আবদুল আহাদ সালমান
ইতিহাসের কিছু মাস কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টানোর নিয়মতান্ত্রিক বিবরণ নয়; বরং একটি অবদমিত জাতির আত্মপরিচয় ও ঘুরে দাঁড়ানোর মহাকাব্য। বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই মাসটি তেমনই এক অগ্নিগর্ভ, রক্তস্নাত অথচ গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। এটি ছিল একাধারে চরম শোক, অসীম সাহস, নজিরবিহীন আত্মত্যাগ এবং স্বৈরাচারবিরোধী গণজাগরণের এক অনন্য কোলাজ।
রাষ্ট্রীয় চাকরিতে কোটা সংস্কারের একটি সম্পূর্ণ অহিংস ও ন্যায্য দাবিকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল, তা শাসকের অন্ধ অহমিকা, দমন-পীড়ন এবং নিষ্ঠুরতার কারণে রূপ নেয় এক সর্বাত্মক গণঅভ্যুত্থানে। শত শত তরুণের তাজা রক্ত, হাজারো মানুষের পঙ্গুত্ব, অসংখ্য পরিবারের বুকফাটা আর্তনাদ এবং আমজনতার অদম্য প্রতিরোধ স্বৈরাচারের তখত-ই-তাউসকে ধূলিসাৎ করে দেয়।
এই আন্দোলন কেবল একটি রাজনৈতিক ক্ষমতার রদবদল ছিল না; এটি ছিল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সাম্যের এক ঐতিহাসিক পুনরুত্থান।
অহিংসার আঙিনা থেকে গণবিস্ফোরণ: স্বৈরাচারের নির্মমতার জবাব
২০২৪ সালের জুনের শেষভাগে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে শিক্ষার্থীরা যখন রাজপথে নেমেছিল, তখন তাদের চোখে ছিল মেধার যথাযথ মূল্যায়নের স্বপ্ন এবং একটি বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের আকাঙ্ক্ষা। রাষ্ট্রীয় চাকরিতে কোটার নামে চলে আসা পদ্ধতিগত অন্যায়ের সংস্কার ছিল সময়ের দাবি।
কিন্তু শাসকগোষ্ঠী এই তরুণদের কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে বেছে নেয় অহংকার ও সহিংসতার পথ। আন্দোলনকারীদের প্রতি অবমাননাকর ও উসকানিমূলক বক্তব্য, রাষ্ট্রীয় বাহিনী এবং দলীয় ক্যাডারদের লেলিয়ে দিয়ে ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে চালানো মধ্যযুগীয় বর্বরতা পুরো পরিস্থিতিকে অগ্নিগর্ভ করে তোলে। বুলেটের জবাবে শিক্ষার্থীরা যখন বুক পেতে দিতে শুরু করল, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়াল গলে এই ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ল প্রতিটি ঘরে। সাধারণ মানুষ আর ঘরে বসে থাকতে পারেনি; সন্তানের রক্তে রঞ্জিত রাজপথ দেখে তারা শামিল হয় ইতিহাসের বৃহত্তম নাগরিক স্রোতে।
রক্তাক্ত জুলাই: প্রতিরোধের প্রতীক ও ইতিহাসের নির্মমতা
জুলাইয়ের প্রতিটি দিন যেন একেকটি রক্তে লেখা মহাকাব্য। ইতিহাসের কাঠগড়ায় এই দিনগুলো শাসকের নির্মমতার সাক্ষী হয়ে থাকবে।
আবু সাঈদের মহাকাব্যিক প্রতিরোধ (১৬ জুলাই)
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে, বুক চিতিয়ে পুলিশের বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যটি বিশ্ববিবেককে নাড়া দিয়েছিল। সেই বুক লক্ষ্য করে ছোঁড়া বুলেট সাঈদকে নিথর করলেও, তাঁর ওই বীরত্বগাথা মুহূর্তেই হয়ে ওঠে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বৈশ্বিক আইকন।
মুগ্ধর মানবিকতা ও ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ (১৮ জুলাই)
আন্দোলন যখন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, তখন রাজধানীর উত্তরায় তৃষ্ণার্ত আন্দোলনকারীদের পানি ও বিস্কুট বিতরণ করতে গিয়ে বুলেটের আঘাতে লুটিয়ে পড়েন মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ।
মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তেও তাঁর উচ্চারিত সেই মানবিক আহ্বান আজও প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে বেদনাবিধুর প্রতিধ্বনি তোলে-
‘পানি লাগবে কারো, পানি?’
