রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬ ।। ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ ।। ২৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮


লন্ডনে আল্লামা কাশ্মীরির নাতির সান্নিধ্যে

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহীত

|| মাওলানা মাহফূয আহমদ ||

গতকাল বাদ ইশা লন্ডনের মিচাম ইসলামিক সেন্টারে শায়খুল হাদিস হযরত মাওলানা খিজির শাহ সাহেব হাফিযাহুল্লাহর একটি বিশেষ প্রোগ্রাম ছিল। তিনি হলেন আল্লামা মুহাম্মাদ আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি রাহিমাহুল্লাহর সুযোগ্য নাতি এবং দারুল উলূম (ওয়াকফ) দেওবন্দের সম্মানিত শায়খুল হাদিস।

গতবার আল্লামা কাশ্মীরি সেমিনারে অংশগ্রহণ করতে যখন দেওবন্দ গিয়েছিলাম, তখন সবকটি দিনই হযরতের বাসভবনে অবস্থান করেছিলাম। তাঁর মেহমানদারি ছিল অকল্পনীয়। জাযাহুমুল্লাহু খায়রা।

গতকাল হযরত মাওলানা খিজির শাহ সাহেব তাঁর আলোচনায় বেশ চমৎকার কিছু তথ্য উপস্থাপন করেছেন। এরপর রাতের খাবারেও হযরতের সান্নিধ্য লাভের সুযোগ হয়। সেসময়ও নানাবিধ ইলমি প্রসঙ্গ নিয়ে কথাবার্তা হয়। গতরাতের সেই ইলমি মুযাকারাহ থেকে কয়েকটি বিক্ষিপ্ত তথ্য এখানে তুলে ধরছি।

এক. ইনসাফের কথা বলতে গিয়ে হযরত মাওলানা খিজির শাহ সাহেব বলেন, নিজের প্রতিও ইনসাফ করা জরুরি। এ প্রসঙ্গে তিনি হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানবি রাহিমাহুল্লাহর একটি চমৎকার ঘটনা উল্লেখ করেন।

একবার থানবি রাহিমাহুল্লাহর দাঁতে সমস্যা দেখা দিল। তিনি লাহোরের একজন দাঁতবিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলেন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছিল, এ পরিস্থিতিতে স্বর্ণের দাঁত প্রতিস্থাপন করতে হবে। থানবি রাহিমাহুল্লাহ বললেন, এ বিষয়ে শরিয়তের নির্দেশনা কী, তা পুরোপুরি নিশ্চিত না হয়ে আমি সম্মতি দিতে পারি না।

তিনি থানাভবন থেকে দারুল উলূম দেওবন্দের দারুল ইফতায় প্রশ্ন লিখে পাঠালেন। দেওবন্দের সম্মানিত মুফতিগণ অবাক হলেন। তাঁদের কথা হলো, থানবি সাহেব দারুল উলূম দেওবন্দের শূরা সদস্য, তিনি আমাদের সকলের সিনিয়র। আমরা বরং কঠিন মাসআলার ক্ষেত্রে তাঁরই শরণাপন্ন হই। এখন তাঁর প্রশ্নের উত্তর আমরা কীভাবে দিই!

দেওবন্দের তৎকালীন মুহতামিম হযরত মাওলানা ক্বারি তায়্যিব সাহেব রাহিমাহুল্লাহ সকল উস্তাযকে নিয়ে মিটিংয়ে বসলেন। সিদ্ধান্ত হলো, উস্তাযগণের একটি প্রতিনিধি দল সরাসরি থানাভবনে গিয়ে থানবি রাহিমাহুল্লাহর সঙ্গে কথা বলবেন।

সেই প্রতিনিধিদল থানবি রাহিমাহুল্লাহর খানকায় পৌঁছে সব খুলে বললেন। এবার থানবি রাহিমাহুল্লাহ বললেন, দেখুন! এই ফতোয়া আপনাদেরই দিতে হবে। কেননা, এখানে আমিই হলাম ভুক্তভোগী (মুবতালা বিহি)। এখানে আমি নিজে মাসআলা দিতে গেলে আমার আশঙ্কা হয়, আমি হয়তো নিজের বেলায় ইনসাফ নাও করতে পারি!

দুই. প্রখ্যাত সিরাতবিদ হযরত মাওলানা সায়্যিদ সুলাইমান নদবি রাহিমাহুল্লাহ একবার হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানবি রাহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করলেন, হযরত! আপনি কি এ যুগের মুজাদ্দিদ (সংস্কারক)?

