রবিবার, ১১ জানুয়ারি ২০২৬ ।। ২৬ পৌষ ১৪৩২ ।। ২২ রজব ১৪৪৭


স্মৃতির পাতায় হজরত মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরী (রহ.)-এর শেষ দরস

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

৮ জানুয়ারি ২০২৬। হজরতুল উস্তাদ হজরত মাওলানা আরশাদ মাদানী সাহেবের ইনআমী জলসায় তাঁর হৃদয় বিদীর্ণ করা অশ্রুসিক্ত বক্তব্য এবং খতমে বুখারিতে  অপ্রয়োজনীয় রসম-রেওয়াজের প্রতি তাঁর ব্যথিত প্রতিক্রিয়া আমাদের স্মৃতির দরজায় আবার জোরে কড়া নাড়ল। 
সেই কড়ার ধ্বনিতে হঠাৎই ফিরে এলো ২০২০ সালের খতমে বুখারির দিনটি, হজরত মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরী (রহ.) এর শেষ দরসের বেদনামথিত ক্ষণ। স্মৃতির উপহার ভাণ্ডারের জানালা খুলে তারই একটি ঝলক আজ নিবেদন করছি। 
দাওরায়ে হাদিস ২০২০ সমাপ্তির পর প্রিয় আকাবির ও স্নেহময় উস্তাদদের বিচ্ছেদে হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে এই অধম যে দিনলিপি ছত্রিশ কিস্তিতে লিখেছিল, এ লেখা তারই এক কান্নাভেজা পৃষ্ঠা।

স্মৃতির উপহার ভাণ্ডার এখনো  সংযমও হলো না, আর কান্নাও পুরোপুরি থামল না।
শেষ দিনগুলো যেন অস্বাভাবিক তাড়াহুড়োয় এগিয়ে যাচ্ছিল। চারদিকে হতাশার স্তব্ধতা। বাতাস থমকে গিয়েছিল। ফুলগুলো ঝরে পড়ছিল নিঃশব্দে। 

চারপাশের রঙ বদলে যাচ্ছিল। উজ্জ্বল মুখগুলোর দীপ্তি নিভে আসছিল ধীরে ধীরে। 
আজ ইশার পর বিদায় জানাতে হবে সেই মানুষদের, যাদের জন্য অন্তর ছটফট করত, যাদের উপস্থিতিতে মরুভূমিতেও সুবাসের জন্ম হতো। কিন্তু তখনো বুঝিনি এই বিদায়ী মজলিস এক আজীবনের দহন জাগানিয়া ডায়েরিতে রূপ নেবে; যে ডায়েরি প্রতিটি মুহূর্তে কাঁদাবে, তাড়িয়ে বেড়াবে।

হঠাৎ হাতে এসে গেল এক পুরোনো ডায়েরি, স্মৃতির হলুদ গাছগুলো নিমেষে সবুজ হয়ে উঠল।
হজরতুল উস্তাদের আগমনের সময় ঘনিয়ে এলো। কিতাবে তখনও বিশটির কিছু বেশি পৃষ্ঠা বাকি।  কারীগণ পূর্ণ প্রস্তুতিতে বসে ছিলেন। তিনি পরিপাটি সাদা আবায়া পরিধান করে মসনদে বসলেন। দরসের শুরুতেই বললেন, ‘আজ আমি একেবারেই ভালো আছি। দেখো, কী সাবলীলভাবে কথা বলছি!’

এই কথা শুনে আমাদের হৃদয় আনন্দে লাফিয়ে উঠল। মনে হলো আজ বুঝি নসিহতের দীর্ঘ ধারা বইবে। কে জানত, এই কটি বাক্যই হবে তাঁর শেষ প্রাঞ্জল উচ্চারণ! এরপর শব্দ আসবে কিন্তু আর ব্যাখ্যা আসবে না।

ইবারত পাঠ শুরু হলো। একে একে মুহাম্মদ শাদাব আজমী, আব্দুর রহমান এবং মুহাম্মদ আখলাদ পড়তে থাকলেন। শেষ পর্যন্ত আখলাদই পাঠ সম্পন্ন করলেন।
কিতাবের যখন আর মাত্র ছয়–সাত পৃষ্ঠা বাকি, তখন হজরতুল উস্তাদের চোখ ছাপিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তাঁকে দেখে সামনে বসা তালিবুল ইলমদের চোখও ভিজে উঠল। শেষ পৃষ্ঠায় পৌঁছানোর সময় অর্ধেক যেতেই কারীর কণ্ঠ ভারী হয়ে গেল, কান্নায় ভেঙে পড়ল। মুহূর্তেই পুরো পরিবেশ পাল্টে গেল । সবাই যেন নিঃশব্দ বৃষ্টিতে ভিজে রইল।
ইবারত শেষ হলো, কিতাব খতমে পৌঁছাল। 