রাষ্ট্রীয় বর্বরতার চূড়ান্ত রূপ
ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট করে বিশ্ব থেকে দেশকে বিচ্ছিন্ন করা, কারফিউ জারি, হেলিকপ্টার থেকে গুলি এবং নিরীহ মানুষের ওপর নির্বিচার দমন-পীড়ন চালিয়েও গণজোয়ার রোধ করা যায়নি।
শ্রমিক, রিকশাচালক, সাংবাদিক, শিশু থেকে শুরু করে সাধারণ পথচারী, কেউ রেহাই পায়নি এই রাষ্ট্রীয় তাণ্ডব থেকে।
শোকের মহাসমুদ্র ও এক শতাব্দীর শূন্যতা
জুলাই গণঅভ্যুত্থান এ দেশকে দিয়ে গেছে এক বিশাল শোকের মহাসমুদ্র। যে মায়েরা তাদের কোল খালি করে সন্তান হারিয়েছেন, যে সন্তানরা বাবার লাশ কাঁধে নিয়েছে, তাদের এই ক্ষত কোনোদিন শুকানোর নয়।
বহু তরুণ আজীবনের জন্য দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন, কেউ হারিয়েছেন পা, কেউবা পঙ্গুত্ব বরণ করে হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছেন। সম্পাদকীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এটি কেবল সংখ্যার হিসাব নয়; এটি একটি প্রজন্মের স্বপ্নের অপমৃত্যু। একজন মেধাবী শিক্ষার্থী, একজন দিনমজুর বাবা কিংবা একটি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষের চলে যাওয়া মানে একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের চিরতরে নিভে যাওয়া।
তবে এই কান্না বৃথা যায়নি; এই যৌথ শোকই বাঙালি জাতিকে এক সুতোয় বেঁধেছিল।
শোক যখন অপরাজেয় শক্তি: এক অভূতপূর্ব জাতীয় ঐক্য
ইতিহাসের এক শাশ্বত শিক্ষা হলো, অন্যায়ের পারদ যত ওপরে ওঠে, মানুষের ভেতরের প্রতিরোধ ক্ষমতা তত তীব্র হয়। জুলাই আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে দলাদলি ও বিভেদ ভুলে শোককে অপরাজেয় শক্তিতে রূপান্তর করতে হয়।
এই অভ্যুত্থান ছিল প্রকৃত অর্থেই ‘জনতার’।
শিক্ষক যখন ছাত্রকে বাঁচাতে নিজের বুক পেতে দিয়েছেন, চিকিৎসক যখন দিনরাত এক করে আহতদের সেবা করেছেন, আইনজীবীরা যখন রাজপথে দাঁড়িয়েছেন, তখন স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল এই লড়াইয়ে স্বৈরাচারের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী।
রিকশাচালক নিজের দৈনিক আয় বিসর্জন দিয়ে আন্দোলনকারীদের পারাপার করেছেন। সাধারণ মানুষ ঘরের দরজা খুলে দিয়েছেন কাঁদানে গ্যাসে আক্রান্ত অচেনা তরুণদের জন্য।
একই সঙ্গে তরুণরা ঢাকার দেয়ালগুলোকে রূপান্তর করেছিল প্রতিবাদের ক্যানভাসে। গ্রাফিতি, কবিতা, র্যাপ গান এবং দ্রোহের শিল্পকলা স্বৈরাচারের বুলেটের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে আঘাত হেনেছিল শাসকের মনস্তাত্ত্বিক দুর্গে। এটি ছিল এক সামগ্রিক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক নবজাগরণ।
ইসলামের কষ্টিপাথরে জুলুম ও জালিমের অবধারিত পরিণতি
