মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ ২০২৬ ।। ১০ চৈত্র ১৪৩২ ।। ৫ শাওয়াল ১৪৪৭

শিরোনাম :
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দুই পক্ষের সংঘর্ষে প্রাণ গেল ইমামসহ দুজনের দাওরায়ে হাদিসে ছাত্রীদের মধ্যে মেধা তালিকায় সেরা দশে যারা যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের চলমান সংঘাত মধ্যস্থতায় এগিয়ে আসছে পাকিস্তান বেফাকের পর হাইয়াতুল উলয়ায়ও ঢালকানগর মাদরাসার ঈর্ষণীয় ফলাফল বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার নির্দেশনা প্রধানমন্ত্রীর দাওরায়ে হাদিসে ছাত্রদের মধ্যে মেধা তালিকায় শীর্ষ দশে যারা দাওরায়ে হাদিসে মেধা তালিকায় দ্বিতীয় পটিয়া মাদরাসা দাওরায়ে হাদিসে বালিকা শাখায় দেশসেরা ফাতিমাতুযযাহরা রা.মহিলা মাদরাসা ঢাকা দাওরায়ে হাদিসে ছাত্রীদের ফলাফলে সেরা যে তিন মাদরাসা দাওরায়ে হাদিসে দেশসেরা ঢালকানগর মাদরাসা

তারাবি নিয়ে ১০ হাফেজের হৃদয়ছোঁয়া অভিব্যক্তি

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

দাঁড়িয়ে আছি মাহে রমজানের বিদায়বেলায়। রহমত, মাগফেরাত শেষে একে একে ফুরিয়ে যাচ্ছে নাজাতের দিনগুলোও। পবিত্র কোরআনের নূরে রমজানের প্রতিটি রাত ছিল আলোকিত। মসজিদে মসজিদে তারাবির নামাজে ছিল মুসল্লিদের উপচেপড়া ভিড়। বাতাসে ভাসছিল সুরেলা কণ্ঠে আবেগময় কোরআন তেলাওয়াত। ম্রিয়মাণ আলোয় সে যেন এক জান্নাতি পরিবেশ। সারাদিনের রোজার ক্লান্তি শেষে তারাবির নামাজ ছিল মুমিনের আত্মিক প্রশান্তির অন্যতম মাধ্যম। আর এই পুরো আয়োজনের প্রধান চালিকাশক্তি ছিলেন পবিত্র কোরআন বুকে ধারণকারী হাফেজ সাহেবেরা।

তারাবির নামাজ পড়ানো শুধু টানা কয়েক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে পবিত্র কালামুল্লাহর তেলাওয়াত করা নয়; এর সঙ্গে মিশে থাকে আবেগ, অনুভূতি এবং কোরআনের প্রতি আকাশসম ভালোবাসা। তারাবি পড়ানো শারীরিক পরিশ্রমের পাশাপাশি কঠোর সাধনার বিষয়। কঠিন এক চ্যালেঞ্জ। বছরের পুরোটা সময় তেলাওয়াত করে কোরআনের ইয়াদ ধরে রাখতে হয় হাফেজ সাহেবদের।

এই তারাবি পড়ানোকে ঘিরে হাফেজ সাহেবরা বিচিত্র সব পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। সুখ-দুঃখের নানা স্মৃতি নিয়ে হাসি মুখে রমজান কাটিয়ে দেন কোরআনের পাখিরা।

মাহে রমজানের এই শেষলগ্নে তারাবিহ পড়ানোর অভিজ্ঞতা-অনুভূতি জানতে দেশের বিভিন্ন জেলার দশজন হাফেজের সঙ্গে কথা বলেছেন আওয়ার ইসলামের বিশেষ প্রতিনিধি ইমরান ওবাইদ।  

১. হাফেজ মাওলানা মোহাম্মদ জুনাইদ আহমাদ

তিনি ১২ বছর যাবত তারাবির নামাজ পড়াচ্ছেন। এবছর গাজীপুরের সিংগারটেক বাইতুন নূর জামে মসজিদে তারাবি পড়িয়েছেন। তারাবি পড়ানোর এই দীর্ঘ এক যুগ নানা সুখ-দুঃখের স্মৃতিতে ঘেরা বলে জানিয়েছেন তিনি ।

