||মাসউদুল কাদির||
অনেকে কওমি মাদরাসা স্বীকৃতি চাননি। আমি তাদের দার্শনিক এ চিন্তার সঙ্গে দ্বিমত করছি না। প্রত্যেক মানুষের অধিকার আছে। বেঁচে থাকার অধিকার সবার আগে। তিনি কীভাবে বাঁচবেন, সেটা তিনি নিজেই নির্ধারণ করবেন। আমি একজন নগণ্য কওমি মাদরাসা শিক্ষার্থী। এখনও শিখবার চেষ্টা করছি।
আমরা একসময় কওমি শিক্ষাসনদের জন্য আন্দোলন করেছি। বেগম খালেদা জিয়া যখন কওমি মাদরাসার শিক্ষা সনদের মাস্টার্সের সমমান ঘোষণা করেছিলেন, তখন আমি জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়ায়। আনন্দে আমার চোখ ভিজে এসেছিল। একটা দোকানে রঙিন টেলিভিশনে এ ঘোষণা সরাসরি শুনতে গেলাম। তখনো আমি জেনারেল কোনো পরীক্ষা দিইনি।
দেশের বর্ষীয়ান আলেম শাইখুল হাদিস আজিজুল হক রহ. সনদের স্বীকৃতি পেতে রাজধানীর মুক্তাঙ্গনে অনশন করলেন। এর আগে আমরা যুগান্তরে স্বীকৃতি পাওয়ার আকুতি লিখেছি। এর জন্য মরহুম আহমদ উলাহ ভাই অবশ্যই প্রতিদান পাবেন আল্লাহর কাছে। বড় ভাই মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসিন, শাকের হোসাইন শিবলি, মুফতি এনায়েতুল্লাহ, জহির উদ্দিন বাবরও কওমি স্বীকৃতির জন্য লড়াই করেছেন। তাদের লড়াই ছিল কাগজে কলমে। জাতিকে উদ্বুদ্ধকরণে।
ঢাকার চৌধুরীপাড়া মাদরাসাও শিক্ষাসনদ আন্দোলনের বিষয়ে আলোচনায় থাকবে। কারণ, ইতিহাস এ মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকদের অবদান কিছুতেই অস্বীকার করতে পারবে না। এখানকার বন্ধু হুমায়ুন আইয়ুব, জিয়াউল আশরাফসহ অসংখ্য শিক্ষার্থী শিক্ষা সনদের স্বীকৃতি নিয়ে সরব ছিলেন।
একদিন অকস্মাৎ চৌধুরীপাড়া মাদরাসার দ্বীতিয় তলায় বন্ধু মোজাম্মিল বিন বশিরকে (মুজাম্মিলুল হক) পেলাম। তার সঙ্গে তরুণ আরো অনেকে। তারা প্রিয় উস্তাদ মুহাম্মদ ইসহাক ফরিদী রহ. এর সঙ্গে স্বীকৃতি বিষয়ে সাক্ষাৎ করতে এসেছেন। তারা সংহতি চান। বিষয়টি আমার খুব ভালো লেগেছিল। তখন স্বীকৃতি আন্দোলনে বন্ধু আবদুল মোমিনও যুক্ত ছিলেন।
আমি মনে করেছিলাম, বয়োবৃদ্ধ সেরেতাজ আলেম শাইখুল হাদিস আজিজুল হক রহ. শিক্ষাসনদের স্বীকৃতির জন্য অনশনে বসায় ভেবেছিলাম, ভিন্নপথে আর পরীক্ষা দিতে হবে না। কিন্তু তা হয়নি। কওমির বন্ধু নেই। মুলা দেখানোর লোক বেশি। বেগম জিয়ার ঘোষণাকে বাস্তবে রূপ দেয়ার সাহসী নেতার আর দেখা মেলেনি। হাসিনা সরকার সে সুযোগটা নিতে চেয়েছে। বেগম জিয়ার কাছ থেকে যারা সনদের স্বীকৃতি নিতে চেয়েছিলেন তারা পরে এসে অনেকেই আগ্রহ দেখাননি।
বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ মাওলানা আবদুল লতীফ নেজামী একদিন আমাকে বললেন, কওমির স্বার্থে সবাইকে এক থাকা দরকার। রাজনীতি আর শিক্ষা ঘুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।
মুন্সিয়ানা সেই চালে আমাদের কী হাল একটু ভাবলেই বুঝবেন। বেশি গবেষণার প্রয়োজন হবে না।
আমি ২০১৬ সালের দিকে বেশকিছু প্ল্যাকার্ড লিখেছিলাম। একটা ছিল, কওমির ২০ লাখ শিক্ষার্থীর ৪০ লাখ চোখ শিক্ষাসনদের স্বীকৃতির দিকে তাকিয়ে।
পরে প্রথম আলো এটার ওপর শিরোনাম করেছিল।
লাভের সরটা সবারই ভালে লাগে। শিক্ষা সনদের স্বীকৃতি কার্যকরে সবার আন্তরিক হওয়া উচিত। বর্তমান ধর্ম উপদেষ্টা আফম খালিদ হোসেন সঙ্গত কারণেই কওমিবান্ধব উদ্যোগ নিয়েছেন। আমি তার শুকরিয়া জানাই। ফসল ঘরে তুলতে না পারলে কোনো আন্দোলনের মূল্য নেই। সনদ কর্যকর হলে আমরা খুশি হবো। জাতি উপকৃত হবে। আমার কী হলো সেটা বিবেচ্য নয়। অনাগত সন্তানদের ভবিষ্যৎ সুন্দর হোক-সেটাই বড় প্রত্যাশা।
লেখক: প্রেসিডেন্ট, শীলন বাংলাদেশ, সম্পাদক, স্বাধীনতার বার্তা
এনএইচ/