বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬ ।। ২৭ ফাল্গুন ১৪৩২ ।। ২৩ রমজান ১৪৪৭

শিরোনাম :
ত্রয়োদশ সংসদে রাষ্ট্রপতির নাম ঘোষণার পরই হট্টগোল জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ছুটির দিনেও খোলা থাকবে বিপিসির ডিপো রাজধানীর এভার কেয়ার হাসপাতালে ভর্তি মির্জা আব্বাস স্পিকার-ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে সভাপতিত্ব করবেন যারা স্পিকার হয়েই বিএনপির স্থায়ী কমিটির পদ ছাড়লেন হাফিজ উদ্দিন বেফাকের ৪ ক্লাসের নুরানি সিলেবাসের নতুন বই বাজারে বেগম খালেদা জিয়াসহ দেশি-বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যে হামলা বন্ধ করার আহ্বান নিরাপত্তা পরিষদের মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পেলেন আহমদ আযম খান ৫ আগস্ট ও ১৬ জুলাই রেখে জাতীয় দিবস তালিকার পরিপত্র জারি

উম্মতের জন্য বিশেষ তোহফা লাইলাতুল কদর 

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

|| আল আমীন বিন সাবের আলী ||

আরবি ১২ মাসের মধ্যে রমজান মাস যেমন রহমত মাগফেরাত ও নাজাতের গুণে গুণান্বিত ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত এক বিশেষ মাস (সহিহ ইবনে খুজায়মা: ১৭৮০)। ঠিক তদ্রুপভাবে রমজানের শেষ দশক হলো রমজানের ৩০ দিনের মধ্যে বিশেষ বৈশিষ্ট্যমন্ডিত এক দশক। যার মূল উপলক্ষ হলো, লাইলাতুল কদর। আর লাইলাতুল কদরের মূল উপলক্ষ হলো, কোরআনে কারিমের ছোঁয়া। যার সুস্পষ্ট বিবৃতি স্বয়ং রব্বুল আলামিন এভাবে পেশ করেছেন, 'নিশ্চয়ই আমি তা (কুরআন) নাযিল করেছি লাইলাতুল কদরে। লাইলাতুল কদর কি, আপনি কি জানেন? লাইলাতুল কদর (এ রাত্রে ইবাদত করা) হচ্ছে হাজার মাস (ইবাদত) থেকে উত্তম। আর এ রাতে রবের অনুমতিক্রমে ফেরেশতাদের জামাত জিবরাঈল আ.সহ (দুনিয়ার আসমানে) নেমে আসেন সকল কাজ আঞ্জাম দেওয়ার জন্য। এবং ফজর উদিত হওয়া পর্যন্ত (ইবাদতগুজার) বান্দাদের জন্য শান্তি ও রহমতের দোয়া করতে থাকে।' (সুরা কদর: ১-৫), (তাফসিরে ইবনে কাসির: ৮/৪১৪)

রাসূলে পাক সা. ইরশাদ করেন, 'যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদর ইবাদতের মাধ্যমে কাটাবে আল্লাহ তায়ালা তার অতীত জীবনের সকল গুনাহ মাফ কবে দিবেন। (সহিহ বুখারি: ১৯০১)

এই কদরের রাত উম্মতে মুহাম্মদির জন্য খোদা প্রদত্ত বিশেষ এক তোহফা। যা অন্য কোনো উম্মতকে দেওয়া হয়নি। এই উম্মত হায়াত কম পেলেও অল্প আমলে তারা অন্যান্য দীর্ঘ হায়াতের অধিকারী উম্মতের চেয়েও অগ্রগামী হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ। যেমনটি বর্ণিত আছে, আলী ইবনে উরওয়া রা. বর্ণনা করেন, রাসূল সা. একদিন বনী ইসরাঈলের চারজন লোকের কথা উল্লেখ করেন। যারা ৮০ বছর একনিষ্ঠচিত্তে আল্লাহর ইবাদত করেছে। এরপর তিনি আইয়ুব আ., জাকারিয়া আ.,  হিযকিল আ. ও ইউশা ইবনে নুন আ. -এর কথা উল্লেখ করেন। সাহাবীগণ তাদের ইবাদতের কথা শুনে আশ্চর্য হন। তখন হযরত জিবরাঈল আ. এসে বলেন, হে মুহাম্মদ! আপনি কি ঐ লোকদের ৮০ বছরের ইবাদতের কথা শুনে অবাক হচ্ছেন? আল্লাহ আপনাদের এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করেছেন। তারপর তিনি সুরা কদর তেলাওয়াত করে বলেন, শবে কদরের ইবাদত ৮০ বছর ইবাদতের চেয়েও উত্তম। রাসূল সা. তখন খুবই আনন্দিত হলেন। (তাফসির ইবনে কাসির: ৪/৪৪৩)