হাফেজ জুনাইদ তার প্রথম বছর তারাবি পড়ানোর কথা স্মরণ করে বলেন, সে বছর আমার উস্তাজের বাড়ির মসজিদে তারাবি পড়িয়েছি। সেই মসজিদটি ছিল আমাদের মাদরাসা থেকে প্রায় দুই-তিন কিলোমিটার দূরে। প্রতিদিন সাইকেল চালিয়ে সেখানে গিয়ে তারাবি পড়াতাম। করোনার বছরের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, সে বছর মসজিদে তারাবি পড়ানোর সুযোগ ছিল না; তাই আমি আমাদের বাড়ির উঠোনেই তারাবির নামাজ পড়াই। এলাকায় ঘোষণা দেওয়ার ফলে অনেকেই আমাদের বাড়িতে আসতেন তারাবি পড়তে।

বর্তমান সময়ে তারাবির প্রসঙ্গে হাফেজ জুনাইদ বলেন, বর্তমানে মসজিদের তুলনায় হাফেজের সংখ্যা বেশি। তাই অনেকেই তারাবি পড়ানোর জন্য মসজিদ পায় না। তাদের উচিত বসে না থেকে নিজের বাড়িতেই খতমে তারাবি শুরু করে দেওয়া। শুরু হলে মানুষও জড়ো হবে। এবং এতে করে হাফেজদের ইয়াদও ঠিক থাকবে। না হয় এক সময় কোরআন ভুলে যেতে পারেন।

২. হাফেজ মাওলানা মিসবাহুজ্জামান রায়হান

তিনি ৮ বছর ধরে তারাবির নামাজ পড়াচ্ছেন। এবছর অন্যান্য বারের মতো নিজ এলাকা হবিগঞ্জ সদরে তারাবি পড়িয়েছেন। সাধারণত ২৭ দিনে তিনি খতম তারাবি পড়ান। তবে একবার শখ করে ১৭ দিনে খতমে তারাবি পড়িয়েছেন বলে জানান তিনি।

হাফেজ মিসবাহ তার প্রথম তারাবির স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমি প্রথমবার তারাবি পড়িয়েছি হবিগঞ্জ দারুল ইরশাদ ওয়াদ দাওয়াহ আল ইসলামিয়া বহুলা মাদরাসায়। মুসল্লিদের অনেকেই ছিলেন আমার উস্তাদ, নামকরা হাফেজ ও আলেম। তাই অনেক সতর্ক থেকে নামাজ পড়াতে হতো। কেরাত, তাজবিদ, রুকু-সেজদায় কতটুকু সময় দিতে হবে এমন নানা বিষয়ে প্রতিনিয়ত তাঁদের থেকে কিছু না কিছু দিকনির্দেশনা পেতাম। ফলে তারাবির ওই সময়টাই ছিল যেন আমার দরসগাহ।

নতুনদের উদ্দেশে হাফেজ মিসবাহ বলেন, আমি মনে করি, নবীনদের জন্য শুরুতে কোনো উস্তাজের তত্ত্বাবধানে তারাবি পড়ানো উচিত। এটা তার জন্য উজ্জ্বল ভবিষ্যতের রূপরেখা তৈরি করে দেবে।

তারাবির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, সার্বিকভাবে আমাদের দেশে খতমে তারাবির অনেক উন্নতি হয়েছে। মানুষ এখন অনেক উৎসাহ নিয়ে তারাবিতে আসছে। শহর-বন্দরে, গ্রামে-গঞ্জে, প্রায় সিংহভাগ মসজিদেই এখন তারাবিতে কুরআন খতম হচ্ছে। বিভিন্ন বাসাবাড়িতে মহিলারাও এখন খতম তারাবি পড়ছেন। আমি মনে করি এটা আমাদের দেশের হিফজ বিভাগগুলোর বিশেষ অবদান।

সুন্দরভাবে তারাবি পড়ানোর জন্য কী প্রয়োজন জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রথমত অবশ্যই কেরাত শুদ্ধ ও স্পষ্ট হতে হবে। কুরআনের প্রতিটি হরফ যেন স্পষ্টভাবে শোনা যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে ভালো কোনো কারির তেলাওয়াত অনুসরণ করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, নামাজে রুকু, সেজদা, বৈঠক সবকিছু ধীরস্থিরতার সাথে সুন্দরভাবে আদায় করতে হবে। কারণ, নামাজ শুধু কোরআন তেলাওয়াতের নাম নয়, রুকু, সেজদা, বৈঠকের সমষ্টির নাম নামাজ। তাই সুন্দর ও বিশুদ্ধ তারাবি পড়াতে হলে অবশ্যই একজন হাফেজকে কেরাতের পাশাপাশি অন্যান্য রোকনও সুন্দরভাবে আদায় করতে হবে।

