শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ।। ২১ ভাদ্র ১৪৩৩ ।। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮


 মদিনায় নতুন সমাজ ও মসজিদে নববির প্রতিষ্ঠা

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

সন্ধ্যা নেমেছে। উঠোনে মৃদু বাতাস বইছে। নাতি-নাতনিরা আবারও দাদার চারপাশে গোল হয়ে বসেছে। একজন নাতি প্রশ্ন করল, দাদা, মদিনায় যাওয়ার পর নবীজি কী করলেন? তিনি কি তখন থেকেই যুদ্ধ শুরু করেছিলেন?

দাদা হেসে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, না দাদুভাই। একজন মহান নেতা জানতেন, শুধু মানুষ এক জায়গায় এসে জড়ো হলেই সমাজ গড়ে ওঠে না। আগে মানুষের হৃদয়কে এক করতে হয়, তারপর গড়ে তুলতে হয় সুন্দর সমাজ। আর এজন্যই মদিনায় পৌঁছেই রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এমন কিছু কাজ করলেন, যা পৃথিবীর ইতিহাসই বদলে দিল।

মদিনায় পৌঁছে সবাই খুব আনন্দিত ছিল। মুসলমানরা বহু কষ্টের পর এমন একটি শহরে এলেন, যেখানে তারা স্বাধীনভাবে আল্লাহর ইবাদত করতে পারবেন। নবীজি নিজের জন্য বড় কোনো ঘর বানানোর কথা ভাবলেন না। তিনি প্রথমেই ভাবলেন— আল্লাহর ঘর তৈরি করতে হবে।

একদিন তাঁর প্রিয় উটনি কাসওয়া ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে একটি খালি জায়গায় বসে পড়ল। নবীজি বললেন, "আল্লাহ এখানেই আমাদের থামাতে চেয়েছেন।"

জায়গাটি ছিল দুই এতিম বালক— সাহল ও সুহাইলের। তারা ভালোবেসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল! আপনি চাইলে এই জমি আমরা বিনা মূল্যে দিয়ে দেব।' কিন্তু নবীজি কারও হক বিনা মূল্যে নিতে চাইতেন না। ন্যায্য মূল্য দিয়ে তিনি জমিটি কিনে নিলেন।

তারপর শুরু হলো মসজিদ নির্মাণের কাজ। তোমরা কী ভাবছ, পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষটি কি শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নির্দেশ দিচ্ছিলেন? না। তিনি নিজেই কাঁধে ইট তুলছেন, মাটি বহন করছেন, সাহাবিদের সঙ্গে ঘাম ঝরাচ্ছেন। সাহাবিরাও আনন্দের সঙ্গে কাজ করছেন। কাজ করতে করতে তারা আল্লাহর প্রশংসা করছেন। সবার মুখে ছিল উৎসাহের হাসি।

কিছুদিনের মধ্যেই তৈরি হলো সেই পবিত্র মসজিদ— মসজিদে নববি। এই মসজিদ শুধু নামাজ পড়ার জায়গা ছিল না। এখানেই মানুষ কুরআন শিখত, ইসলামের শিক্ষা গ্রহণ করত, বিচার হতো, গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হতো, অসহায় মানুষের সাহায্য করা হতো এবং সমাজ পরিচালনার জন্য নানা সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো।

মসজিদের এক পাশে ছিল একটি ছায়াঘেরা স্থান, যার নাম ছিল সুফফা। সেখানে অনেক গরিব সাহাবি থাকতেন। তারা দিনরাত কুরআন শিখতেন, ইবাদত করতেন এবং জ্ঞান অর্জন করতেন। পরে তারাই ইসলামের শিক্ষা পৃথিবীর নানা প্রান্তে পৌঁছে দেন।

এবার দাদা একটু থেমে বললেন, জানো, মদিনায় এসে সবচেয়ে সুন্দর যে কাজটি নবীজি করেছিলেন তা কি ছিল? তা ছিল মানুষের হৃদয়কে এক করে দেওয়া। মক্কা থেকে যারা সবকিছু ছেড়ে এসেছিলেন, তাদের বলা হতো মুহাজির। আর মদিনার মুসলমানদের বলা হতো আনসার। নবীজি এক একজন মুহাজিরের সঙ্গে এক একজন আনসারকে ভাই বানিয়ে দিলেন।

