শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬ ।। ২৭ চৈত্র ১৪৩২ ।। ২২ শাওয়াল ১৪৪৭


‘কওমিতে একাধিক কিতাব দরসভুক্ত করা ছাড়া সিরাতের ঘাটতি পূরণ সম্ভব নয়’

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ফাইল ছবি

কওমি মাদরাসা সিলেবাসের প্রধান উৎস ইলমে ওহি তথা কুরআন-হাদিস। তবে পরিতাপের বিষয়—ইলমে ওহির ধারক এবং বার্তা বাহক স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিরাত এই সিলেবাসে অবহেলার শিকার। একটা সময় সিরাতের বেশ কিছু কিতাব থাকলেও বর্তমানে শুধু ‘সিরাতে খাতামুল আম্বিয়া’ নামক ছোট্ট পুস্তিকাই সিলেবাসভুক্ত আছে। যা পড়ানো হয় নাহবেমিরের বাচ্চাদের; যারা বয়সে ছোট, যাদের বুঝশক্তি তুলনামূলক কম। ফলে বেশির ভাগ ছাত্রই নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিরাত নিজের মধ্যে ধারণ করতে সক্ষম হয় না। তারা কেবল গল্প মুখস্থ করে। যা মনে থাকে শুধু পরীক্ষা অবধি। চলমান এই সংকটের কী কারণ এবং তা নিরসনের কী উপায়—এমন প্রশ্ন নিয়ে জাতীয় দৈনিক নয়া দিগন্তের সিনিয়র সহসম্পাদক, মাদরাসা দারুর রাশাদের শিক্ষাসচিব, লেখক, গবেষক, মাওলানা লিয়াকত আলীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আওয়ার ইসলামের সহসম্পাদক ইমরান ওবাইদ।    

কওমি সিলেবাসে সিরাত বিষয়টা অবহেলিত কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের কওমি সিলেবাসে সিরাতের কিতাব একেবারে নেই বললেই চলে। 'সিরাতে খাতামুল আম্বিয়া' মূলত ক্লাস ফাইভের ছোট বাচ্চাদের জন্য। এর ওপর ক্ষান্ত করা উচিত নয়। এতে সিরাতের অনেক বিষয় জানা হয় না। কওমি সিলেবাসে উপরের পর্যায়ে আরও সিরাতের কিতাব থাকা দরকার ছিল। কারণ, একাধিক সিরাতের কিতাব না থাকার কারণে ছাত্ররা সিরাত পড়ে না। ফলত উপরের জামাতে গিয়ে যখন তাদের হাদিস-তাফসির পড়তে হয়, তখন অনেক কিছুই তারা বোঝে না। সিরাতের আরও কিছু কিতাব সিলেবাসে থাকলে ছাত্ররা (বাধ্য হয়ে হলেও) পড়ত, এতে হাদিস এবং তাফসিরের অনেক বিষয় তারা সহজে বুঝতে পারতো।

মাওলানা লিয়াকত আলী বলেন, আমি মনে করি সিরাতের কিতাব একাধিক না থাকা আমাদের কওমি সিলেবাসের বড় ধরনের ঘাটতি। এই ঘাটতি পূরণ করা দরকার।

কওমি সিলেবাসে সিরাত অবহেলার কারণে তৈরি ঘাটতির পেছনে মূল কারণ হিসেবে প্রবীণ এই আলেম সাংবাদিক বলেন, প্রথমে তারা হয়তো ভেবেছিলেন ছাত্ররা সিরাতের সহজ বিষয়গুলো নিজেরা পড়ে নেবে এবং জটিল বিষয়গুলো ক্লাসে পড়িয়ে দিলেই চলবে। কিন্তু তারা হয়তো এটা ভেবে দেখেননি যে, সিলেবাসে না রাখলে, পরীক্ষা না নিলে,  ছাত্ররা নিজে থেকে পড়ে না। অধিকাংশ ছাত্রই এমন। ঘাটতির পেছনে কারণ হিসেবে আমার এটাই মনে হয়।

আমাদের কওমি সিলেবাসে 'সিরাতে খাতামুল আম্বিয়া' ছাড়া আরও কোনো কিতাব ছিল কি না জানতে চাইলে মাওলানা লিয়াকত আলী বলেন, গহরডাঙ্গা নেসাবে উর্দু 'চৌথি' এবং 'তাওয়ারিখে হাবিবে ইলাহ’ নামে দুটি কিতাব ছিল। আমরা যখন ছাত্র তখনও ছিল। এখন আছে কি না আমার জানা নেই। উর্দু চৌথিতে হিজরত থেকে নিয়ে সপ্তম হিজরি পর্যন্ত পুরো ঘটনাগুলো ধারাবাহিকভাবে বর্ণিত ছিল। এটা খুব উপকারে আসত।

কওমি সিলেবাসের ‘সিরাত’ ঘাটতি পূরণে কী পন্থা অবলম্বন করা যায়- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সিরাতের কিতাব যোগ করা ছাড়া এর কোনো বিকল্প নেই। সিরাতের আরও কিতাব যোগ করা দরকার।

