বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ।। ১৩ ফাল্গুন ১৪৩২ ।। ৯ রমজান ১৪৪৭


জাকাত ফান্ড নিয়ে কওমি মাদরাসার বিরুদ্ধে অপপ্রচার কেন?

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

||বিশেষ প্রতিনিধি||

একটি কথিত ইসলামি দলের কিছুসংখ্যক কর্মী হঠাৎ করেই দেশের কওমি মাদরাসাগুলোর বিরুদ্ধে বিষোদগার শুরু করে দিয়েছেন। কওমি মাদরাসায় জাকাত না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে যাচ্ছেন অনবরত। সামাজিক যোগাযোগামাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে ব্যাপক চর্চা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন দেখা দিয়েছে- হঠাৎ করে চিহ্নিত গোষ্ঠীটি জাকাত ফান্ড নিয়ে কওমি মাদরাসাগুলোর বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু করে দিলো কেন? এর দ্বারা তাদের মূল টার্গেট কী? 

দেশের হাজার হাজার কওমি মাদরাসা চলে জনগণের সরাসরি আর্থিক অনুদানে। জনগণ তাদের সাধারণ দান থেকে শুরু করে জাকাতসহ সব ধরনের দানই কওমি মাদরাসায় করে থাকে। বিশেষ করে পবিত্র রমজানে আমাদের দেশে বিত্তশালীরা সাধারণত জাকাত আদায় করে থাকেন। তাদের জাকাতের একটি বড় অংশ কওমি মাদরাসাগুলোতে যায়। এটা বহু বছর ধরে চলে আসছে। যারা কওমি মাদরাসাগুলোর অস্তিত্ব সহ্য করতে পারে না এমন একটি চক্র অনেক দিন ধরেই জনসাধারণকে কওমি মাদরাসাবিমুখ করার অপচেষ্টা চালিয়ে আসছে। তাদের সেই অপপ্রয়াসেরই ধারাবাহিকতা এবার সংঘবদ্ধভাবে কওমি মাদরাসার বিরুদ্ধে লেগে যাওয়া।

এবারের রমজানের শুরু থেকেই ইসলামি নামধারী একটি দলের কিছু আলেম নামধারী কর্মী কওমি মাদরাসার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। কওমি মাদরাসায় কোনো পড়াশোনা হয় না, এখানে ধান্দাবাজি চলে, জনগণের পয়সার সঠিক হিসাব-নিকাশ রাখা হয় না- এমন নানা অজুহাত দেখিয়ে জনসাধারণকে কওমি মাদরাসাগুলোতে জাকাত না দেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। মজার ব্যাপার হলো, যারা এই আহ্বান জানাচ্ছেন, তাদের কেউ কেউ কওমি মাদরাসায় পড়াশোনা করেছেন। কওমি মাদরাসার জাকাত ফান্ড থেকে সহায়তাও নিয়েছেন। তারাই এবার একটি দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নে কওমি মাদরাসার বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছেন। 

মূলত ওই দলটি কখনোই কওমি মাদরাসা বিকাশ মেনে নিতে পারেনি। তারা যখনই সুযোগ পেয়েছে কওমি মাদরাসাকে গলাচেপে ধরার চেষ্টা করেছে। এমনকি তারা যখন ক্ষমতার ভাগিদার ছিল তখন কওমি মাদরাসা যেন সরকারি স্বীকৃতি না পায় তার জন্য যত ধরনের চেষ্টা সবই করেছে। এবারের নির্বাচনের আগে অবশ্য তারা কওমি মাদরাসার কাছাকাছি আসার চেষ্টা করেছে। কওমির একটি বড় অংশকে নিজেদের সঙ্গেও পেয়েছিল। এজন্য নিজেদের ইশতেহারে কওমি মাদরাসার উন্নয়নে কাজ করার ঘোষণাও দিয়েছিল। তবে নির্বাচন যেতে না যেতেই প্রকাশ পাচ্ছে তাদের পুরনো চরিত্র। তাদের কিছু কর্মী কওমি মাদরাসার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে নেমে পড়েছেন। এতেই অনুমান করা যায়, এই চক্রটি কওমির বড় শত্রু। 