ইসলামের চিরন্তন দর্শন সামাজিক ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ইসলামে ‘জুলুম’ বা অত্যাচারকে সবচেয়ে বড় অপরাধ এবং সমাজ ধ্বংসের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কোনো স্বৈরাচারী বা অত্যাচারী শাসকই আল্লাহর ন্যায়বিচারের ঊর্ধ্বে নয়।
১. জুলুমের বিরুদ্ধে ঐশ্বরিক নিষেধাজ্ঞা
মহান আল্লাহ স্বয়ং নিজের জন্য জুলুমকে হারাম করেছেন এবং মানবসমাজকেও এ থেকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন।
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন-
আমি আমার নিজের ওপর জুলুম হারাম করেছি এবং তোমাদের জন্যও তা হারাম করেছি। অতএব তোমরা একে অপরের ওপর জুলুম করো না। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- তোমরা জুলুম থেকে বেঁচে থাকো। কারণ কিয়ামতের দিন জুলুম হবে ঘোর অন্ধকার। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৪৭)
২. মানুষের কর্মফল ও জালিমদের উত্থান-পতন
কুরআনের সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সমাজে যখন নৈতিক বিপর্যয় ঘটে এবং মানুষ অন্যায় দেখেও নীরব থাকে, তখন অনেক সময় আল্লাহ পরীক্ষা বা শাস্তি হিসেবে জালিমদের কর্তৃত্ব দেন।
আল্লাহ বলেন- এভাবেই আমি জালিমদের একে অপরের বন্ধু বানিয়ে দিই তাদের কৃতকর্মের কারণে। (সুরা আল-আনআম, ৬:১২৯)
তবে এই আয়াত কোনোভাবেই জুলুমকে মেনে নেওয়ার অজুহাত নয়; বরং এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার তাগিদ দেয়।
আল্লাহ আরও বলেন-তারা যখন উপদেশ ভুলে গেল, তখন যারা মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করত তাদের আমি রক্ষা করলাম এবং যারা সীমালঙ্ঘন করেছিল তাদের কঠিন শাস্তিতে পাকড়াও করলাম। (সুরা আল-আরাফ, ৭:১৬৫)
৩. আল্লাহর অবকাশ দেওয়ার নীতি: ‘ছাড় দেন, কিন্তু ছেড়ে দেন না।’
ইতিহাসে অনেক সময় মনে হতে পারে জালিমরা অপরাজেয় এবং তাদের ক্ষমতা চিরস্থায়ী। কিন্তু কুরআন আমাদের আশ্বস্ত করে যে এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে অবকাশ মাত্র।
আল্লাহ বলেন- আমি কত জনপদকে অবকাশ দিয়েছিলাম, অথচ তারা ছিল জালিম। অতঃপর আমি তাদের পাকড়াও করেছি। (সুরা আল-হাজ্জ, ২২:৪৮)
অন্যত্র এসেছে- যখন আমি জালিম জনপদগুলোকে পাকড়াও করি, তখন আমার পাকড়াও অত্যন্ত কঠিন। (সুরা হুদ, ১১:১০২)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিমকে অবকাশ দেন। কিন্তু যখন পাকড়াও করেন, তখন আর তাকে রেহাই দেন না।
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৬৮৬)
ফেরাউন, নমরুদ, আদ ও সামুদ জাতির পতন এই ধ্রুব সত্যেরই প্রমাণ যে, লৌহকপাট আর বুলেটের স্তূপ দিয়ে সাময়িক ক্ষমতার দাপট দেখানো গেলেও আল্লাহর পাকড়াও থেকে বাঁচার কোনো উপায় নেই।
৪. ক্ষমতার প্রকৃত মালিকানা ও জবাবদিহিতা
ইসলামের রাজনৈতিক দর্শনের মূল কথা হলো, সার্বভৌমত্ব ও ক্ষমতার একক মালিক আল্লাহ। মানুষ কেবল তাঁর আমানতদার।
