আন্তর্জাতিক ডেস্ক
জ্যোতির্বিজ্ঞানের তথ্য ও শরিয়াহর বিধানের মধ্যে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন মিসরের গ্র্যান্ড মুফতি ও বিশ্বব্যাপী ফতোয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মহাসচিব অধ্যাপক ড. নজির মুহাম্মদ আইয়াদ। তিনি বলেছেন, ‘শরয়ি জ্যোতির্বিজ্ঞান’ শুধু একটি বৈজ্ঞানিক বিষয় নয়; বরং বাস্তবতা বোঝা, শরিয়াহর দলিল অনুধাবন এবং বাস্তবতার ওপর সঠিকভাবে শরয়ি বিধান প্রয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) মিসরের দারুল ইফতার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, আল-আজহার গ্লোবাল সেন্টার ফর শরয়ি অ্যাস্ট্রোনমি ও কায়রোর আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের যৌথ আয়োজনে ‘বৈজ্ঞানিক তথ্য ও শরয়ি নীতিমালার আলোকে শরয়ি জ্যোতির্বিজ্ঞান’ শীর্ষক প্রশিক্ষণ কোর্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. নজির মুহাম্মদ আইয়াদ বলেন, সূর্যের গতিপথ সম্পর্কে জ্ঞান নামাজের সময় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে চাঁদের বিভিন্ন অবস্থান, উদয়স্থল ও দিগন্তসংক্রান্ত জ্ঞান ইবাদত, ইসলামি বর্ষপঞ্জি ও বিভিন্ন সময় নির্ধারণের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই শরয়ি জ্যোতির্বিজ্ঞানকে শুধু একটি বিশেষায়িত বৈজ্ঞানিক বিষয় বা নিছক ফিকহি আলোচনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, সঠিক বিজ্ঞান শরিয়াহর বিরোধী নয় এবং সঠিক বৈজ্ঞানিক তথ্যও ওহির শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। এ ক্ষেত্রে কোন বিষয় নিশ্চিত, কোনটি অনুমাননির্ভর, কোনটি স্থায়ী ও কোনটি পরিবর্তনশীল—এগুলো আলাদা করে বোঝা জরুরি।
প্রধান মুফতি বলেন, জ্যোতির্বিজ্ঞান, সময় নির্ধারণ, চাঁদ দেখা ও হিসাবসংক্রান্ত বিষয়ে ফতোয়া কোনো অনুমান, বিচ্ছিন্ন তথ্য, ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল অ্যাপের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দেওয়া উচিত নয়। এ জন্য বাস্তবতা যাচাই, বৈজ্ঞানিক তথ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া এবং এরপর শরিয়াহর বিধান প্রয়োগ করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে কাজ করা আলেমের শুধু ফিকহ জানা যথেষ্ট নয়, আবার একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানীর শুধু জ্যোতির্বিজ্ঞান জানা যথেষ্ট নয়। বরং উভয় ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা প্রয়োজন। এ জন্য শরয়ি জ্যোতির্বিজ্ঞানে বিশেষায়িত শিক্ষাক্রম চালু, শরিয়াহ ও বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অংশীদারত্ব, মুফতি ও দাঈদের জন্য বৈজ্ঞানিক-শরয়ি নির্দেশিকা তৈরি এবং সংশ্লিষ্ট জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক তথ্যের হালনাগাদ তথ্যভান্ডার তৈরির প্রস্তাব দেন তিনি।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জর্ডানের গ্র্যান্ড মুফতি অধ্যাপক ড. আহমাদ আল-হাসানাত বলেন, নামাজ, রোজা, হজ ও ইসলামি বর্ষপঞ্জিসহ বিভিন্ন ইবাদতের সময় নির্ধারণের সঙ্গে জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বিষয় জড়িত। তাই শরয়ি দলিল ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি—উভয়ের প্রতি সম্মান রেখে ফকিহ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে সংলাপ বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত বিষয় এবং পরিবর্তনযোগ্য তত্ত্ব বা অনুমানের মধ্যে পার্থক্য করতে হবে। কোনো বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব প্রমাণের জন্য শরয়ি দলিলের ওপর এমন অর্থ চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়, যা দলিলটি ধারণ করে না।
ওমানের ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ বিন মুসা বাবাআমি বলেন, মুসলিমদের ঐক্য সব কিছুর ঊর্ধ্বে। চাঁদ দেখার পদ্ধতিতে মতপার্থক্য যেন মুসলিমদের মধ্যে বিভেদের কারণ না হয়। তিনি ‘ইখতিলাফুল মাতালি’ বা বিভিন্ন অঞ্চলে চাঁদ দেখার ভিন্নতার বিষয়টি নিয়ে আরও বৈজ্ঞানিক ও ফিকহি গবেষণার আহ্বান জানান।
ইসলামিক রিসার্চ একাডেমির সহকারী মহাসচিব ড. মাহমুদ আল-হাওয়ারি বলেন, জ্যোতির্বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণ, হিসাব, প্রোগ্রামিং, উপগ্রহ ও আধুনিক প্রযুক্তির উন্নতির কারণে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
মিসরের ন্যাশনাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড জিওফিজিকসের প্রধান অধ্যাপক ড. বাসেম নবাবি শরিয়াহ-সংশ্লিষ্ট জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গবেষণায় আধুনিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞান কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের জ্যোতির্বিজ্ঞান ও আবহাওয়া বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. কামেল আবদুল লতিফ জাদুল্লাহ বলেন, শরিয়াহ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের মধ্যে সহযোগিতার সেতু তৈরি হলে বৈজ্ঞানিক তথ্যের আরও কার্যকর ব্যবহার সম্ভব হবে। বিশেষ করে ইসলামি মাসের শুরু নির্ধারণ ও চাঁদ পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে এ সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ।
সম্প্রতি মিসর ও জর্ডানের যৌথ শরয়ি ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক কমিটিও ইসলামি মাসের চাঁদ দেখার বিষয়ে নিয়মিত বৈজ্ঞানিক ও শরয়ি তথ্য পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়েছে। দুই দেশ যৌথভাবে মাসিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ও শরয়ি প্রতিবেদন তৈরির বিষয়েও একমত হয়েছে। সূত্র: গ্র্যান্ড মুফতির ফেসবুক পেইজ
এসএইচ/