৩. হাফেজ মাওলানা ফেরদাউস ইসলাম

তিনি ১১ বছর যাবত তারাবি পড়াচ্ছেন। এর মধ্যে দুই বছর ১০ দিনের ও বাকি সময় ২৭ দিনের খতম তারাবি পড়িয়েছেন। এই দীর্ঘ সময়ে বিভিন্ন জায়গায় নামাজ পড়ানোর সৌভাগ্য হয়েছে তার। তিনি জানান, যেখান থেকে আমার হিফজ সম্পন্ন হয়েছিল জীবনের প্রথম তারাবিটা সেখানেই পড়িয়েছি। ঢাকার মাতুয়াইল এলাকায় দীর্ঘদিন অবস্থান করার সুবাদে, সেখানকার বিভিন্ন স্থানে তারাবি পড়িয়েছি। কখনো মসজিদে, কখনো বা কোনো করপোরেট শাখায়। বিশেষ করে মাতুয়াইল মেডিকেল মসজিদে টানা ছয় বছর তারাবির ইমামতি করার সৌভাগ্য হয়েছে। এ বছর কোনাপাড়া এক মার্কেট মসজিদে ইমামতির খেদমত করার সুযোগ পেয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ, এবছর সেখানেই তারাবি নামাজ পড়াচ্ছি।

এই দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা সম্পর্ক তিনি বলেন, একজন হাফেজ সাহেবের জন্য কোনো এক বছর তারাবি মিস হওয়া মারাত্মক ক্ষতিকর বিষয়। কারণ, কিতাব বিভাগে পড়াশোনার কারণে কিংবা কর্মব্যস্ততায় তেলাওয়াতের সুযোগ খুব একটা হয় না। অথচ কোরআনের হিফযকে জিন্দা রাখার জন্য তারাবি এক অনন্য নেয়ামত। তাই প্রতিটি হাফেজের উচিত—রমজানে কোনো না কোনোভাবে তারাবি পড়ানো।

বর্তমান সময়ে তারাবির অবস্থা সম্পর্কে তিনি জানান প্রথমত—তারাবির ইন্টারভিউতে অনেক হাফেজ সময় তিক্ত অভিজ্ঞতার শিকার হন। তারা কষ্ট করে ভালো পারফরম্যান্স করা সত্ত্বেও দেখা যায়— তাদের ভাগ্যে অন্যকিছু জোটে। এ বিষয়টি দৃষ্টিকটু। এছাড়া অনেক মেধাবী হাফেজ শুধু পরিচিতির অভাবে সুযোগ পান না। সংশ্লিষ্টদের এ বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

এছাড়া খতমে তারাবির প্রতি মানুষের আগ্রহ বহু আগ থেকেই প্রবল। এক সময় ‘রেডিও স্টাইল’ নামে দ্রুত তেলাওয়াতের প্রচলন ছিল। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন মানুষ দ্রুত পড়ার চেয়ে—আরব শায়খদের ধীর ও মাধুর্যপূর্ণ তেলাওয়াতই বেশি পছন্দ করে। এই ধারা দিন দিন আরও জনপ্রিয় হচ্ছে। দেখা যায়, সময় যতই লাগুক— মধুর তেলাওয়াত তারা গভীর আগ্রহে শোনে। তাই প্রতিটি হাফেজের উচিত—নিজের তেলাওয়াতকে সুন্দর ও মার্জিত করা।

সুন্দরভাবে তারাবি পড়ানোর জন্য হাফেজদের কী প্রয়োজন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে আমার কাছে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি— আরব শায়খদের তেলাওয়াত বেশি বেশি শোনা এবং চর্চা করা। তাদের তেলাওয়াতে এক অনন্য স্বাদ আছে, আছে এক গভীর মাধুর্য— যা হৃদয়কে ছুঁয়ে যায়। এক অনন্য প্রশান্তির বারিধারায় সিক্ত করে।