হজরত কিছু বলতে চাইলেন, কিন্তু জিহ্বা সম্পূর্ণ অবশ। তারপর তিনি উচ্চস্বরে কেঁদে উঠলেন। দারুল উলূম দেওবন্দের দারুল হাদিস এমন দৃশ্য বোধহয় আগে কখনো প্রত্যক্ষ করেনি। হজরত তালিবুল ইলমদের দিকে তাকিয়ে কাঁদছেন, আর তালিবুল ইলমরা তাঁকে দেখে হাহাকার করছে।
তিনি শুধু এটুকু বললেন, ‘আল্লাহ যা চান, তাই হবে।’

বারবার বললেন। প্রতিটি উচ্চারণে বুকের ভেতর ভাঙনের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। তালিবুল ইলমদের হেঁচকি তখন আর থামবার নয়।
মসনদ থেকে নামার সময় এই অধম এগিয়ে গিয়ে তাঁকে ধরেছিল। কেউ আমার হাত ছাড়িয়ে দিল। 
তিনি তখন হৃদরোগে আক্রান্ত। আমরা তখন আর হুঁশে ছিলাম না।
হাত তুলে তিনি বললেন- ‘ভাইয়েরা, আমাকে ক্ষমা করে দিও।’
বিদায়ের মুহূর্তে সেই শব্দ উচ্চারণের সময়, তোমার শুকনো ঠোঁটের কাঁপন আজও চোখে ভাসে।

এরপর যেন আমাদের প্রাণ বেরিয়ে গেল। কেউ মসনদ আঁকড়ে ধরল, কেউ দেয়াল। এমন কান্না জীবনে আর কখনো আসেনি। প্রায় দেড় ঘণ্টা তালিবুল ইলমরা দরসগাহেই বিলাপ করতে থাকল।
মাঝে কিছু তরানা পাঠ করা হলো। এর মধ্যে আজহার শাদাবের রচিত তরানাটি যেন ক্ষতস্থানে নুন ছিটিয়ে দিল। হেঁচকির ঢেউ আবার নতুন করে উঠে এলো।
জীবনে যতবার কেঁদেছি, তার চেয়েও বেশি কেঁদেছি এই বিচ্ছেদে। তিন দিন পর্যন্ত অশ্রু থামেনি।
 

পরদিন মুফতি সাহেবকে মুম্বাইয়ের পথে বিদায় জানাতে গিয়েও সেই একই দৃশ্য। তিনি আমাদের দেখে কাঁদলেন, আমরা তাঁকে দেখে কাঁদলাম। এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য ছিল যে, যাদের কোনো সম্পর্কই ছিল না, তারাও স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

দেশ-বিদেশের আকাবির ও দারুল উলূমের অন্যান্য আসাতিযার পক্ষ থেকে দাওরায়ে হাদিসের তালিবুল ইলমদের উদ্দেশে সান্ত্বনার বার্তা পৌঁছাল। মাওলানা ইলিয়াস ঘুম্মান ও মাওলানা সালমান নাদভী সাহেবদের বার্তাও তাতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই অধম তালিবুল ইলমদের পক্ষ থেকে তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছিল।

এভাবেই আমাদের সেই বছরটি ইতিহাসের পাতায় এক ব্যতিক্রমী, বিপ্লবী অধ্যায় হয়ে রয়ে গেল।
কবি বলেন-
এই চমন ছেড়ে যেদিন আমরা চলে যাব,
সত্যিই বলছি আমরা যেন বেঁচে থেকেও মরে যাব।
এই আকাবিরদের যখনই স্মরণ করব,
নিঃসঙ্গতার কোণে গিয়ে বসে পড়ব।
নিজেরা কাঁদব, সবাইকে কাঁদাব,
এরপর আর কখনো নীরব থাকতে পারব না।

অবশেষে এই মহান ব্যক্তিত্ব আমাদের জীবন থেকে চিরবিদায় নিলেন। আর আমরা রয়ে গেলাম হাহাকার, শূন্যতা ও না-পাওয়ার এক জীবন্ত প্রতিকৃতি হয়ে।
আল্লাহ তাআলা হজরতুল উস্তাদকে অসীম রহমতে আচ্ছাদিত করুন এবং তাঁর মর্যাদা ও মাকাম বহুগুণে বৃদ্ধি করুন। আমিন।

মূল: মাওলানা ইজাজুল হক খলিল কাসেমী, সহকারী মুদাররিস, দারুল উলূম দেওবন্দ
ভাষান্তর: মুফতি জাবের কাসেমী, মুহাদ্দিস, জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা ঢাকা


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