এজন্য রাসুলুল্লাহ সা. এ রাত অনুসন্ধানে রমজানের শেষ দশকে ইবাদতের মাত্রা বাড়িয়ে দিতেন। 'এতো বেশি বাড়িয়ে দিতেন, যেমনটি অন্য সময় করতেন না।' (সহিহ মুসলিম: ২০০৯) এমনকি তিনি শেষ দশক এলে কোমর শক্ত করে বেঁধে নিতেন এবং সারারাত জেগে ইবাদতে মশগুল থাকতেন, অতঃপর পরিবার পরিজনকেও তাহাজ্জুদের জন্য খুব গুরুত্বের সঙ্গে জাগিয়ে দিতেন। (সহিহ বুখারি: ১৮৮৪)

এই রাত খুঁজে পেতে রাসূলে কারিম সা. রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন। এবং বলতেন, তোমরা রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর তালাশ কর। (সহিহ বুখারী: ১৮৮০) আরো এক ধাপ সুনির্দিষ্ট করে দিয়ে ইরশাদ করেন, তোমরা শেষ দশকের বেজোড় রাতে লাইলাতুল কদরের অনুসন্ধান করো। (সহিহ বুখারি: ২০১৭)

শবে কদর কবে

অনেকের ধারণা রমজানের ২৬ তারিখ দিবাগত রাত শবে কদর। ঐ রাত জেগে থেকে মনে করেন হাজার বছর থেকে শ্রেষ্ঠ রাত পেয়ে গেছেন। অথচ নিশ্চিতভাবে ২৭ এর রাতকে শবে কদর মনে করা ভুল। কারণ এই রাতকে নবী করীম সা.সহ কোনো সাহাবীই সুনিশ্চিতভাবে শবে কদর হিসেবে আখ্যায়িত করেননি। তবে বেজোড় রাত হিসেবে ২৭ এর রাতও শবে কদর হওয়ার সম্ভাবনা মুক্ত নয়। যদিও ওমর হুজায়ফা রা.সহ অনেক সাহাবি এ রাতে লাইলাতুল কদর হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা ব্যক্ত করেছেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা: ৯৬০৭)। অনুরূপভাবে সুফিয়ান ছাওরী, আহমদ ইবনে হাম্বল এবং ইসহাক প্রমুখ ব্যক্তিবর্গও এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন। মুমিন বান্দামাত্রই বেজোড় প্রতিটি রাতেই লাইলাতুল কদর অনুসন্ধানের মাধ্যমে আল্লাহকে পেতে ইবাদতে কাটাবে। তবুও এ রাত গোপন রাখার রহস্যটা কি? তা জানতে মন চাইবে। এর রহস্য হলো, আল্লাহপাক রব্বুল আলামীন বান্দাকে হতাশা ও ভ্রান্তি থেকে রক্ষা করে আশার দোলাচলে ঝুলন্ত রেখে তাদেরকে ইবাদতের প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত রাখার জন্য এই বিষয়টি গোপন রেখেছেন। কারণ, যদি বলা হত যে, সারা বছরের মধ্যে একটি রাত আছে শবে কদর, তোমরা সেটাকে খুঁজো। তাহলে বান্দা ক্লান্তি ও হতাশায় ভুগত। আর যদি সুনির্দিষ্টভাবে একটি রাতের কথা বলে দেওয়া হত, তাহলে অনেক বান্দাই ইবাদত-বন্দেগী থেকে হাত-পা গুটিয়ে নিত। অথচ এতদুভয়ের কোনোটিই কাম্য নয়। বান্দাকে ব্যালেন্সড রাখার জন্য এই বিষয়টিকে হেকমতের সঙ্গে গোপন রাখা হয়েছে। ওয়াল্লাহু আ'লাম।

শবে কদর হাসিলে করণীয় 

১। এ পুণ্যময় রজনীতে অবহেলা না করে গুরুত্ব ও ইখলাসের সাথে ইবাদত বন্দেগিতে লেগে থাকা চাই। কিছু অংশ কুরআনে কারিমের তিলাওয়াতে নিমগ্ন থাকা, কিছু অংশে নফল নামায, বিশেষ করে সলাতুত তাসবীহ আদায় করা এবং কিছু অংশে যিকির আযকার ও দোয়া-মুনাজাত করা উচিত। (সুরা আনকাবূত: ৪৫)