৪. হাফেজ মাওলানা তাহমীদ আল হাবীব

তিনি ৮ বছর ধরে খতমে তারাবির ইমামতি করছেন। গত ৬ বছরের মতো এবারও নিজ এলাকার মসজিদে তারাবির নামাজ পড়িয়েছেন। এবং প্রতিবার একা তারাবি পড়ালেও, এবার এলাকাবাসীর অনুরোধে নিজের চাচাতো ভাইকে সঙ্গে নিয়েছেন।

হাফেজ তাহমীদ বলেন, ছোটবেলা থেকেই কুরআনের প্রতি আমার গভীর আগ্রহ। মধুর সুরে কোরআন পড়া ও শোনা উভয়টিই আমার পছন্দের তালিকায় শীর্ষে। সেই ভালোলাগা থেকেই হিফজ সম্পন্ন করার পরপরই তারাবি পড়ানো শুরু করি।

হাফেজ তাহমীদ আরও বলেন, তারাবি পড়াতে পারা আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দের এবং গৌরবের। যখন দেখি মুসল্লিরা কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও মনোযোগ দিয়ে কোরআন তেলাওয়াত শুনছেন, তখন অন্তরে এক ধরনের শান্তি অনুভব হয়। তখন কোরআন তেলাওয়াতকে আরও মধুময় করার চেষ্টা করি।

অন্য কোথাও না গিয়ে প্রতিবার নিজ এলাকার মসজিদে তারাবি পড়ানোর কারণ কী, এমন প্রশ্নের উত্তরে হাফেজ তাহমীদ বলেন, মুসল্লিদের অনুরোধে প্রতি বছর এখানেই তারাবি পড়াই। প্রতিবার তারাবি শেষ করার আগেই আগামী বছর এখানেই থাকার অনুরোধ করেন তারা। তাদের অনুরোধ ফেলতে পারি না।

তিনি আরও বলেন, এছাড়া রমজানে নামাজসংক্রান্ত সব বিষয়ে তারা আমার সঙ্গে পরামর্শ করেন। এই সম্মান অন্য কোথাও গেলে হয়তো আমি পেতাম না। হতে পারে এ কারণেও নিজের এলাকা ছেড়ে অন্য কোথাও যাইনি।

বর্তমানে খতমে তারাবির অবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, বর্তমানে অনেকেই খতমে তারাবির প্রতি আগ্রহী। তবে গ্রামের কিছু কিছু মসজিদে তারাবির নামাজ দ্রুত শেষ করার প্রবণতা দেখা যায়। যার দ্বারা কোরআনের হক পরিপূর্ণভাবে আদায় হয় না। এগুলো পরিহার করা জরুরি।

নতুন হাফেজদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, সুন্দরভাবে তারাবি পড়াতে হলে নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে তেলাওয়াত শুদ্ধ করতে হবে এবং কোরআনের প্রতি ভালোবাসা রাখতে হবে। তিনি আরও বলেন, হাফেজদের উচিত রমজানের আগেই তারাবির জন্য ভালোভাবে প্রস্তুতি নিয়ে নেওয়া।

৫. হাফেজ মুস্তাকিমবিল্লাহ

তিনি নয় বছর যাবত খতম তারাবি পড়াচ্ছেন। ১০ দিনে খতম তারাবি পড়িয়েছেন তিন বছর বাকি বছরগুলোতে ২৭ দিনে কোরআনের খতম করেছের। এর মধ্যে করপোরেট শাখা, মহিলাদের জামাতসহ বিভিন্ন মসজিদে তারাবি পড়ানোর সুযোগ হয়েছে তার।

এই দীর্ঘদিন তারাবি পড়ানোর অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি বলেন, তারাবি পড়ানোর সুবাদে কোরআন শরিফ ভালোভাবে পড়া হয়। এবং এটা কোরআন ইয়াদ রাখার জন্য এটা অনেক বড় মাধ্যম।  কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে এ ব্যাপারে কেউ কেউ গাফেল থাকে, তারা এমন সুযোগ পেয়েও কোরআন শরীফ ইয়াদ রাখে না। ফলে তাদের তারাবি গতানুগতিক ধারায় চলতে থাকে। তখন দেখা যায়, কোরআন খতমে ত্রুটি থাকার আশংকা থাকে। এতে করে মুসল্লিদের হক নষ্ট হয়।

