বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ।। ১৯ ভাদ্র ১৪৩৩ ।। ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

শিরোনাম :
বাইতুল মোকাররমে ডিএসসিসির উচ্ছেদ অভিযান আল-আজহারের আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরলেন ৬ বাংলাদেশি আলেম ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় ৪ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১২৫২ বিচারবহির্ভূত হত্যা-মিথ্যা মামলা বন্ধের নির্দেশ রাষ্ট্রপতির ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ জনের মামলার রায় আগামী সপ্তাহে হতে পারে: চিফ প্রসিকিউটর মদিনার পথে মহান হিজরত জমিয়তের দারুস সালাম থানা শাখার মাসিক সভা অনুষ্ঠিত ১ কোটি ১০ লাখ প্রাথমিক শিক্ষার্থীকে একবেলা খাবার দেওয়া হবে: ববি হাজ্জাজ জ্বালানি সংকট ও মূল্যস্ফীতির প্রতিবাদে ইসলামী আন্দোলনের বিক্ষোভ কাল এবারও দুই পর্বে অনুষ্ঠিত হবে বিশ্ব ইজতেমা, তারিখ নির্ধারণ

মদিনার পথে মহান হিজরত

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

রাতের খাবার শেষ হয়েছে। উঠোনে মৃদু বাতাস বইছে। আকাশভরা তারা। নাতি-নাতনিরা দাদার চারপাশে গোল হয়ে বসেছে।

একজন কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, দাদা, নবীজি কি নিজের জন্মভূমি মক্কা ছেড়ে চলে যেতে চেয়েছিলেন?

দাদা মৃদু হেসে বললেন, না রে দাদু ভাই। কেউ কি নিজের জন্মভূমি ছেড়ে যেতে চায়? নবীজি মক্কাকে খুব ভালোবাসতেন। তবে কখনো কখনো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটাও ছেড়ে দিতে হয়। আজ আমি তোমাদের সেই ত্যাগের গল্প শোনাব— মহান হিজরতের গল্প।

দাদা গল্প শুরু করলেন........

আকাবার অঙ্গীকারের পর ইয়াসরিবের মানুষ নবীজিকে বলেছিলেন, "আপনি আমাদের শহরে চলে আসুন। আমরা আপনাকে রক্ষা করব, ভালোবাসব, আপনার পাশে থাকব।"

এ খবর শুনে মক্কার কুরাইশ নেতারা খুব ভয় পেয়ে গেল। তারা বুঝল, যদি মুসলিমরা নিরাপদ আশ্রয় পেয়ে যায়, তাহলে ইসলামকে আর থামানো যাবে না। এজন্য তারা মুসলিমদের ওপর নির্যাতন আরও বাড়িয়ে দিল। ঠিক তখনই আল্লাহ তাআলা নবীজিকে নির্দেশ দিলেন, সাহাবিদের একে একে ইয়াসরিবে পাঠিয়ে দিতে। ভাবো তো, কেমন কঠিন ছিল সেই বিদায়! কেউ নিজের বাড়ি ছেড়ে যাচ্ছে, কেউ জমিজমা, কেউ ব্যবসা, কেউ আপনজন— সবকিছু ফেলে রেখে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রওনা দিচ্ছে। তাদের চোখে পানি ছিল, কিন্তু হৃদয়ে ছিল অটল ঈমান। তাই ইতিহাস আজও তাদের মুহাজির নামে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে।

দাদা একটু থেমে আবার বলতে শুরু করলেন, কিন্তু কুরাইশরা তো বসে থাকার মানুষ ছিল না। তারা এক ভয়ংকর পরিকল্পনা করল। তারা ঠিক করল, বিভিন্ন গোত্রের একজন করে যুবক একসঙ্গে নবীজিকে হত্যা করবে। তাহলে কোনো একটি গোত্রকে দোষী করতে পারবে না। তবে মানুষ যতই পরিকল্পনা করুক, আল্লাহর পরিকল্পনার চেয়ে বড় কোনো পরিকল্পনা নেই।

আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে আগেই সব জানিয়ে দিলেন। সেদিন রাতে নবীজি তাঁর প্রিয় চাচাতো ভাই আলী ইবনে আবি তালিব (রা.)-কে নিজের বিছানায় শুয়ে থাকতে বললেন। আর তিনি প্রিয় বন্ধু আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। আল্লাহর ইচ্ছায় দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শত্রুরা তাঁকে দেখতেই পেল না।

নাতিদের একজন অবাক হয়ে বলল,  দাদা, তারপর কি তারা সরাসরি মদিনায় চলে গেলেন?

