একটা চরিত্র। আজ তোকে খুব জানাতে ইচ্ছে করছে, তুই আমার লেখায়ও এখন বিশেষ চরিত্র। ‎

‎জানতাম তুই অভাবের মধ্যেও স্বাভাবিক দিন পার করতি। আমার মতো অভাবিটাও যখন তোর সাথে একাকার হতো তখন যেন তোর কোনো অভাবই থাকতো না। সাহিত্যের পিপাসায় মাতাল হয়ে এতটাই কলমের কাছে আসলি যে, নিজের ঘর-ভিটাও দাঁড় করাতে পারলি না। কেন রে? এমন ত্যাগী বন্ধু যদি কারও জীবনে আসে তার জীবন তো সার্থক।

‎‎বন্ধু সিকান্দার!

‎অভিমানি মন নিয়ে বাচ্চাগুলোকে রেখে চলে গেলি, ওদের পরিপূর্ণ বুঝ হওয়ার বিলম্বটাও করলি না। তারপরও তুই অসফল না। তুই তো মরে বেঁচে গেলি আর আমি বেঁচে থেকেও যেন মৃত রয়ে গেলাম। তোর ঘরনিকে তুই সাহসী করে গড়ে তুলেছিস। তোর জীবন সংসারের চেয়ে বেশি সাজিয়েছিস পরের অগোছালো জীবন। এ জন্যই তো মোম পরকে আলো দিয়ে নিজকে বিলায়। তোর ছোট্ট মা-টার মুখের মলিন দৃশ্য তোকে হারিয়ে ফেলার স্মৃতি আমার মন থেকে সহজে ভুলাতে পারবে না।

‎বাংলাদেশ ইসলামি লেখক ফোরাম তোকে সারা জীবন মনে রাখবে। আমাদের নির্বাহী পরিষদ-সহ সকল সদস্য তোর চলে যাওয়ায় ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে দোয়া করেছে আল্লাহর কাছে। ফেনী সাহিত্য ফোরাম তোকে হারায়নি; হারিয়েছে একজন যোগ্য কর্মঠ ও সচেতন লেখক সিকান্দারকে। তোর হাতে গড়া মারকাযুল ইসলাহ মহিলা মাদরাসার সেই তারাঝলমল রাতের কথা সারা জীবন মনে থাকবে। তুই কোথাও আজ নেই— অথচ আসন পাতলি সবার হৃদয়ে।‎

‎প্লিজ সিকান্দার!

‎বলতে খুব ইচ্ছে করছে— একটু আয় না! আওয়ার ইসলাম সম্পাদকসহ উস্তাদ বাবর সাহেব ও মুনীর ভাইয়ের অফিসের ধোঁয়া উঠা চায়ের আড্ডায় আবার মিলিত হই। মুফতি এনায়েতুল্লাহ ও মাসউদুল কাদির ভাইসহ ফোরামের সিনিয়র জুনিয়র দায়িত্বশীলরা তোকে তো বিদায় দেয়নি রে। তুই নিজেই অঘোষিত বিদায় নিয়ে চলে গেলি। দারুর রাশাদের দোতলায় উস্তাদ মাওলানা লিয়াকত আলী সাহেবের সামনে তোর বসে থাকার দৃশ্যটা আমার থেকে কেউ কেড়ে নিয়ে যেতে পারবে না।‎

‎তোর সাথে ঘুরতে বের হওয়া পল্টন, হাতিরঝিল এখনও আছে অথচ তুইটা নেই। সাহিত্য আড্ডায় মাতিয়ে ওঠা বাংলা একাডেমি আমাদের অনেক কিছুই দিতে পারবে কিন্তু তোকে এনে দিতে পারবে না। মুনীরুল ইসলাম আর জালাল খান ইউসুফির কাব্যকথায় তোকে ছাড়া এখন সন্ধ্যা নামবে। মালেক মাহমুদ, সুমন রায়হান ও সাহেদ বিপ্লবদের আড্ডাগুলো তোকে ছাড়াই চলতে থাকবে। বাশিকপে অনুষ্ঠিত ফুলকুঁড়ির ছোট্ট আসরে তোর স্মৃতিময় বসার আসনটিতে এখন অন্য কেউ বসবে।‎

‎প্রিয় সিকান্দার!

‎কাদের বাবু, শামস আরেফিনদের সাথে মধুর বাকবিনিময় হবে না আর কোনোদিন। অন্যধারা শব্দবাড়ি তথা রনো বা শাওন আসগরদের কবিতা পাঠের আসরে তোকে দেখলে মনে হত তুই পৃথিবীর সবচে সুখী মানুষ; অথচ তোর ভেতরে ছিল ব্যক্তি গড়ার তীব্র যন্ত্রণা। হয়তো এ কারণে তোর আখেরাতের সফরের ইবতেদা হলো। মৃত্যুর পর কবর প্রথম অন্ধকার মনযিল। তোর সৎকাজের বদৌলতে সেই মনযিল উদ্ভাসিত হয়ে ওঠবে ইনশাআল্লাহ।‎

‎কখনও কিছু করতে চাইলে ফোন দিয়ে আগে বলে ফেলতি, তারপর জোর করে মতামত নিয়ে জিজ্ঞেস করতি— "মুনীর ভাই এভাবে বলছে, এভাবে কাজটা করলে কেমন হয়?" তখন বুঝতাম না আমাদের প্রতি তোর এতোটা আত্মবিশ্বাসের কথা। খুব তাড়াতাড়ি চলে গিয়ে তুই তোর কাছে ঋণি করে গেলি আমাদের।

‎"জীবন ধর্মের অমোঘ রীতি

‎মধুকর উড়ে যায় পুষ্প থাকে বনে স্থিতি।"

‎তোর লেখা সেদিনের এ কথা এখনও হৃদয়কে নাড়া দিয়ে যায়। তবে আজ তোকে লেখা আমার প্রতিটি শব্দ অশ্রুর একেকটা ফোটা মাত্র। এগুলো কেবল নীরবে ঝরে পড়ে আবার শুকিয়ে যায়। কেউ দেখে না, শোনেও না।‎

‎যেদিন অনন্তে পথে সফর শুরু করলি তুই, সেদিন আমার ও আমাদের ভেতরটা ভেঙে যাচ্ছিল। তুই এমন এক দিনে বিদায় নিলি, সবার আনন্দটাই বিস্বাদ হয়ে গেল। নিজের দীর্ঘ অসুস্থতা আর শারীরিক যন্ত্রণার কারণে তোর যানাজায়ও উপস্থিত হতে পারিনি আমি। চিৎকার দিয়ে আজ খুব বলতে ইচ্ছে করছে— হে আল্লাহ এমন হাজারও সিকান্দার তুমি ঘরে ঘরে তৈরি করে দাও। ভালো থাকিস রে বন্ধু। তোর জন্য কিছুই করতে পারলাম না। দোয়া করি তুই সেখানে ভালো থাকিস।‎

‎[‎হাসপাতালের বিছানা থেকে, ‎৩০. ০৩. ২০২৬ সোমবার]

লেখক: সহসাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ ইসলামি লেখক ফোরাম

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