|| মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক ||
জাকাত ইসলামের পঞ্চ বুনিয়াদের একটি। আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সম্পূর্ণ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে গরিবের হাতে অর্পণেয় একটি আর্থিক এবাদত। হাদিসের ভাষ্যমতে,
تؤخذ من اغنيائهم وترد الى فقرائهم
তাদের ধনীদের কাছ থেকে উসুল করে তাদেরই দরিদ্রদের নিকট অর্পণ করা হবে।
ইসলামি শরিয়তে জাকাতের খাত সুনির্ধারিত। খাতের বাহিরে জাকাত আদায় করলে তা গ্রহণযোগ্য হয় না। খাত মোতাবেক জাকাত ব্যয় হবে কি না তা যদি অনিশ্চিত হয়, তাহলে এমন প্রতিষ্ঠানে জাকাত দেওয়া বৈধ নয়।
খেলাফত ও মামলাকাতে আদেলার জামানায় ইসলামি শরিয়ত অনুসরণের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিশীল রাষ্ট্র কাঠামো যখন বিদ্যমান ছিল, তখন ধনীদের (الاموال الظاهره) প্রদর্শিত জাকাতযোগ্য সম্পদের জাকাত সরকারিভাবে উসুল করা হতো এবং শরীয়ত নির্দেশিত খাতে ব্যয় হতো। আর (الاموال الباطنه) অপদর্শিত অর্থের জাকাত তখনও ব্যক্তি নিজেই আদায় করতো।
পরবর্তীতে মুসলমানদের বহু দেশে শরিয়ত অনুসরণের বিষয়ে যত্নহীন রাষ্ট্র কাঠামো চলে আসে। তাই সাধারণ দ্বীনদার মানুষ রাষ্ট্রের মধ্যস্থতা পরিহার করে (الاموال الظاهره) প্রদর্শিত অর্থের জাকাতও সরাসরি গরিবের হাতে তুলে দিতে শুরু করে।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সরকারি মধ্যস্থতা পরিহার করে সরাসরি জাকাত আদায়ের মাধ্যমে ধনী গরিবের মাঝে এক প্রকার কৃতজ্ঞতার বন্ধন ও সুসম্পর্ক তৈরি হয়। দীর্ঘদিনের চর্চার ফলে আমাদের উপমহাদেশীয় অঞ্চলে এই সংস্কৃতি বর্তমানে সামাজিক সৌন্দর্য ও বাস্তবতার অংশ হয়ে গিয়েছে।
এমতাবস্থায় যে সমস্ত রাষ্ট্রে কাঠামোগত দুর্নীতি ও খেয়ানত ব্যাপক, সরকারি উন্নয়ন প্রজেক্ট যেখানে লুটতরাজের কারণে মুখ থুবড়ে পড়ে, ভূমি অধিগ্রহণের টাকা পেতে যে দেশে গলদঘর্ম হতে হয়, পেনশনের টাকা উত্তোলন করতে যেখানে পার্সেন্টেজ গুনতে হয়, সেই দেশে জাকাতের মত একটি পবিত্র আর্থিক ইবাদত সরকারের হাতে তুলে দেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ!
মুসলমানদের দেশে ইসলামি হুকুমত নেই, শরিয়ত অনুসরণের উল্লেখযোগ্য কোনো বালাই নেই, যে দেশে রন্ধ্রে রন্ধ্রে অসাধু লোকজনের দৌরাত্ম পৌঁছে গিয়েছে, সেই দেশে জাকাত কেন্দ্রিক দুর্নীতি ও অপরাধের নতুন দরজা খোলা কোন মতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। গরিব বঞ্চনার নতুন রাস্তা খোলা কিছুতেই কাম্য হতে পারে না।
বিশেষত সরকার যখন জাকাত উসুল করবে, তখন রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন কর ট্যাক্স ইত্যাদির সাথে জাকাত সমান্তরাল হয়ে যাবে। এর ফলে জাকাতের ধর্মীয় গুরুত্ব ও পবিত্রতা ক্ষুন্ন হবে। এটা আমরা হতে দিতে পারি না।
এবারের ধর্মমন্ত্রী ভালো, প্রধানমন্ত্রী ভালো, এগুলো ওয়ান টাইম ব্যাপার। এর ওপর ভিত্তি করে যেভাবে আমরা সম্পূর্ণভাবে ধর্মীয় শিক্ষাকে সরকারিকরণের বিরোধী, রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত পরিবর্তনের আগে জাকাতব্যবস্থাকেও সরকারিকরণের বিরোধী। আমরা এই বিষয়ে আরও আলোচনা পর্যালোচনা জোর দাবি জানাই।
লেখক: সভাপতি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