পলাশ রহমান
জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ প্রায় সব দলের সাথে অতীতে ঐক্য করেছে, কিন্তু ইসলামপন্থী দলগুলোর সাথে তারা কখনো ঐক্য করতে পারেনি। এর প্রধান কারণ, দেশের ইসলামপন্থী দলগুলো জামায়াতকে আদর্শিক ও আকিদাগত ভাবে ইসলামী দল মনে করে না। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উভয় ক্ষেত্রে জামায়াতের ওপর তাদের আস্থাহীনতা এবং অবিশ্বাস প্রবল।
জামায়াতের দাবি অনুযায়ী, এক সময় গোলাম আযম ইসলামপন্থী দলগুলোর সাথে ঐক্যের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তা ব্যর্থ হয়। এরপর থেকে জামায়াত সেই পথ পরিত্যাগ করে ভিন্ন আদর্শের রাজনৈতিক দলের সাথে ঐক্য করে ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়ার কৌশল গ্রহণ করে। দীর্ঘদিন এই ধারা অনুসরণ করতে গিয়ে দলটি তার স্বকীয়তা হারিয়েছে এবং ধীরে ধীরে লেজুড়বৃত্তির মানসিকতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। এর ফলে জামায়াত একটি আত্মমর্যাদাহীন, পরনির্ভর রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে।
জামায়াতের দেখানো পথ অনুসরণ করে দেশের আরো কয়েকটি ছোট ইসলামপন্থী দল ভিন্ন আদর্শের সাথে ঐক্য করে ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট লাভের চেষ্টা করেছে এবং তারাও মেরুদণ্ডহীন রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে। যা বাংলাদেশের ইসলামপন্থী রাজনীতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতির কারণ হয়েছে।
চব্বিশের নতুন বাংলাদেশে নির্বাচনী সমঝোতার একটি স্পেস তৈরি করেন ইসলামী আন্দোলনের আমির সৈয়দ রেজাউল করিম। তিনি এক বাক্স ভোট নীতির মাধ্যমে জামায়াতকেও সমঝোতায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দেন। ইসলামী আন্দোলন বা সৈয়দ রেজাউল করিমের ক্যারিয়ারের জন্য এতে অনেক বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি ছিলো। কারণ দেশের ইসলামপন্থী দল ও হক্কানী আলেমগণ এখনো জামায়াতের আকিদাগত বিরোধিতা থেকে একটুও সরেননি।
জামায়াত সৈয়দ রেজাউল করিমের এই উদারতাকে 'সুযোগ' হিসেবে গ্রহণ করেছে। আসন সমঝোতা নিয়ে প্রথম থেকেই তারা টালবাহানা শুরু করে। আট দলের শরিকদের না জানিয়ে নতুন তিনটি দলকে সমঝোতায় যুক্ত করে এবং ইসলামী আন্দোলনকে তৃতীয় সারিতে নামিয়ে আনার চেষ্টা করে। এতে স্পষ্ট ভাবে ইসলামী আন্দোলনের প্রতি জামায়াতের বিশ্বাসঘাতকতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
স্বাধীনতার প্রশ্নে জামায়াতের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ক্ষতি করেছে আওয়ামীলীগ, আর ইসলামী আকিদার প্রশ্নে সবচেয়ে দৃঢ় ভাবে জামায়াতকে কোণঠাসা করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। এই দুই দলের প্রতি জামায়াতের ভেতরে প্রচণ্ড ক্ষোভ কাজ করে। জামায়াতের অনেক নেতাকর্মীর মধ্যে এই ধারণা এখনো প্রবল যে, ইসলামী আন্দোলন ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের দালাল এবং ভারতের অর্থায়নে পরিচালিত। এই মানসিকতা নিয়ে গড়ে ওঠা জামায়াতের ভোটাররা কখনোই হাতপাখা মার্কায় ভোট দেবে না; বরং তারা সচেতন ভাবে হাতপাখার ক্ষতি করতে অন্য প্রতীকে ভোট দেয়ায় সম্ভাবনা প্রবল।
এছাড়া দীর্ঘদিন জামায়াতের বিকল্প কোনো শক্তিশালী ইসলামপন্থী দল না থাকলেও বর্তমানে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে শুরু করেছে, যা জামায়াতের জন্য রাজনৈতিক বড় হুমকি। ফলে তারা কোনো ভাবেই চায় না ইসলামী আন্দোলন শক্তিশালী হোক বা সংসদে প্রতিনিধিত্ব করুক। এ কারণে জামায়াত সমঝোতার মুখোশ পরে ইসলামী আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করার কৌশল নিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের উচিত দেশবাসীর সামনে নিজেদের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরা। ঢাকাঢাকি না করে সমঝোতার ভেতরের কথা পরিষ্কারভাবে বলা। আংশিক সমঝোতার প্রস্তাব মেনে না নেওয়া। কারণ জামায়াত অতীতে দেখিয়েছে, ক্ষমতার সামান্য সুবিধার জন্য তারা ভিন্ন আদর্শের হাত ধরতে একটুও দ্বিধা করে না। তাদের রাজনৈতিক ডিএনএতে লেজুড়বৃত্তির প্রবণতা শক্ত ভাবে বিদ্যমান।
সমঝোতা কোনো ষড়যন্ত্র নয়। ভেতরে কী হচ্ছে তা জানার অধিকার দেশবাসী রাখেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন হলে ইসলামী আন্দোলনের উচিত বিএনপির সাথে রাজনৈতিক সুসম্পর্ক গড়ে তোলা।
ইসলামী আন্দোলনের সাথে প্রতারণা করে জামায়াতের বিশেষ কোনো লাভ হবে না। বরং তারা জাতির কাছে স্থায়ী ভাবে বেইমান হিসেবে চিহ্নিত হবে এবং ইসলামপন্থী জনগোষ্ঠীর হৃদয় থেকে আরো দূরে সরে যাবে। তাদের রাজনৈতিক মেরুদণ্ড ধনুক হয়ে থাকবে।
অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন হয়তো সাময়িক ভাবে কিছুটা হোঁচট খাবে, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে তাদের কোনো ক্ষতি বা হারানোর আশঙ্কা নেই।
লেখক: অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট ও বিশ্লেষক
আরএইচ/