|| আরিফ আজাদ ||
বিশ্বকাপ উন্মাদনায় মুসলিম সন্তানেরা ডুবে আছে বলে চারপাশে ছিঃ ছিঃ রব তুলছেন অনেকে। অনেকেই দোষারোপের কামান দাগাচ্ছেন, উন্মাদনায় মেতে থাকা প্রজন্মকে ভৎসর্না করছেন। তাদেরকে ছোট করা, তাদের ঈমান, আকীদাহ, গাইরত নিয়ে প্রশ্ন তোলা, তাদের বাপ মায়েদের দায়িত্ব কর্তব্যহীন জ্ঞান করে কথা বলা সহ নানান কিছুই চোখে পড়ছে।
তবে, দাওয়াতের জন্য এটা কি আদৌ সঠিক কোনো অ্যাপ্রোচ?
আমরা যে সময়ে বসে আছি, এই সময়টা ৯০ কিংবা ২০০০ সালের কোনো সময় নয়। ওই সময়গুলোতে কয়েকটা পাড়া বা গ্রাম মিলিয়ে একটা টেলিভিশন থাকতো। যাদের খেলাধুলা অথবা এইসব উন্মাদনার নেশা ছিল, বিশ্বকাপ অথবা এই ধরণের ইভেন্টগুলোতে তারা সেই টিভি মালিকের ঘরে চলে আসতো। উঠোনে টিভি বের করে ইত্যাদি অনুষ্ঠান দেখা, ফুটবল ক্রিকেট দেখা তো আমাদের নিকট অতীতের অভিজ্ঞতা।
কিন্তু, আজকের সময়টা মোটেই সেরকম নয়। ওই সময়গুলোতে প্রযুক্তির সেভাবে বিকাশ না ঘটায় এইসব উন্মাদনা সেভাবে চোখে পড়ত না। এবং, সীমিত কিছু মানুষের মাঝেই এইসব উন্মাদনা সীমিত থাকত।
কিন্তু যুগ পাল্টেছে। এখন এআই বিপ্লবের যুগ। এই যুগে মানুষেরা, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম গ্লোবাল ওয়ার্ল্ডের সাথে এমনভাবে সম্পৃক্ত যে, আপনি ইচ্ছা করলেই তাকে মেসি, নেইমার, রোনালদোদের খবর, ছবি, জীবন, খেলাধুলা, এক্সপোজার থেকে আলাদা রাখতে পারবেন না। টিভির পর্দা থেকে সোশ্যাল মিডিয়া, ম্যাগাজিন থেকে খবরের পাতা—কোথায় এসব নেই?
এটাই যখন করুণ বাস্তবতা, তখন আমাদের দাওয়াতের অ্যাপ্রোচ কী হওয়া উচিত? এই বিশাল তরুণ প্রজন্মকে আমরা কি কেবল ভৎসর্না করে উড়িয়ে দেবো? তাদের ট্রল করে, ছোট করে, তাদের ঈমান-আকীদাহ নিয়ে প্রশ্ন তুলে, তাদের বাবা-মাকে খাটো করে লেখালেখি আর বক্তব্য দিলেই কি এরা তাওবা করে খেলা দেখা বন্ধ করে দিবে? ঝাঁকে ঝাঁকে দ্বীনের পথে ফিরে আসবে? ভুলেও ভোর রাতে খেলা দেখার জন্য জেগে থাকবে না?
ভুল।
এমনটা করলে বরং আমাদের কথাগুলো, আমাদের দাওয়াতগুলো আমাদের বর্গতে ঘুরপাক খাবে। যাদের হিদায়াত হওয়ার কথা, নসীহতগুলো যাদের পর্যন্ত পৌঁছানো জরুরি তাদের কাছে কখনোই পৌঁছাবে না।
পৌঁছাবে তো না-ই; এই অ্যাপ্রোচের কারণে তাদের অন্তরে দ্বীনের ব্যাপারে যে সামান্য ভালোবাসাটুকু ছিল, সেটাও হয়তো হারাতে থাকবে। সে যখন দেখবে সামান্য কয়েকটা ফুটবল ম্যাচ দেখার জন্য (তাদের মতে) তাকে দাড়িটুপি ওয়ালা হুজুরেরা যেভাবে, যে-উপায়ে, যে ভাষায় ভৎসর্না করছে, তখন সে ধর্মের অনুশাসনের ব্যাপারে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়বে।
তাহলে, এই যে ফুটবল উন্মাদনা, এইটাতে কি আমরা তালি দেবো?