হযরত থানবি বললেন, ধারণা তো এমনই, কিন্তু সম্পূর্ণ নিশ্চিত হওয়ার কোনো দলিল আমার কাছেও নেই। তবে সুলুক ও তাসাউফ (আত্মশুদ্ধি) শাস্ত্রকে বিদআত ও খুরাফাত থেকে যেভাবে মুক্ত করে বিশুদ্ধ তাসাউফের বিশ্লেষণ আমার রচনাবলিতে তুলে ধরেছি, আশা করি আগামী একশো বছরের জন্য তা যথেষ্ট হবে, ইনশাআল্লাহ।

তিন. আল্লামা কাশ্মীরি রাহিমাহুল্লাহ হারামাইনের সফর ছাড়া হিন্দুস্তানের বাইরে আর কোথাও সফর করেননি। তবে এর একমাত্র ব্যতিক্রম হলো বার্মা। বস্তুত রেঙ্গুনে অবস্থিত সুরতি জামে মসজিদের আমন্ত্রণে আল্লামা কাশ্মীরি এক সপ্তাহের জন্য বার্মা সফর করেছিলেন। সফর শেষে ফিরে এসে তিনি ডাবেল মাদরাসার সকল উস্তাযকে একটি করে রুমাল এবং প্রত্যেককে দশ রুপি হাদিয়া দিয়েছিলেন।

চার. একবার হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানবি রাহিমাহুল্লাহর মনে একটি প্রশ্ন জাগল। জিনরা যখন মারা যায়, তখন তাদের দাফন কোথায় হয়? তিনি খুব দ্রুতই এই প্রশ্নের সমাধান জানতে উদগ্রীব হয়ে উঠলেন।

আল্লামা কাশ্মীরি তখন ডাবেলে অবস্থান করছিলেন। হযরত থানবি ভাবলেন, আল্লামা কাশ্মীরি চিঠিপত্রের উত্তর লিখতে কিছুটা সময় নিয়ে থাকেন, অথচ আমার বিষয়টি জরুরি। তাই হযরত থানবি ডাবেলের একজন শিক্ষকের কাছে চিঠি লিখলেন। ওই শিক্ষক হযরত থানবির মুরিদও ছিলেন। চিঠিতে হযরত থানবি বললেন, যত দ্রুত সম্ভব প্রশ্নটি আল্লামা কাশ্মীরির সামনে উপস্থাপন করবে এবং উত্তর জেনে আমাকে চিঠির জবাব লিখবে।

আল্লামা কাশ্মীরি প্রতিদিন আসরের পর শিক্ষকদের নিয়ে বসতেন এবং ইলমি মুযাকারাহ করতেন। ওই শিক্ষক আসরের পরের সেই মজলিসে আল্লামা কাশ্মীরিকে প্রশ্নটি করলে হযরত বললেন, দেখো! আপনার কাছ থেকে এমন গভীর প্রশ্ন আমি প্রত্যাশা করিনি। আমার মনে হয়, এটি কোনো বিজ্ঞ আলেমের তরফ থেকে এসেছে?

ওই শিক্ষক বললেন, জি, এটি হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবি সাহেবের প্রশ্ন। আল্লামা কাশ্মীরি বললেন, এমন প্রশ্নের উত্তর আমি কেবল তাঁকেই দিতে পারি। সেজন্য হযরতকে বলুন, সরাসরি আমার কাছে চিঠি পাঠাতে।

ঘটনাটি বর্ণনার এ পর্যায়ে হযরত মাওলানা খিজির শাহ সাহেব থেমে গেলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হযরত! তখন আল্লামা কাশ্মীরি মূল প্রশ্নের কী উত্তর দিয়েছিলেন? হযরত মাওলানা খিজির শাহ সাহেব রসিকতা করে বললেন, সেই উত্তর জানতে হলে তো 'পাউন্ড' লাগবে! উপস্থিত সবাই হেসে উঠলেন। উত্তর ছিল, জিনরা যখন মারা যায়, তখন তাদের দাফন হয় বাতাসে, বাতাসের যে একাধিক স্তর রয়েছে, সেখানে। এ জন্যই আমরা শুনতে পাই, অমুকের বাতাস লেগেছে!

পাঁচ. ডাবেলে অবস্থানকালে হযরত মাওলানা শাব্বির আহমদ উসমানি সাহেব আল্লামা কাশ্মীরির কাছ থেকে যেভাবে উপকৃত হয়েছেন, সম্ভবত আর কেউ এমন সুযোগ পাননি। প্রতিদিন মাওলানা শাব্বির আহমদ উসমানি আল্লামা কাশ্মীরির সঙ্গে ইলমি বিষয়ে আলোচনা করতেন এবং বিভিন্ন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতেন।

আরেক প্রসঙ্গে হযরত মাওলানা খিজির শাহ সাহেব বলেন, আমার বাবা হযরত মাওলানা আনযার শাহ সাহেব রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, পুরো তাফসির-ভাণ্ডার অধ্যয়ন করে যখন কেউ 'ফাওয়াইদে উসমানি' পড়তে বসবেন, তখনই এর গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারবেন। বস্তুত হযরত মাওলানা শাব্বির আহমদ উসমানি রাহিমাহুল্লাহ এখানে পুরো তাফসির-ভাণ্ডারের সারনির্যাস পেশ করে দিয়েছেন।

এভাবেই গতরাতের মজলিসটি ইলমি আলোচনা, আকাবিরের স্মৃতিচারণ এবং দুর্লভ সব তথ্যের সমাহারে বেশ সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল।

লেখক: লন্ডন প্রবাসী দাঈ, লেখক

এসএইচ/ 


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