প্রবীণ এই মুহাদ্দিস ও সাংবাদিকের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল কওমি সিলেবাসে সিরাতের নির্ভরযোগ্য কোন কিতাবগুলো যোগ করা যায় বলে আপনি মনে করেন? উত্তরে তিনি বেশ কিছু কিতাবের নাম তুলে ধরেন: মাওলানা মুহাম্মদ ইদরীস কান্দলবী রহ.-এর সিরাতে মুস্তফা (সা.); মাওলানা রাবে হাসানি নদভী (রহ.) রচিত 'রাহবারে ইনসানিয়াত'; সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ. লিখিত 'আস সিরাতুন নাবাওয়িয়্যাহ' ( যা বাংলা ভাষায় নবীয়ে রহমত সা. নামে পরিচিত)।

মাওলানা লিয়াকত আলী বলেন, এর যেকোনো একটা সংযোজন করা যায়। অথবা নিদেনপক্ষে 'তারিখে মিল্লাতে'র প্রথম খণ্ড। যা মূলত সিরাতের। তারিখে মিল্লাতের দ্বিতীয় খণ্ড ‘খেলাফতে রাশেদা’ আমাদের পড়ানো হয়। কমপক্ষে এই কিতাবটা যুক্ত করলেও অনেক উপকার হবে আশা করি।

আবুল হাসান আলী নদভী রহ.-এর 'আস সিরাতুন নাবাওয়িয়্যাহ' নামক কিতাব সম্পর্কে তিনি বলেন, এই কিতাবটা নেসাবভুক্ত করা হলে আমি মনে করি আমাদের ছাত্রদের দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠবে। আল্লাহর রাসুলের সিরাত এবং তার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে তাদের পরিষ্কার ধারণা থাকবে।

মোট কতগুলো সিরাতগ্রন্থ সিলেবাসে যুক্ত করলে চলমান সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব, এমন প্রশ্নের উত্তরে মাওলানা লিয়াকত আলী বলেন, বর্তমানে কমপক্ষে একটা মুকাম্মাল (পরিপূর্ণ) সিরাতের কিতাব দরকার। যে কিতাবে হাদিস এবং তাফসিরে ইশারাকৃত ঘটনাগুলোর পাশাপাশি নবী জীবনের সম্পূর্ণটা ফুটে উঠেছে। এজন্য বর্তমানে 'সিরাতুল মুস্তফা' হতে পারে। তবে ‘সিরাতে মুস্তফা’ বিশ্লেষণধর্মী হওয়ার কারণে একটু বড় হয়ে যায়। তারা (কওমি শিক্ষাকে যারা নেতৃত্ব দেন) একটু খোঁজাখুঁজি করলে আরও কিতাব খুঁজে পাবে।

'সিরাতুল মুস্তফা' সিলেবাসভুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত হলে কোন জামাতে দিলে ভালো হয়, এই ব্যাপারে তার মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেন, সিলেবাসটা বিন্যস্ত করা দরকার। এখন তো 'সিরাতে খাতামুল আম্বিয়া' পড়ানো হয় নাহবেমিরে। হেদায়াতুন্নাহু জামাতে কাগজে-কলমে রয়েছে খেলাফতে রাশেদা। আর কাফিয়া জামাতে বনি উমাইয়া। তবে এগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে পড়ানো হয় না। আমার মনে হয় প্রথমে এগুলোর প্রতি আরও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এবং শরহে জামি বা শরহে বেকায়াতে সিরাতে মুস্তফা বা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য সিরাতের কিতাব যুক্ত করা উচিত।

কওমি ছাত্রদের সিরাত পাঠে উদ্বুদ্ধ করার পরার্মশ দিয়ে তিনি বলেন, আমাদের মাদরাসার ছাত্রদের সিরাতের ওপর অগাধ পড়াশোনা দরকার। সামনে রবিউল আউয়াল মাস, এটি সিরাত চর্চার একটা উপলক্ষ হতে পারে। এই সময় তারা নেসাবের বাইরে থেকেও সিরাত বিষয়ক পড়াশোনা করতে পারে।

সবশেষ মাদরাসার সাপ্তাহিক বক্তৃতা প্রশিক্ষণকে বিশেষ আঙ্গিকে সাজানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, আমাদের মাদরাসাগুলোতে সপ্তাহিক যে বক্তৃতা প্রশিক্ষণ হয়, সেখানে রবিউল আওয়ালের চার সপ্তাহের জন্য সিরাতকে চার ভাগ করে বক্তৃতার বিষয় নির্ধারণ করা যেতে পারে। যেমন এক সপ্তাহের জন্য দেওয়া যেতে পারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়ত পূর্ব জীবন। অন্য সপ্তাহে নবুওয়তের পরবর্তী এবং মক্কী জীবন। তৃতীয় সপ্তাহে হিজরত থেকে নিয়ে পাঁচ হিজরি পর্যন্ত। শেষ সপ্তাহে ষষ্ঠ হিজরি থেকে শেষ পর্যন্ত। এইভাবে পরিকল্পনা করে ছাত্রদের সিরাত চর্চা করালে চলমান সিরাত ঘাটতি পূরণ হতে পারে। বিকল্প এই ব্যবস্থাগুলো গ্রহণ করলে আমার মনে হয় যে ছাত্রদের উপকার হবে।

জেডএম/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