ভর্তি কার্যক্রম শেষে দেশের কওমি মাদরাসাগুলোতে শুরু হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। চলতি সপ্তাহে কিংবা আগামী সপ্তাহের মধ্যে পুরোদমে ক্লাস শুরু হবে প্রতিটি মাদরাসায়। কয়েক লাখ শিক্ষার্থী নতুন শিক্ষাবর্ষে নতুন দরসে বসতে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে তাদের করণীয় কী, কোন কোন বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন বিশিষ্ট মুহাদ্দিস, লেখক ও সাংবাদিক মাওলানা লিয়াকত আলী। আওয়ার ইসলামের পক্ষ থেকে তাঁর মুখোমুখি হয়েছেন সহসম্পাদক ইমরান ওবাইদ।
বছরের শুরুতেই ছাত্রদের কোন বিষয়গুলোর প্রতি বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন- এমন প্রশ্নের জবাবে মাওলানা লিয়াকত আলী আটটি পয়েন্ট তুলে ধরেন। সেগুলো হলো-
১. দীনি মাদরাসার ছাত্রদের এই কথা মনে রাখা দরকার যে, এই লেখাপড়া সম্পূর্ণ দীনের স্বার্থে। দীনের প্রসার-প্রচারের জন্য নিজেকে তৈরি করা—এই মাকসাদে দীনি এলেম হাসিল করা প্রয়োজন।
২. তালিমের সাথে তরবিয়ত অবশ্যই থাকতে হবে। তালিমের সাথে তরবিয়তের যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, আমাদের আকাবিরে দেওবন্দি উলামায়ে কেরামের এই তরবিয়ত থেকে কোনো অংশেই যেন আমরা বিচ্যুত না হই—এদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
৩. সময়ের মূল্যায়ন করা। আমাদের কওমি মাদরাসার একটা বড় সুনাম হলো যেখানে কোনো সেশনজট নেই। তার মানে যথাসময়ে পরীক্ষা হয়, যথাসময়ে শিক্ষাবর্ষ শেষ হয় এবং যথাসময়ে পরবর্তী শিক্ষাবর্ষ শুরু হয়। অতএব, আমাদের হাতে সময় একেবারে মেপে দেওয়া। এখানে যদি কেউ একটা দিনও অবহেলায় কাটায়, তাহলে তার যে ক্ষতিটা হয়, এ ক্ষতি আর কখনোই পূরণ হয় না। এজন্য বছরের শুরু থেকেই প্রত্যেকটা ছাত্রের উচিত তার সময়ের প্রতি খেয়াল রাখা, সময়ের মূল্য দেওয়া এবং একটা দিনও নষ্ট না করা।
৪. প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের কিছু নিয়মকানুন আছে। এই নিয়মকানুনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং সম্মানবোধ করা দরকার। একেক প্রতিষ্ঠানের হয়তো অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে ভিন্ন কিছু নিয়মকানুন থাকে। এই বিষয়গুলো খেয়াল করা উচিত। প্রতিষ্ঠান ছাত্রদের কল্যাণের জন্যই এই নিয়মগুলো করে থাকে, তাই উস্তাদ ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি সুধারণা রাখা দরকার।
৫. আসাতায়ে কেরামের সঙ্গে সম্পর্ক। যে ছাত্রের সম্পর্ক আসাতিজায়ে কেরামের সাথে যত ঘনিষ্ঠ হয়, ইলেমের মধ্যে তার বরকত তত বেশি হয়। এজন্য আসাতিজায়ে কেরামের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করা প্রয়োজন।
৬. যে সমস্ত বিষয় মনোযোগ নষ্ট করে, সেই বিষয়গুলো থেকে দূরে থাকা দরকার। যেমন বর্তমান সময়ের টাচ মোবাইল। প্রয়োজনের চেয়ে অপ্রয়োজনে এটা বেশি ব্যবহার করা হয়। যোগাযোগ রক্ষার জন্য প্রয়োজন পরিমাণ ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু মোবাইল ফোনের যে অপব্যবহার হচ্ছে, তা থেকে আমরা মাদরাসার ছাত্রদের বিরত থাকার পরামর্শ দিই। ছাত্ররা যেন এটাকে ইতিবাচকভাবে নেয়, কারণ এটা তাদের জীবন গঠন ও চরিত্র রক্ষার জন্যই করা হয়।
৭. মাদরাসায় অনেক সময় কড়াকড়ি করা হয় ছাত্রদের জীবন গঠন করার জন্য। এখানে কোনো ছাত্রকে পর মনে করা হয় না বা দুশমন মনে করা হয় না। তাদের কল্যাণের জন্যই এই কড়াকড়ি করা হয় যেন তারা উম্মতের রাহবার হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। প্রতিষ্ঠানের এই নেগরানিকে নিজের কল্যাণ মনে করা উচিত।