দাদা মাথা নেড়ে বললেন, না। শত্রুদের ধোঁকা দেওয়ার জন্য তাঁরা উল্টো দিকে, অর্থাৎ দক্ষিণে অবস্থিত সাওর গুহায় আশ্রয় নিলেন। সেখানে তিন রাত অবস্থান করলেন।

এদিকে কুরাইশ নেতারা চারদিকে খুঁজতে লাগল। খুঁজতে খুঁজতে তারা একপর্যায়ে গুহার মুখ পর্যন্ত পৌঁছে গেল। আবু বকর (রা.) এ দেখে খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তখন নবীজি শান্ত কণ্ঠে বললেন, "ভয় করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।"-সূরা আত-তাওবা: ৪০

দাদা বললেন, এই কথাটুকুই ছিল একজন সত্যিকারের মুমিনের সাহস। আল্লাহ তাআলা এমন ব্যবস্থা করলেন যে, গুহার মুখে মাকড়সা জাল বুনে ফেলল, আর পাখি বাসা বানিয়ে নিল। শত্রুরা তা দেখে ভাবল, এখানে কেউ ঢুকতেই পারে না। তারা ফিরে গেল। পরে একজন দক্ষ পথপ্রদর্শককে সঙ্গে নিয়ে নবীজি ও আবু বকর (রা.) আবার যাত্রা শুরু করলেন।

সামনে ছিল উত্তপ্ত মরুভূমি। পথ ছিল অনেক দীর্ঘ। কুরাইশ নেতারা ঘোষণা দিয়েছিল, যে তাঁদেরকে ধরে আনতে পারবে, তাকে বড় পুরস্কার দেওয়া হবে। তবুও নবীজি একটুও ভয় পেলেন না। কারণ, তিনি জানতেন, আল্লাহ যার রক্ষাকারী, তাকে কেউ ক্ষতি করতে পারে না।

অনেক দিনের কষ্টকর সফরের পর তাঁরা কুবায় পৌঁছালেন।

অপরদিকে ইয়াসরিবের মানুষ প্রতিদিন শহরের বাইরে এসে অপেক্ষা করতেন। সূর্যের তাপ বেড়ে গেলে ফিরে যেতেন। পরদিন আবার আসতেন। অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত দিন এল। দূর থেকে যখন তাঁরা নবীজিকে দেখতে পেলেন, তখন আনন্দে তাদের চোখ ভিজে গেল। চারদিকে ধ্বনিত হতে লাগল—

"তালা'আল বাদরু আলাইনা..."

শিশু, নারী, বৃদ্ধ— সবাই ভালোবাসা আর অশ্রুসিক্ত চোখে তাদের প্রিয় নবীকে স্বাগত জানালেন।

দাদা নরম কণ্ঠে বললেন, মনে রেখো সোনামণিরা, হিজরত শুধু এক শহর থেকে আরেক শহরে যাওয়ার ঘটনা নয়। এটি ছিল ঈমান, ত্যাগ, ধৈর্য আর আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই হিজরতের মাধ্যমেই ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নতুন যুগের সূচনা হয়েছিল। মদিনা হয়ে উঠেছিল ইসলামের প্রথম রাষ্ট্রের কেন্দ্র।

দাদা নাতি-নাতনিদের দিকে তাকিয়ে বললেন, জীবনে কখনো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ করতে হলে ভয় পেয়ো না। যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আল্লাহ তার জন্য কঠিন পথও সহজ করে দেন। আর মনে রেখো, মানুষের পরিকল্পনার ওপরে সবসময় আল্লাহর পরিকল্পনাই শ্রেষ্ঠ। এটিই আজকের গল্পের শিক্ষা।

এরপর হেসে বললেন, আচ্ছা, আজ এ পর্যন্তই। আগামীকাল তোমাদের শোনাব- কীভাবে মুহাজির ও আনসার ভাই হয়ে গেলেন। আর কীভাবে গড়ে উঠল ইসলামের প্রথম সমাজ ও মসজিদ।

গল্পে গল্পে প্রিয় নবীজি (পর্ব: ১৭)

লেখক: আকিদুল ইসলাম সাদী

চলবে....

 

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