জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসকে ধারণ করে সরকার দেশের মানুষের প্রতি দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ড. মাহাদী আমিন। তিনি বলেন, সরকারের গত ছয় মাসের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো, নির্বাচনি ইশতেহারকে ধারণ করে প্রতিটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করা।
সোমবার (১৭ আগস্ট) বিকেলে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে সরকারের ১৮০ দিন পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. মাহাদী আমিন বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের আন্দোলন-সংগ্রাম, গুম, খুন, হামলা, মামলা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রকামী রাজনৈতিক দলগুলো বিএনপির নেতৃত্বে রাজপথে ছিল। এর ধারাবাহিকতায় জনগণের প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার ১৮০ দিন পার করেছে। এই সময়ে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার প্রতিফলন দেখা গেছে।
তিনি বলেন, ২০১৪ সালের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন, ২০১৮ সালের নির্বাচন এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর এবারই প্রথম জনগণ নিজেদের পছন্দের প্রার্থী ও দলকে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত এই সরকারের ক্ষমতার উৎস একমাত্র দেশের মানুষ।
মাহাদী আমিন বলেন, বর্তমান সরকারের প্রতি জনগণের আবেগ, অনুভূতি ও প্রত্যাশার প্রতিফলন বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি তারই বহিঃপ্রকাশ।
তিনি বলেন, নির্বাচনি প্রচারণা থেকে শুরু করে গত ছয় মাসে প্রধানমন্ত্রী দেশের বিভিন্ন স্থানে যেসব জনসম্পৃক্ত কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন, সেখানেও মানুষের ব্যাপক সাড়া ও ভালোবাসা পাওয়া গেছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, গণতন্ত্রকামী রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়েছে। সেই আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষা ছিল এমন একটি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত হবে।
উপদেষ্টা বলেন, গত ছয় মাসে সরকার বাকস্বাধীনতা, আইনের শাসন ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের সীমা অতিক্রম করা হলেও সরকার সর্বোচ্চ ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছে।
মাহাদী আমিন বলেন, সংসদ গঠনের পর প্রথম অধিবেশনেই শতাধিক অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তর করা হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে সন্ত্রাসবিরোধী সংশোধিত অধ্যাদেশও আইনে রূপান্তর করা হয়েছে।
তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশে শিক্ষার্থীদের সংসদে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মরণে সংসদের বিভিন্ন গ্যালারির নামকরণ করা হয়েছে।
সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, কৃষকদের জন্য ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ ঋণ দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্তদের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী এক লাখ টাকা পর্যন্ত সহায়তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
শিক্ষা খাতে সংস্কারের অংশ হিসেবে আগামী বছর থেকে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে নতুন দুটি করে বিষয় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই, শিক্ষার্থীদের স্কুলড্রেস ও ব্যাগ দেওয়ার কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রাথমিক গোল্ডকাপে ২২ লাখ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণের মাধ্যমে সারা দেশে একটি ক্রীড়া আন্দোলন তৈরি হয়েছে। ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ইনোভেশন আইডিয়া সোর্সিং প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। মেয়েদের স্নাতক পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে মিডডে মিল কার্যক্রম চালু করা হচ্ছে।
বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের জন্য তৃতীয় ভাষা শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, তৃতীয় ভাষায় দক্ষ শিক্ষার্থীদের বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যাংক গ্যারান্টির সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মাহাদী আমিন বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য নতুন পে-স্কেলের কাজ অনেকটাই চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, স্পোর্টস ভিলেজ প্রতিষ্ঠা, দেশজুড়ে খেলার মাঠ সংস্কারসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম তৈরি, উদ্ভাবনী উদ্যোগে সহায়তা, তরুণ ও নারীদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া এবং ফ্রিল্যান্সার কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, স্থানীয় শিল্প ও স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বিত ইকোসিস্টেম গড়ে তুলে প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে।
সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা তুলে ধরে মাহাদী আমিন বলেন, ভেঙে পড়া অর্থনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠনে প্রয়োজনীয় সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ বাড়িয়ে একটি জনবান্ধব বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। আমানতকারীদের সুরক্ষা, বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা সম্প্রসারণ এবং লাইসেন্স নবায়ন প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বন্ধ কলকারখানা চালুর জন্য পৃথক তহবিল গঠন করা হয়েছে। চিনিকল, পাটকলসহ ঐতিহ্যবাহী যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, সেগুলো পর্যায়ক্রমে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে শ্রম আইন বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিদেশে জনশক্তি রফতানির বাজার আরও সম্প্রসারণ ও বহুমুখীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে বাংলাদেশের দক্ষ জনশক্তির যোগসূত্র তৈরি করতে কাজ চলছে।
তিনি বলেন, কোন দেশে কী ধরনের দক্ষ জনশক্তির চাহিদা রয়েছে এবং বাংলাদেশের কোন খাতে কতটা দক্ষ জনশক্তি রয়েছে—তা সমন্বয় করে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, রুহুল কবির রিজভী, ইসমাইল জবিউল্লাহ, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হুমায়ূন কবির, জাহিদুল হাসান, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আইও/