বর্তমান সময়ে তারাবির অবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে প্রায় সকল মসজিদেই খতম তারাবি হয়। কিন্তু শুধু সুরেলা কণ্ঠ দেখেই হাফেজ সাহেব নিয়োগ দেওয়ায় কোথাও কোথাও ইয়াদের বিষয়টা গৌণ হয়ে যায়। এছাড়া আর খতম তারাবি পড়তে মানুষের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। তবে অনেকে অলসতা কিংবা ভিন্ন মতাদর্শের কারণে আট রাকাত পড়ে চলে যায়।

সুন্দরভাবে তারাবি পড়ানোর জন্য হাফেজদের কী প্রয়োজন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সুন্দরভাবে তারাবি পড়ানোর জন্য হাফেজ সাহেবদের ভালোভাবে ইয়াদ করা উচিত। বিশেষত মুসল্লিদের হকের দিকে লক্ষ্য রেখে অন্তত নিজের অংশটুকু ভালোভাবেই ইয়াদ করা।

৬. হাফেজ আহমদ নাদীম

তিনিও ৮ বছর যাবত তারাবি পড়াচ্ছেন। এবছর কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের আব্দুল্লাহপুরে মাস্টার বাড়ি জামে মসজিদে তারাবি পড়িয়েছেন। এবং আব্দুল্লাহপুরেই গত ৫ বছর যাবৎ তারাবি পড়াচ্ছেন।

হাফেজ নাদীম তার তারাবি পড়ানোর দীর্ঘ ৮ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, তারাবি পড়ানো ইমামতি এবং তেলাওয়াতে বিশেষ দক্ষতা অর্জনের সহায়ক। নিয়মিত তারাবি পড়ানোর দ্বারা কোরআন তেলাওয়াতে সাবলীলতা আসে। এবং এক জায়গায় তারাবি পড়ানোর দ্বারা মুসল্লিদের সাথে একটি আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

হাফেজ নাদীম বলেন, বর্তমান সময়ে খতমে তারাবি অত্যন্ত জনপ্রিয়। মানুষের মধ্যে খতমে তারাবি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। তবে দ্রুতগতিতে তেলাওয়াতের প্রবণতা উদ্বেগের কারণ; তারাবির নামাজে ধীরে-সুস্থে, মনোযোগের সাথে তেলাওয়াত করা জরুরি।

তারাবি পড়াতে পারার অনুভূতি সম্পের্কে বলেন, সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, যখন দেখি মুসল্লিরা ধৈর্য ধরে গভীর মনোযোগ দিয়ে কুরআন শুনছেন এবং দোয়ার সময় আবেগাপ্লুত হয়ে দোয়া করছেন। এই দৃশ্যগুলো সবসময় হৃদয়ে গেঁথে থাকে।

৭. হাফেজ শহিদুল ইসলাম

তিনি হিফজ শেষ করার পর থেকেই টানা ৬ বছর ধরে তারাবির নামাজের ইমামতি করছেন। এবং এবছর মুন্সিগঞ্জের মসজিদে ২৭ দিনে খতমে তারাবি পড়িয়েছেন।

বর্তমান সময়ে খতমে তারাবি সম্পর্কে তার মতামত জানতে চাইলে হাফেজ শহীদ বলেন, বর্তমান সময়ে মানুষের মধ্যে খতমে তারাবির প্রতি আগ্রহ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে যুবক শ্রেণির মধ্যে কোরআন শোনার এক দারুণ আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। দিনভর কাজ করার পরেও দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে আল্লাহর কালাম শুনছেন তারা। এটা ইতিবাচক দিক।

সুন্দরভাবে তারাবির নামাজ পড়ানোর জন্য কী প্রয়োজন এ প্রশ্নের উত্তরে হাফেজ শহীদ বলেন, আল্লাহর জন্য পড়া এবং মানুষকে অন্তর থেকে শোনানো। যখন একজন হাফেজ মনে করবেন যে, তিনি মহান আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর কালাম শোনাচ্ছেন, তখন এমনিতেই তেলাওয়াত সুন্দর হয়ে যাবে।