(সেজন্য সবচেয়ে উত্তম হলো, রমজানের শেষের দশকে ইতিকাফে বসা। অসম্ভব হলে অন্তত শেষ দশকের শুধু রাতগুলোতে মসজিদে নফল ইতিকাফ করা। এটাও যদি সম্ভব না হয় তাহলে শেষ দশকের ইশা ও ফজরের নামায গুরুত্ব সহকারে জামাতের সাথে আদায় করা।)

২। এ রাত্রিতে বেশি বেশি নিম্নোক্ত দোয়াটি পড়তে থাকা-  اللّٰهُمَّ انَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّيْ (ইবনে মাজাহ: ৩৮৫০) কেননা বর্ণিত আছে যে, আয়েশা রা. বলেন, 'আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, যদি আমি লাইলাতুল কদর জানতে পারি, তাহলে সে রাতে কী বলব? তিনি বলেন, তুমি বলো, "আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন, তুহিব্বুল আফওয়া, ফা’ফু আন্নি" (অর্থ) "হে আল্লাহ, আপনি সম্মানিত ক্ষমাকারী। আপনি ক্ষমা করতে পছন্দ করেন। অতএব আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন।" (তিরমিজি: ৩৫১৩)

৩। নিজের জীবনের পাপরাশির কথা স্মরণ করে আল্লাহ তাআলার নিকট কাকুতি-মিনতি ও রোনাজারীর সাথে তওবা করা ও ক্ষমা চাওয়া। (সুরা নূহ: ১০) কেননা, কোনো ব্যক্তি যদি রমজানে তার গুনাহ ক্ষমা করাতে ব্যর্থ হয়, তবে তার প্রতি রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর হুঁশিয়ারি আছে। তিনি বলেছেন, ‘ওই ব্যক্তির নাক ধুলাধূসরিত হোক, যে রমজান পেল এবং তার গুনাহ মাফ করার আগেই তা বিদায় নিল।’ (তিরমিজি: ৩৫৪৫)

লাইলাতুল কদরে বর্জনীয়

১। মসজিদে নিঃপ্রয়োজনে মোমবাতি জ্বালানো ও আলোক-সজ্জা করা। (সুরায়ে আ‘রাফ: ৩১)

২. জামাতের সাথে সলাতুল তাসবীহ, তাহাজ্জুদ কিংবা অন্য কোনো নফল নামায পড়া। কারণ, নফল নামায জামাতের সাথে নাজায়েয। (রদ্দুল মুহতার: ১/৫৫২)

৩। ঘোষণা করে মসজিদে সম্মিলিত দোয়ার আয়োজন করা। হ্যাঁ, ঘোষণা বা ডাকাডাকি ছাড়া এমনিতে যারা উপস্থিত ছিল তারা দোয়া করে নিলে তা জায়েয।

৪। এই রাতে মসজিদে প্রচলিত মীলাদ-কিয়াম করা। কারণ ইহা সুস্পষ্ট বিদ‘আত। (মুসনাদে আহমাদ: ১৭১৪৯)

৫। এতো অধিক রাত্র পর্যন্ত জাগ্রত থাকা, যাতে ঘুমের তাড়নায় ফজরের জামাত ছুটে যায় কিংবা কাযা-ই হয়ে যায় বা এমন হয়ে যায় যে, নামাযে কি সুরা কালাম পড়ছে তা নিজেরও খবর নেই। (মুয়াত্তা ইমাম মালেক: ১৫৫)

লাইলাতুল কদরের শিক্ষা 

পবিত্র কুরআনের ছোঁয়াতে লাইলাতুল কদরের মূল্য হয়েছে। সেই কুরআন যদি আমাদের কলবে থাকে, আমাদের বিবি-বাচ্চার কলবে থাকে তাহলে আল্লাহ পাক খুশি হবেন। আল্লাহ পাক দোযখ থেকে অবশ্যই হেফাযত করবেন। এবং কুরআনের বরকতে আমাদেরকেও দামি বানিয়ে দিবেন দুনিয়া ও আখেরাতে, ইনশাআল্লাহ। তাই এই কুরআন শেখা ও এর হক আদায় করে চলার জন্য চেষ্টা করতে হবে আজীবন। আল্লাহ তাওফিক দিন, আমিন।


লেখক: পরিদর্শক, বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড (বেফাক), কাজলা (ভাঙ্গাপ্রেস), যাত্রাবাড়ী, ঢাকা।

আইএইচ/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