কী আশ্চর্যের কথা! আনসাররা তাদেরকে শুধু মুখে মুখেই ভাই বলেননি। তারা নিজেদের ঘর খুলে দিয়েছেন, খাবার ভাগ করে খেয়েছেন, এমনকি নিজের সম্পদও ভাইদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন।

ছোট্ট নাতনি অবাক হয়ে বলল, দাদা, সত্যিই? তারা নিজের জিনিসও ভাগ করে দিতেন?

দাদা মুচকি হেসে বললেন, হ্যাঁ দাদু ভাই। কারণ, তাদের কাছে ঈমান ছিল সবচেয়ে বড় সম্পদ। যে ভালোবাসা আল্লাহর জন্য হয়, সেখানে স্বার্থের জায়গা খুব ছোট হয়ে যায়।

তখন মদিনায় শুধু মুসলমানরাই ছিলেন না। সেখানে ইহুদি এবং আরও অনেক গোত্রের মানুষও বাস করত। সবাই যেন শান্তিতে থাকতে পারে, কেউ কারও ওপর অন্যায় না করে— এই জন্য রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি ঐতিহাসিক চুক্তি করলেন। ইতিহাসে এটি মদিনা সনদ নামে পরিচিত।

এই সনদে বলা হয়েছিল, প্রত্যেক সম্প্রদায়ের অধিকার থাকবে, সবাই নিরাপদে বসবাস করবে, কেউ অন্যায় করলে তার বিচার হবে এবং সবাই মিলে শহরকে রক্ষা করবে।

দাদা বললেন, দেখো, ইসলাম কখনো অন্যের অধিকার কেড়ে নিতে শেখায় না। বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে শেখায়। নবীজি আরও শিক্ষা দিলেন, মানুষের মর্যাদা ধন-সম্পদে নয়, বংশে নয়, গায়ের রঙেও নয়। আল্লাহর কাছে সবচেয়ে সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান এবং উত্তম চরিত্রের অধিকারী।

এই শিক্ষায় মদিনার সমাজ বদলে যেতে লাগল। ধনী-গরিব একসঙ্গে নামাজ পড়ত। আরব ও অনারব একই কাতারে দাঁড়াত। কালো ও সাদা মানুষ একে অপরকে ভাই বলে ডাকত। এভাবে অল্প দিনের মধ্যেই মদিনা এমন এক সমাজে পরিণত হলো, যেখানে ভালোবাসা, ন্যায়বিচার, দয়া আর আত্মত্যাগ ছিল মানুষের জীবনের অলংকার।

দাদা গল্প শেষ করে নাতি-নাতনিদের দিকে তাকিয়ে বললেন, মনে রেখো, একটি ভালো সমাজ শুধু বড় বড় বাড়ি দিয়ে তৈরি হয় না। ভালো সমাজ গড়ে ওঠে আল্লাহর আনুগত্য, ন্যায়বিচার, ভালোবাসা, সহযোগিতা আর সুন্দর চরিত্রের ওপর। আর মসজিদ শুধু নামাজের জায়গা নয়; এটি মানুষকে ভালো মানুষ বানানোর বিদ্যালয়।

নাতি-নাতনিরা চুপচাপ গল্প শুনছিল। তাদের মনে যেন একটি নতুন ছবি আঁকা হয়ে গেল— একটি শহর, যার কেন্দ্র ছিল একটি মসজিদ। আর তার ভিত্তি ছিল ঈমান, ভ্রাতৃত্ব ও ন্যায়বিচার।

দাদা চেয়ার ছেড়ে ওঠে গেছেন। নাতি-নাতনিরাও যার যার মতো ওঠে যাচ্ছে। তারা বলাবলি করছে, আগামীকালও কিন্তু গল্প হবে। সবাই তাড়াতাড়ি এসে পরব ইনশাআল্লাহ।

গল্পে গল্পে প্রিয় নবীজি (পর্ব: ১৮)

লেখক: আকিদুল ইসলাম সাদী

চলবে....

 

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