৮. আরেকটি জরুরি বিষয় যা আমি সবসময় বলি, ছাত্রদের 'এতেকাফ' করা দরকার। এতেকাফ মানে হলো, যেমন একজন মোতাকেফ মসজিদ থেকে নেহায়েত জরুরত ছাড়া বের হতে পারে না, ছাত্রদেরও তেমন হওয়া উচিত। মাদরাসায় ঢুকবে এতেকাফের নিয়তে এবং নেহায়েত জরুরত ছাড়া মাদরাসার বাইরে যাবে না। ছুটির সময় ছাড়া বাইরে যাবে না এবং কাজ শেষ হওয়ামাত্র ফিরে আসবে। এই যে একাগ্রতা এবং সম্পূর্ণ মনোযোগ—এটাই হলো ছাত্রদের তারাক্কি এবং এলেমের মজবুতি আসার সবচেয়ে বড় উপায়।
অনেকেই নতুন মাদরাসায় ভর্তি হওয়ার পর সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে উঠতে পারে না, তাদের উদ্দেশে পরামর্শ দিয়ে মাওলানা লিয়াকত আলী বলেন, আসলে অহেতুক মাদরাসা পরিবর্তন করাতে বরকত নষ্ট হয়ে যায়। এখন নেহায়েত জরুরি যদি হয়, যেমন মাদরাসার উপরের জামাত নেই, তখন তো পরিবর্তন করতেই হয়। কেউ হয়তো আরও ভালো করার জন্য একটু বড় মাদরাসায় যেতে চায়। এখন নতুন জায়গায় গেলে একটু নতুন অবস্থা হয়, এটা তো স্বাভাবিক। সেটা মেনে নিতে হবে। এবং যে মাদরাসায় ভর্তি হলো সেই মাদরাসার যারা মুন্তাজিম এবং সহপাঠীদের একটা কর্তব্য থাকে—নতুন ছাত্র ভাইকে আপন করে নেওয়া। আর নিজেরও উচিত যেখানে আমি নতুন গেলাম সেখানকার সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা। যেন একেবারে নতুন মনে না হয়।
কেউ যদি একান্তই মানিয়ে উঠতে না পারে তখন তাদের কী করা উচিত, সে ব্যাপারে তিনি বলেন, একান্তই যদি মানিয়ে উঠতে না পারে তখন তো পরিবর্তন করা উচিত। কিন্তু এরকম খুব কম হবে। অধিকাংশ হলো মনের ব্যাপার। নিজের মন থেকে যদি মেনে নেই যে এখানে আমার নতুন অবস্থা, নতুন সবকিছু, এভাবে মেনে চলতে হবে—তাহলে সহজ হয়ে যায়।
মোটাদাগে কোন বিষয়গুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখলে প্রতিটি ছাত্র নিজ নিজ জামাত থেকে পরিপূর্ণ ইস্তিফাদা অর্জন করতে পারবে, এমন প্রশ্নের জবাবে বিশিষ্ট মুহাদ্দিস মাওলানা লিয়াকত আলী বলেন, এক তো হলো ছাত্রদের তলব থাকা দরকার। তার মধ্যে একটা জানার আগ্রহ থাকা। পরিকল্পনা থাকা। সময় কাজে লাগানো। আরেকটা বিষয় হলো, উস্তাদ যখন ক্লাসে আসেন তখন খালি জেহেনে যদি কেউ বসে তাহলে উস্তাদ থেকে ইস্তফাদা কম হবে। তার জেহেন যদি আগেই প্রস্তুত থাকতে হবে যে, আমি কী নেবো। সেজন্য প্রথমত তার মুতালাআ করে সবকে যেতে হবে। তাহলে যেখানে একটু বুঝবার ব্যাপার আছে সেখানে বুঝে নিতে পারবে। আর যদি কেউ মুতালাআ না করে সবকে বসে তাহলে সে ফায়দা কম পাবে। তো আগে থেকে জেহেনে কিছু প্রশ্ন রাখা দরকার—আমি কী বুঝতে চাই, এখানে উস্তাদ কীভাবে বলেন। আর যদি উস্তাদের তাকরিরের মধ্যে কথাটা না আসে তাহলে আদবের সঙ্গে প্রশ্ন করা। অর্থাৎ, কোনো ছাত্রের মধ্যে তলব যদি থাকে, তাহলে তার ফায়দা হবে। আর যদি তলব না থাকে, যদি আলসেমি করে, শুধু সময় কাটানোর চিন্তা করে তাহলে তার ফায়দা খুব কম হবে।
নতুন বর্ষ শুরু করা ছাত্রদের উদ্দেশে বিশেষ নসিহত সম্পর্কে জানতে চাইলে মাদরাসা দারুর রাশাদের শিক্ষাসচিব মাওলানা লিয়াকত আলী বলেন, আমি ছাত্রদের সবসময় ওই কথাটাই বলি, ছাত্রদের এতেকাফ করা প্রয়োজন। অর্থাৎ, বিনা প্রয়োজনে বাইরে না যাওয়া। যখন হবে ছুটি হবে কেবল তখনই বাইরে যাবে। এর ওপর যদি কেউ আমল করতে পারে, তো আমি মনে করি যে যেকোনো ছাত্র, তার জেহেন যতই দুর্বল হোক, অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা তাকে এলেম দান করবেন এবং এলেমে তার বরকত হবে ইনশাআল্লাহ।
আইও/