একদম তা নয়। আমরা কাজটার নিন্দেই করব। এই উন্মাদনাকে আমরা অপছন্দই করব। তবে, আমাদের দাওয়াতের অ্যাপ্রোচটা হতে হবে খুবই বুদ্ধিবৃত্তিক। যারা এই উন্মাদনায় ডুবে আছে, তারাই তো আমাদের মূল অডিয়েন্স, তাই না? তাদেরকে ঘরে ফিরানো, দ্বীনে ফেরানোই তো আমাদের মাকসাদ। যে ছেলেটা ফুটবল দেখে না, সালাত ত্যাগ করে না, তার কাছে তো আমার ভয়েজ যাওয়ার দরকারই নেই৷ আমার দাওয়াত তো এমন মানুষের কাছে, অথবা এমন তরুণদের কাছে পৌঁছাতে হবে যাদের মাঝে ভ্রান্তি আছে, এইসব অকাজের উন্মাদনা আছে।
আমার রূঢ় আচরণ, রূঢ় কথাবার্তা, কিংবা উপহাসের কারণে সে যদি আমার থেকে আরও দূরে চলে যায়, তাহলে ক্ষতিটা কার দিনশেষে? ক্ষতিটা তো আমারও। আমি আমার টার্গেট অডিয়েন্সকে হারাচ্ছি। আমি তো চাই তারা আমার কথা শুনুক। কিন্তু আমার আচরণের কারণে যদি তারা আমার কাছে না ভিড়ে, তাহলে আমার কথাগুলো কে শুনবে?
হ্যাঁ, আমরা এইসব উন্মাদনার নিন্দে করব, এগুলোর সমালোচনা করব, এগুলো যে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে কোনো মিনিং এড করে না—এই সবকিছুই আমরা বলব নিঃসন্দেহে। তবে, সেই বলার স্টাইলটা হতে হবে দাওয়াতমুখী। মারমুখী নয়।
আমি একান্ত শুভাকাঙ্ক্ষী, একান্ত বন্ধু, একান্ত বড় ভাইয়ের মতো তাকে আমার কথাগুলো তাদের সামনে তুলে ধরব৷ আমি যে তাদের ভালো চাই, আমি যে তাদের কল্যাণকামী—এটাই তাদেরকে অনুভব করাতে হবে।
আল্লাহর রাসুল সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাউকে গুনাহ করতে দেখলে কষ্ট পেতেন, কিন্তু তিনি কোনোদিনও সেভাবে ভৎসর্না করতেন না যাতে করে তারা আল্লাহর রাসুলের কাছ ঘেঁষা ছেড়ে দেয়।
মানুষকে দ্বীনের পথে ডাকবার জন্য আমাদের অ্যাপ্রোচ কেমন হওয়া উচিত, সেটা স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা নবিজি সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন—
‘আল্লাহর রহমতের কারণেই আপনি তাদের প্রতি কোমল হয়েছেন। আর যদি আপনি রূঢ়ভাষী ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, তবে তারা আপনার চারপাশ থেকে সরে যেত। সুতরাং আপনি তাদের ক্ষমা করুন, তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং কাজে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করুন।’ (সুরা আলে ইমরান, ৩:১৫৯)
চলুন, আমরা আল্লাহর বাতলে দেওয়া বিশেষ কথাটি খেয়াল করি আর আমাদের দাওয়াতের অ্যাপ্রোচ নিয়ে পুনর্বিবেচনা করি—
‘আর যদি আপনি রূঢ়ভাষী ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, তবে তারা আপনার চারপাশ থেকে সরে যেত।’
লেখক: দাঈ, অ্যাকটিভিস্ট ও চিন্তক
আইও