কওমি মাদরাসার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করা হচ্ছে এর কি আদৌ কোনো সত্যতা আছে? কওমি মাদরাসায় পড়াশোনা হয় না-এটা তার শত্রুরাও বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে না। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক অধঃপতনের মধ্যেও কওমি মাদরাসা তাদের ঐতিহ্য অনেকটা ধরে রেখেছে। এখনো কওমি মাদরাসায় যথেষ্ট পড়াশোনা হয়। আবাসিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কওমি মাদরাসাগুলো শিক্ষার মানের পাশাপাশি ইসলামের মূল ধারাটি ধরে রাখার চেষ্টা করছে। যদিও আগের তুলনায় অনেকটা ঘাটতি এসেছে। তবে এটা সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে। 

অভিযোগ তোলা হয়েছে, কওমি মাদরাসাগুলোর জাকাত ফান্ড নিয়ে নয়ছয় হয়। এই অভিযোগেরও কোনো ভিত্তি নেই। দেশে হাজার হাজার কওমি মাদরাসা রয়েছে। দুই-চারটি এমন থাকতেই পারে, যাদের হিসাব-নিকাশে কিছুটা সমস্যা আছে। কিন্তু এর বাইরে হাজার হাজার প্রতিষ্ঠান এমন রয়েছে যাদের লেনদেন অত্যন্ত স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হয়। সিংহভাগ মাদরাসায় নিয়মিত অডিট হয়। প্রতিটি টাকা কোন খাত থেকে আসে এবং কোথায় ব্যয় হয় সেটার ডকুমেন্ট থাকে।

বড়জোড় জাকাত ফান্ডের টাকা হিলার মাধ্যমে অন্য ফান্ডে ব্যয় হতে পারে- এর বাইরে কোথাও নয়ছয়ের কোনো প্রমাণ কেউ দিতে পারবে না। সর্বোপরি প্রতিটি কওমি মাদরাসার সম্পর্ক স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে। স্থানীয়দের নিয়ে গঠিত কমিটিই মূলত মাদরাসাগুলো পরিচালনা করে। আয়-ব্যয়ের হিসাব মনিটরিং তারাই করে। এখানে ব্যক্তি-বিশেষের সুযোগ নেই মাদরাসার ফান্ডে নয়ছয় করার। কোনো মাদরাসা বা প্রতিষ্ঠান জনগণের অর্থ নিয়ে নয়ছয় করলে এর জন্য দেশের আইন-আদালত, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থা আছে। অবশ্যই তাদের উপযুক্ত শাস্তি হবে। কিন্তু হাজার হাজার মাদরাসার মধ্যে দুই-একজনের বিচ্যুতির কারণে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে দায়ী করা, তাদের চলার পথ রুদ্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। 

দেশের হাজার হাজার কওমি মাদরাসা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে জনগণের সরাসরি অনুদানে পরিচালিত হয়। এখানে পড়াশোনা করে লাখ লাখ শিক্ষার্থী। অন্যান্য শিক্ষাব্যবস্থার তুলনায় এখানে খরচ অনেক কম। সেটা মূলত জনগণের অনুদান থেকেই ভর্তুকি দেওয়া হয়। এই যে বেসরকারি ব্যবস্থাপনা এবং বিশাল কর্মযজ্ঞ কওমি মাদরাসা কর্তৃপক্ষ আঞ্জাম দিচ্ছে এর জন্য তাদের পুরস্কৃত করা উচিত। অথচ সুযোগ পেলেই একটি চক্র তাদের পথ আটকে দেওয়ার চেষ্টা করে।

সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হলো, যারা ইসলামের নামে রাজনীতি করেন, ইসলামের বিকাশ প্রত্যাশা করেন বলে দাবিদার, তারাই কওমি মাদরাসার জন্য বড় প্রতিবন্ধক। বারবার তারা সেটার প্রমাণ দিয়েছেন। মুখে যতই কওমি মাদরাসা দরসি সাজার চেষ্টা করুক, তারা যে কওমি মাদরাসার শত্রু সেটা এখন দিবালোকের মতো পরিষ্কার। জাতির সামনে তাদের কওমির শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করাই এখন সময়ের দাবি।

 এমএম/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