সুরা আলে ইমরানের ২৬ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে-
হে আল্লাহ! রাজত্বের মালিক, আপনি যাকে ইচ্ছা রাজত্ব দান করেন এবং যার থেকে ইচ্ছা রাজত্ব কেড়ে নেন। আপনি যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করেন এবং যাকে ইচ্ছা অপমানিত করেন।
এই আয়াতটি শাসকের অহংকার চূর্ণ করার জন্য যথেষ্ট। ক্ষমতা যে কোনো সময় ছিনিয়ে নেওয়া হতে পারে এবং প্রতিটি রক্তের ফোঁটার হিসাব আল্লাহর আদালতে দিতে হবে, এই ভয় যার নেই, তার পতন অবধারিত।
জুলাইয়ের শিক্ষা ও আমাদের ভবিষ্যৎ করণীয়
জুলাই গণঅভ্যুত্থান কেবল একটি সরকারের পতন ঘটায়নি; বরং রাষ্ট্র সংস্কারের এক বিশাল দায়িত্ব আমাদের কাঁধে সঁপে দিয়েছে। এই আন্দোলনের মূল স্পিরিট ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার, যা ইসলামের মূল চেতনার সঙ্গেও সম্পূর্ণ সংগতিপূর্ণ। ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়, শুধু জালিম নয়, যারা জালিমকে তোষামোদ করে বা অন্যায়ের সহযোগী হয়, তারাও সমান অপরাধী।আল্লাহ বলেন- তোমরা জালিমদের প্রতি সামান্যও ঝুঁকো না; অন্যথায় জাহান্নামের আগুন তোমাদের স্পর্শ করবে। (সুরা হুদ, ১১:১১৩)
অতএব, বিগত ফ্যাসিবাদের দোসর এবং তাদের সুবিধাভোগীদের পুনর্বাসনের কোনো সুযোগ থাকতে পারে না। এখন আমাদের প্রধান কাজ হলো একটি সর্বগ্রাসী ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে কোনো নাগরিক তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে না, মেধার অবমূল্যায়ন হবে না এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে কেউ পার পাবে না।
শহীদদের রক্তে ভেজা এক নতুন দিগন্ত
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের বুকে এক নতুন ভোরের সূচনা করেছে। এই ভোর এনেছে তরুণ শহীদদের আত্মত্যাগ, আহতদের দীর্ঘশ্বাস এবং কোটি জনতার ইস্পাতকঠিন ঐক্য।
আবু সাঈদ, মুগ্ধদের মতো শত শত বীরের রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না। তাদের রক্তঋণের একমাত্র পরিশোধ হতে পারে একটি ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে।
ইতিহাস এবং ইসলাম, উভয়ই আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে সত্যের জয় এবং মিথ্যার পরাজয় সুনিশ্চিত। জুলাইয়ের বিপ্লব আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোনো জাতির সবচেয়ে বড় শক্তি তার অস্ত্র বা অর্থ নয়; বরং তার জনগণের নৈতিক সাহস, ঐক্য এবং ন্যায়ের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা।
আল্লাহ আমাদের এই নতুন স্বাধীনতা ও আত্মত্যাগকে কবুল করুন, শহীদদের শাহাদাতকে উচ্চ মাকাম দান করুন এবং আমাদের সমাজকে সব ধরনের জুলুম, স্বৈরাচার ও অবিচার থেকে চিরতরে মুক্ত রাখুন। আমিন।
লেখক: প্রেসিডেন্ট, পর্তুগাল বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (পিবিসিসিআই); সম্পাদক: ইউরোবাংলা
এমএন/