তারাবি পড়াতে পারার অনুভূতি নিয়ে তিনি বলেন, যখন দেখি ছোট ছোট বাচ্চারাও আমার পেছনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোরআন শুনছে, তখন নিজের ভেতরে এক ধরণের অনুপ্রেরণা জাগে। তাছাড়া মুরুব্বিদের দোয়া। অনেকবার এমন হয়েছে, নামাজ শেষে সাদা দাড়িওয়ালা কোনো বৃদ্ধ চাচা আমার হাত ধরে কেঁদে ফেলেন এবং মাথায় হাত দিয়ে দোয়া করেন— বাবা, তোমার পড়া শুনে কলিজাটা জুড়িয়ে গেল। পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে এই দোয়াটুকুই আমার জন্য শ্রেষ্ঠ সম্পদ।

৮. হাফেজ মো. সাঈদ জামিল

তিনি ৯ বছর ধরে তারাবি পড়াচ্ছেন। এবছর ঢাকার সদরঘাটে নিউ হকার্স মার্কেট জামে মসজিদে ২৭ দিনে খতমে তারাবি পড়াচ্ছেন।

হাফেজ সাঈদ বলেন, আমার তারাবি পড়ানোর শুরুটা হয় আমাদের বাড়ি থেকেই। ফুফাতো ভাইয়ের সঙ্গে মিলে তারাবি পড়িয়েছিলাম সে বছর। আব্বুসহ আরও কয়েকজন আমাদের মুসল্লি ছিলেন। এবং প্রতিবার ২৭ দিনে খতমে তারাবি পড়ানো হয়। তবে একবার ভোলার ইলিশ্যায় তাবলিগের সফরে কয়েকজন মিলে ১৮ দিনে দুটি খতম করার সুযোগ হয়েছে।

সুন্দরভাবে তারাবি পড়ানোর জন্য কী প্রয়োজন এমন প্রশ্নের উত্তরে হাফেজ সাঈদ বলেন, বেশি বেশি তেলাওয়াত করতে হবে এবং যথাসম্ভব নফল নামাজে তেলাওয়াত করার চেষ্টা করতে হবে।

৯. হাফেজ মাওলানা শাকের হাওলাদার সিয়াম

তিনি প্রায় ১৫ বছর যাবত তারাবি পড়াচ্ছেন। এবছর গাবতলীর দারুল আমান জামে মসজিদে প্রতিবারের মতো ২৭ দিনে খতম তারাবি পড়াচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।

হাফেজ সিয়াম তারাবি নিয়ে একটি ভিন্নরকম অভিজ্ঞতা স্মরণ করে বলেন, ২০২১ সালের তারাবির কথা আমার আজও মনে পড়ে। সেবার আমি কামরাঙ্গীরচরে ইমামতি করতাম। কিন্তু তারাবি পড়াতে আমাকে উত্তরা আসতে হতো। প্রতিদিন কামরাঙ্গীরচর থেকে উত্তরা আসা-যাওয়া অনেক কষ্টের ছিল।

সমস্ত হাফেজদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কোরআনের ইয়াদ ধরে রাখতে চাইলে প্রত্যেক হাফেজের তারাবি পড়ানো জরুরি। পাশাপাশি সারা বছর বেশি বেশি তেলাওয়াত করতে হবে।

১০. হাফেজ মাহফুজুর রহমান

তিনি চার বছর যাবৎ যশোর, বরিশাল, গোপালগঞ্জের বিভিন্ন জায়গায় তারাবি পড়িয়েছেন। বিশেষ করে যশোর ক্যান্টনমেন্টে তারাবি পড়ানোর সুযোগ হয়েছে তার।

তারাবির অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বলেন, সব জায়গায় আলহামদুলিল্লাহ ভালো পরিবেশ ও মুসল্লিদের মাঝে তারাবি পড়িয়েছি আমার তেমন কোনো তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে না।

বর্তমান সময়ে তারাবির অবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, গ্রামাঞ্চলে পূর্বের বছরগুলোতে যেমন তারাবির প্রতি মানুষের আগ্রহ দেখা গেছে সেই তুলনায় বর্তমান সময়ে মানষের আগ্রহ একটু কম দেখা যাচ্ছে।

সুন্দরভাবে তারাবিহ পড়ানোর জন্য হাফেজদের কী প্রয়োজন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রমজানের পরে সারা বছর বেশি বেশি তেলাওয়াতের অভ্যাস গড়ে তুললে আশা করি তারাবি আরও সহজ ও সুন্দর হবে।

 এমএম/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